রবিবার, ২৬ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ , ১৮ জিলকদ ১৪৪৫

অন্যান্য
  >
নারী দিবস

নারীদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এগিয়ে যেতে হবে : মুক্তা ধর

সুমিত দত্ত ও মেহেদী হাসান ৮ মার্চ , ২০২২, ১৫:১৭:৩০

  • ছবি : জাকির হোসেন

ঢাকা : আজ ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য—‘টেকসই আগামীর জন্য, জেন্ডার সমতাই আজ অগ্রগণ্য’।
 
আজকের এই নারী দিবসে কথা হয় একজন সফল নারীর সঙ্গে। তিনি হলেন সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মুক্তা ধর।  আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে নানা প্রসঙ্গে নিউজজি২৪ডট কমের সঙ্গে কথা হয় তার। এ সময় তিনি বলেন, নারীদের সব সময় সফলতার কথা চিন্তা করলে হবে না, কাজ করার সময় ব্যর্থতা আসতেই পারে। ব্যর্থ হলে আরো বেশি দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে যেতে হবে। তাতেই সফলতা আসবে।
 
তার সাক্ষাৎকারের একটি অংশ তুলে ধরা হলো
 
নিউজজি২৪ডট কম : আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুভেচ্ছা নিবেন। আন্তর্জাতিক নারী দিবস সম্পর্কে কিছু জানতে চাই।
 
মুক্তা ধর: আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের নারীদের জন্য গর্ব। শুধু আন্তর্জাতিক নারী দিবস নয়, প্রতিদিনই নারীদের জন্য একটি দিবস। বিশেষ করে এ দিনটি আমি বলব প্রত্যেক নারীর জন্য একটা গর্ব এবং অহংকারের জায়গা। এ দিনটাকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করি।
 
নিউজজি২৪ডট কম : আপনার আজকের সফলতার পেছনে কে বা কারা ছিল তাদের সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন?
 
মুক্তা ধর:  আসলে প্রতিটা মানুষের সফলতার পিছনে পরিবারের সবাই কম বেশি ভূমিকা রাখেন । আমি মনে করি কারো জন্য কিছু করা সেটা প্রত্যেকটা মানুষের দায়িত্ব। তবে আমাকে আসলেই ওই ভাবে সফল বলা যাবে না আমি চেষ্টা করছি আমার কাঙ্খিত লক্ষে পৌঁছানোর। আমার বাবা-মা এবং আমার আত্মীয়-স্বজন যারা আছেন এ ক্ষেত্রে সবার  ভূমিকা অনস্বীকার্য। আমার বাবা মারা গেছেন, আমার মা আছেন। সেই স্কুল জীবন থেকে শুরু করে তারা দিকনির্দেশনা, গাইডলাইন যেভাবে করেছেন আমি সেই ভাবেই বড় হয়েছি। আমাকে যে ভাবে পথ চলতে শিখিয়েছেন তারই ধারাবাহিকতায় মানুষের জন্য যতটুকু করতে পারি সেটা বাবা মার আশির্বাদ ছাড়া সম্ভব না। আমি যেখানে আছি পুলিশে এখানে ২৪/৭ ঘণ্টা কাজ করতে হয় এটা আমি করতে পারি সম্পূর্ণ আমার মায়ের জন্য। মা না থাকলে সম্ভব হতো না। তাদের অনুপ্রেরণা, ভালোবাসা, ভরসা পেয়েই আজকের আমি।
 
নিউজজি২৪ডট কম: নারী ভিকটিমদের কীভাবে সাপোর্ট দেন?
 
মুক্তা ধর: আমরা নারী ভিকটিমদের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। সিআইডিতে যারা নারী সদস্য আছেন তাদের কাছে নারী ভিকটিমরা যাতে সহজেই তার সমস্যার কথাগুলি বলতে পারেন সেরকম একটা পরিবেশের ব্যবস্থা করি। তাদেরকে অভয় দেই তারা অনেক ইজি হয়। আমাদের তদন্তও সহজ হয়। আমি মনে করি কিছুটা হলেও মামলার ভিকটিম নারীর ভরসার জায়গা তৈরি করি। এবং দ্রুত সময়ে সেই মামলার রহস্য উন্মোচন করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করি।
 
নিউজজি২৪ডট কম: সিআইডি তো খুব দায়িত্বশীল জায়গা এখানে আপনার কাজ নিয়ে জানতে চাই।
 
মুক্তা ধর: আমরা সব সময় মানুষের জন্য কাজ করেছি। আজকে আমি সিআইডিতে আছি এখানেও মানুষের জন্য কাজ করছি। মানুষের জন্য যতটুকু করতে পারি ততটুকু করে যাচ্ছি। আমি মনে করি যে পর্যন্ত এসেছি এর পেছনে আমার বাবা মায়ের উৎসাহ, অনুপ্রেরণা ছাড়া কোনো কিছু সম্ভব ছিল না। এখনও পর্যন্ত আমি আমার মায়ের সঙ্গে থাকি কারণ আমার মায়ের পূর্ণ সহযোগিতা ছাড়া বিশেষ করে আমি এমন একটা দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে কাজ করতে পারতাম না। আমাদের পুলিশের যেভাবে কাজ করতে হয় মায়ের সহযোগিতা ছাড়া এটা আসলেই সম্ভব হতো না। তবে আমরা সিআইডির প্রতিটা সদস্য পরিপূর্ণ দায়িত্ব নিয়েই দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।
 
নিউজজি২৪ডট কম: একজন নারীর সফলতার মূলে কোন বিষয়গুলো সহায়ক ভূমিকা পালন করে? সেক্ষেত্রে পরিবারের সহযোগিতা কতখানি দরকার বলে আপনি মনে করেন?
 
মুক্তা ধর: নারীদের সফলতায় আসতে হলে অনেক দূর কাজ করতে হয়। একজন নারীকে মা হতে হয়, তিনি কখনও সন্তান, আবার কারো স্ত্রী, অনেকগুলি পার্ট তার জীবনের মধ্যে থাকে। সে যদি সবগুলি বিষয়কে সমন্বয় করতে না পারে সেই ক্ষেত্রে নারীরা ব্যর্থ হতে পারে।
 
নিউজজি২৪ডট কম: কর্মজীবী নারী সম্পর্কে কিছু জানতে চাই?
 
মুক্তা ধর: আমি আমার কথা বলি ধরুন আমি আমার কর্মক্ষেত্রে সময় দিতে গিয়ে আমার সন্তানকে সময় দিতে পারি না। যতটুকু সময় দেয়ার দরকার ছিল কর্মক্ষেত্রে এসে আসলে সেটা দিতে পারি না। তাছাড়া, পরিবারের সহযোগিতা একজন কর্মজীবী নারীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এসব ক্ষেত্রে পরিবারের সাপোর্ট ছাড়া আসলেই সম্ভব না। যেমন আমি রাত দশটা এগারটার সময় বাসায় যাই। কোনো সময় অনেক কাজ এক সঙ্গে করতে পারি। সেটা আমার ক্ষেত্রে সম্ভব হচ্ছে শুধুমাত্র আমার মায়ের জন্য। আমার ছোট ছোট দুটো বাচ্চাকে আমার মা দেখাশোনা করেন। যদি আমার মা না থাকত তাহলে হয়ত আমি এভাবে চিন্তাই করতাম না বা এগিয়ে যেতে পারতাম না। আমি যতই কাজ করি না কেন আমাকে পেছনে কোনো কিছু টেনে ধরত হয়ত । সেই ক্ষেত্রে আমি বলব আমার মায়ের জন্য আজ এখানে আসতে পেরেছি। অন্য নারী যারা আছে তাদের এই সাপোর্ট পাচ্ছে না বা অনেক ক্ষেত্রে পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাদের জন্য আমি বলব এভাবে সমন্বয় সাধন করে কাজ করাটা খুব চ্যালেঞ্জিং এ ক্ষেত্রে পরিবার অবশ্যই বড় একটি সাপোর্ট । তবে শুধু পরিবার নয়, আমরা যেভাবেই কাজ করি না কেন, সেখানে সেই বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ আমি যাদের সাথে কাজ করব তারা আমাকে কতটুকু মূল্যায়ন বা সহযোগিতা করছে সেটাও একটি বিষয়। আমার যে প্রবলেম আছে সেই প্রবলেমগুলো উত্তোলনের জন্য সমাধানের পথ নির্দিষ্ট করে সহকর্মীদের সাপোর্ট পাওয়া এটাও বড় একটা ভূমিকা পালন করে। মোট কথা পরিবার, সহকর্মী ও চৌকস হয়ে কাজ করলেই নারীরা সফলতার দ্বারে পৌঁছাতে পারে।
 
নিউজজি২৪ডট কম:  আপনার অবসর সময় কীভাবে কাটে?
 
মুক্তা ধর: আসলে আমরা যারা সিআইডি বা পুলিশে কাজ করি তারা অনেক ক্ষেত্রে পরিবারকে সময় দিতে ব্যর্থ হই। অবসর সময় বলতে যতটুকু সময় পাই আমার বেশির ভাগ সময় বাসায় পরিবারের সঙ্গে, আমার বাচ্চাদের সঙ্গে, আমার মায়ের সঙ্গে কাটানো হয়। এভাবেই আমার অবসর সময় চলে যায়।
 
নিউজজি২৪ডট কম:  আপনার অবসর সময় কীভাবে কাটে?
 
মুক্তা ধর: আসলে আমরা যারা সিআইডি বা পুলিশে কাজ করি তারা অনেক ক্ষেত্রে পরিবারকে সময় দিতে ব্যর্থ হই। অবসর সময় বলতে যতটুকু সময় পাই আমার বেশির ভাগ সময় বাসায় পরিবারের সঙ্গে, আমার বাচ্চাদের সঙ্গে, আমার মায়ের সঙ্গে কাটানো হয়। এভাবেই আমার অবসর সময় চলে যায়।
 
নিউজজি২৪ডট কম: ১৯২০ সালের ৮ মার্চ সমান অধিকারের জন্য নারীরা আন্দোলন করেছিল আসলেই কি এযুগে এসেও সমান অধিকার সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?
 
মুক্তা ধর: আমাদের দেশের সংবিধানে নারী পুরুষের সমান অধিকারের কথা রয়েছে। সেই সংবিধানে নারীর অধিকার সম্পর্কে বলা আছে। এটা হতে পারে কিছুটা অথবা কিছু জায়গায় কেউ অবহেলার শিকার হচ্ছেন। আমরা হয়তো অল্প কিছু জায়গায় বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে হয়ত চিন্তা করি যে, নারীরা অবহেলিত হচ্ছেন। কিন্তু আমি মনে করি, আজকে নারীরা শুরু থেকেই প্রত্যেকটা পদক্ষেপ চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। দেখা গেছে বর্তমানে নারীরা বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে এবং বড় বড় জায়গায় আধিপত্য বিস্তার করে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছে এবং তারা সফল হচ্ছে। আর পরিবারের উদ্দ্যেশে আমি বলব আমি বাইরে এসে কাজ করছি এবং বাসায় গিয়ে আমাকে সবকিছু দেখতে হচ্ছে। কিন্তু একজন মা তার সন্তানকে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছেন, ঘরটাকে সুন্দরভাবে পরিপাটি করে রাখছেন, সংসারের সমস্ত কাজ করছেন। অনেক মানুষ মনে করেন সংসারের কাজ কম কিন্তু একটা সংসারে অনেক কাজ থাকে। সেগুলোকে হয়তো পুরুষেরা কিছু মনে করে না। নারীরা যেভাবে তার সন্তান, স্বামী, ঘরবাড়ি সাজিয়ে রাখছেন দেখা যায় এতকিছুর পরেও পরিবারে অনেক ক্ষেত্রে মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। কোনো কোনো সময় আমরা দেখি নারীরা তাদের সন্তানকে স্কুলে দিয়ে বাইরে পেপার বিছিয়ে বসে আছেন। তারা তাদের সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালন করছেন যেটা হয়তো পুরুষের করার কথা ছিল। আমি বলব নারীরা আমাদের সমাজে প্রতিটা ক্ষেত্রে ঘরে-বাইরে সমানভাবে দক্ষতা ও সততার সাথে মায়া-মমতায় সবকিছু আগলে রেখে দায়িত্ব পালন করছেন। এবং তার মূল্যায়নও সেভাবেই হওয়া উচিত।
 
নিউজজি২৪ডট কম: একজন সফল নারী হিসেবে নারীদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী? এবং কীভাবে একজন নারী সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে?
 
মুক্তা ধর: আসলে প্রতিষ্ঠিত নারী বলতে এটা নির্ভর করে তার স্ব-স্ব অবস্থানে । আমি কতটুকু চাচ্ছি যেমন আমি যদি আমার কথা বলি সে ক্ষেত্রে আমি বিভিন্ন কাজ করি। কাজ করতে গেলে ছোটখাটো ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকবে। সফলতা তখন আসবে যখন কেউ বলবে কাজটা ভালো হয়েছে। সেটাতে সে আরো উৎসাহ পাবে এবং আরো ভালো করতে সে চেষ্টা চালাবে। ধরুন যে সমস্ত মামলা নিয়ে কাজ করি হয়ত একটি বড় মামলার রহস্য উন্মোচন হলো সঠিক তথ্য বের হলো, আমি মনে করি এটাই আমার সফলতা। তবে আমি বলতে চাই সব কাজে যে পজিটিভ রেজাল্ট আসবে সেটা না। নারীদের সব সময় সফলতার কথা চিন্তা করলে হবে না, হয়ত অনেক কাজ করার সময় ব্যর্থতা আসতেই পারে তবে ব্যর্থতার ভয়ে যে কাজ করা যাবে না সেটা না। কর্মক্ষেত্রের পাশাপাশি পরিবারের প্রতি তার যতটুকু দায়িত্ব ততটুকু করলে একজন নারী সফল হতে পারেন বলে আমি আশা করি। সবাইকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা।
 
নিউজজি২৪ডট কম: সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ
 
মুক্তাধর: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন