শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭ , ১৫ রজব ১৪৪২

জীবনযাত্রা
  >
ফ্যাশন

জামদানি কথা

নিউজজি ডেস্ক ৬ অক্টোবর , ২০১৮, ১১:৫০:৪৯

  • জামদানি কথা

বুনন আর নকশার জন্য আমাদের দেশে জামদানি শাড়ির কদর সেই প্রাচীনকাল থেকেই। সব বয়সী নারীর কাছে রয়েছে জামদানি শাড়ির চাহিদা। এ কারণে জামদানি শাড়ির বেচাকেনা সারা বছরই চলে সমানভাবে।

জামদানি শাড়ির নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে। ‘জামদানি’ শব্দটি ফারসি শব্দ। ফারসিতে ‘জামা’ শব্দের অর্থ কাপড় ও ‘দানা’ শব্দের অর্থ হল বুটি। অর্থাৎ ‘জামদানি’ শব্দের অর্থ হল বুটিদার কাপড়। অনেকে মনে করেন মুসলমানেরাই ভারতীয় উপমহাদেশে জামদানি শাড়ির প্রচলন করেছিলেন। তবে আজকের জামদানি শাড়ি বাংলার এই সুপ্রাচীন ঐতিহ্যর প্রতীক হলেও এটি কিন্তু পুরোপুরি দেশীয় ঐতিহ্যেরও নয়। বরং মুঘল ও পারসিক ঐতিহ্যের এক সুন্দর মেলবন্ধন জামদানি শাড়িতে মিশে আছে। আবার অনেকে মনে করেন ফারসি ‘জাম’ শব্দের অর্থ হল উৎকৃষ্ট মদ ও ‘দানি’ শব্দের অর্থ হল পেয়ালা। অর্থাৎ জাম বা মদ পরিবেশনকারী ইরানি সাকির পরনের মসলিন থেকেই নাকি জামদানি শব্দের উদ্ভব হয়েছে। 

বাংলায় বস্ত্রশিল্প এর প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে (আনু. ৩০০ খ্রি), চর্যাগীতির বিভিন্ন পঙ্ক্তি এবং প্লিনির রচনায়, খ্রিস্টীয় প্রথম দশকে রচিত পেরিপ্লাস অব দি এরিথ্রিয়ান সি গ্রন্থে এবং মার্কোপলো, ইবনে বতুতা, চীনা পরিব্রাজক ও ফরাসী রাষ্ট্রদূতের বর্ণনায়। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বঙ্গ ও পুন্ড্র এলাকায় তৈরি সূক্ষ্ম বস্ত্রের উল্লেখ আছে। বঙ্গ ও পুন্ড্রতে চার প্রকার বস্ত্রের প্রচলন ছিল: ক্ষৌম, দুকূল, পত্রোর্ণ ও কার্পাসী। নকশাদার জামদানি শাড়ি বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ, লোকমুখে প্রচলিত কাহিনী, শ্লোক, বিবরণ থেকে মনে হয় যে, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম দশক থেকে বাংলায় সূক্ষ্ম মিহিবস্ত্র সমাদৃত হয়ে আসছিল। বাংলার কার্পাস বা কাঁপাশ বস্ত্রের বিকাশ ঘটেছে অনেক বিবর্তনের মাধ্যমে। দুকূল নামের বস্ত্রের ক্রমবিবর্তনই মসলিন। জামদানি নকশার প্রচলন ও মসলিনের বিকাশ পাশাপাশি শুরু হয়েছিল মনে হয়। উল্লেখ্য, ইরাকের বিখ্যাত ব্যবসায় কেন্দ্র মসুলে যে সূক্ষ্ম বস্ত্র তৈরি হতো সেটিকে মসুলি বা মসুলিন বলা হতো। নবম শতাব্দীতে আরব ভূগোলবিদ সোলায়মানের স্রিল সিলাত-উত-তওয়ারিখে উল্লেখিত রুমি নামক রাজ্যে সূক্ষ্ম ও মিহি সুতিবস্ত্রের বিবরণ পাওয়া যায়। রুমি রাজ্যকে বাংলাদেশের সঙ্গে অভিন্ন মনে করা হয়। চতুর্দশ শতাব্দীতে ইবনে বতুতা সোনারগাঁয়ের সুতিবস্ত্রের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে ইংরেজ পরিব্রাজক র্যা লফ ফিচ এবং ঐতিহাসিক আবুল ফজল সোনারগাঁয়ে প্রস্ত্ততকৃত মসলিনের প্রশংসা করেছেন। জামদানি শিল্পকর্ম পরিপূর্ণতা লাভ করে মুগল আমলে। ঢাকা জেলার প্রত্যেক গ্রামেই কমবেশি তাঁতের কাজ হতো।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে জামদানি শিল্পের উন্নতির জন্য সরকার থেকে তাঁতিদের আর্থিক সাহায্য দেওয়া শুরু হয়। কিন্তু জামদানি শাড়ি তৈরির বিপুল পরিশ্রমের জন্য এখন তাঁতিরা আর এই পেশায় আসতে চান না। তবে জামদানির মতো খানদানী শাড়ির চাহিদা তো কখনই ফুরনোর নয়। তাই আজও ঢাকার জামদানি শিল্প তার প্রাচীন জৌলুস খুইয়েও বেঁচে আছে।

জামদানি নকশার প্রধান বৈশিষ্ট্য এর জ্যামিতিক অলঙ্করণ। জামদানি নকশা বর্তমানের মত কাগজে এঁকে নেওয়া হতো না। দক্ষ কারিগর স্মৃতি থেকে কাপড়ে নকশা তুলতেন। নকশা অনুযায়ী বিভিন্ন জামদানি বিভিন্ন নামে পরিচিত, যেমন পান্না হাজার, দুবলি জাল, বুটিদার, তেরছা, জালার, ডুরিয়া, চারকোণা, ময়ূর প্যাঁচ, কলমিলতা, পুঁইলতা, কচুপাতা, কাটিহার, কলকা পাড়, আঙুরলতা, সন্দেশ পাড়, প্রজাপতি পাড়, দুর্বা পাড়, শাপলাফুল, বাঘনলি, জুঁইবুটি, শাল পাড়, চন্দ্র পাড়, চন্দ্রহার, হংস, ঝুমকা, কাউয়ার ঠ্যাঙা পাড়, চালতা পাড়, ইঞ্চি পাড় ও বিলাই আড়াকুল নকশা, কচুপাতা পাড়, বাড়গাট পাড়, করলাপাড়, গিলা পাড়, কলসফুল, মুরালি জাল, কচি পাড়, মিহিন পাড়, কাঁকড়া পাড়, শামুকবুটি, প্রজাপতি বুটি, বেলপাতা পাড়, জবাফুল, বাদুড় পাখি পাড় ইত্যাদি।

বর্তমানে শাড়ির জমিনে গোলাপফুল, জুঁইফুল, পদ্মফুল, কলারফানা, আদারফানা, সাবুদানা ইত্যাদি নকশা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ঐতিহ্যবাহী জামদানি নকশাকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াস চলছে। ছোট ছোট বিভিন্ন ফুলের বুটি তোলা জামদানি বুটিদার নামে পরিচিত। জামদানি বস্ত্রে ছোট ছোট ফুলগুলি যদি তেরছাভাবে সারিবদ্ধ থাকে তাকে তেরছা জামদানি বলে। এ নকশা শুধু যে ফুল দিয়েই হবে তা নয়, ময়ূর বা লতাপাতা দিয়েও হতে পারে। ফুল, লতার বুটি জাল বুননের মতো সমস্ত জমিনে থাকলে তাকে জালার নকশা বলা হয়। সারা জমিনে সারিবদ্ধ ফুলকাটা জামদানি ফুলওয়ার নামে পরিচিত। ডুরিয়া জামদানি ডোরাকাটা নকশায় সমৃদ্ধ থাকে। বেলওয়ারি নামে চাকচিক্যপূর্ণ সোনারুপার জরিতে জড়ানো জামদানি মুগল আমলে তৈরি হতো। এ ধরনের জামদানি সাধারণত হেরেমের মহিলাদের জন্য বিশেষভাবে বোনা হতো।

বর্তমানে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় জামদানি পাওয়া যায়। ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটের জামদানি শাড়ির দোকানগুলোতে আপনার পছন্দ মত অর্ডার দিয়ে জামদানি শাড়ি আনিয়ে নিতে পারেন । ওই দোকানিরাই আপনার চাহিদা অনুযায়ী জামদানি পল্লী থেকে অর্ডার দিয়ে আপনার শাড়ি আপনার হাতে পৌছে দেবে, তবে এক্ষেত্রে দাম একটু বেশি গুনতে হবে । সোনারগাঁও লোকজ জাদুঘর থেকে কিনলে মনে হয় না অর্ডার দেবার প্রয়োজন আছে কারণ তাদের কাছে এত এত কালেকশন থাকে, তবুও অর্ডার দিলে মোটামোটি দামেই পাবেন আপনার পছন্দের শাড়ি। আসলে কাপড়ের বুনন আর মানের উপর দাম ওঠানামা করে। সুফিয়া কামাল সেতুর আশেপাশে জামদানী পল্লী আছে সেখান থেকে আমার জানামতে জামদানী শাড়ীগুলা পরে মার্কেটে আসে। সেখানে যে শাড়ী আপনি২০০০-২৫০০টাকায় কিনতে পারবেন সেগুলা ঢাকার মার্কেটে৪০০০-৫০০০ কিংবা তার ও উপরে দাম চলে যায়।এছাড়া মিরপুর যেতে পারেন বেনারসী পল্লীতে, ওখানকার জামদানি শাড়ির দোকানগুলোতেও অর্ডার নিয়ে থাকে । 

ছবি ও তথ্য – ইন্টারনেট 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers