বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ৩২ আষাঢ় ১৪৩৩ , ৩০ মুহররম ১৪৪৮

খেলা

একের পর এক বিতর্কে বিশ্বকাপের নিরপেক্ষতা ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন

ক্রীড়া ডেস্ক জুলাই ৮, ২০২৬, ১৭:৩৫:৩৩

111
  • একের পর এক বিতর্কে বিশ্বকাপের নিরপেক্ষতা ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন

ঢাকা: বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের আবেগ, গৌরব ও ঐক্যের প্রতীক। চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত এই আসরকে ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশা থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিযোগিতা, নিরপেক্ষ রেফারিং এবং স্বচ্ছ আয়োজন। কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্বকাপে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসরের গ্রহণযোগ্যতা কি ধীরে ধীরে ক্ষয় হচ্ছে?

বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নাটকীয় ম্যাচগুলোর একটি ছিল আর্জেন্টিনা ও মিশরের লড়াই। দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। তবে ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রেফারিং এবং ভিএআরের একাধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত।

ম্যাচের রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে এবং ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)-এর কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে মিশর। প্রধান কোচ হোসাম হাসান ও ফরোয়ার্ড মোস্তাফা জিকো প্রকাশ্যে রেফারিংয়ের সমালোচনা করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অসংখ্য সমর্থক, সাংবাদিক ও সাবেক ফুটবলার দাবি করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সিদ্ধান্ত মিশরের বিপক্ষে গেছে। অনেকের মতে, কয়েকটি সিদ্ধান্ত বুঝেশুনেই আর্জেন্টিনার পক্ষে নেওয়া হয়েছে। যা নিয়ে সমালোচনায় উত্তাল বিশ্ব।

ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে কোটি কোটি সমর্থকের আবেগ, উচ্ছ্বাস ও প্রত্যাশা বরাবরের মতোই তুঙ্গে। তবে এবারের বিশ্বকাপে একের পর এক বিতর্কিত রেফারিং, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR)-এর সিদ্ধান্ত এবং ম্যাচ পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ফলে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে কয়েকটি ম্যাচে পেনাল্টি, অফসাইড এবং ফাউল সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে খেলোয়াড়, কোচ ও ফুটবল বিশ্লেষকদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা গেছে। অনেকের অভিযোগ, একই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন ম্যাচে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যা রেফারিংয়ের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

বিশেষ করে VAR প্রযুক্তি চালুর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মানবিক ভুল কমানো। কিন্তু বাস্তবে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও বিতর্ক থামছে না। অনেক সমর্থকের মতে, VAR থাকা সত্ত্বেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যথেষ্ট স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি।

অন্যদিকে, ফুটবল বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক ফুটবলের অংশ হলেও, প্রতিটি বিতর্ককে পক্ষপাতিত্বের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাদের মতে, দ্রুতগতির খেলায় অনেক সিদ্ধান্তই মুহূর্তের মধ্যে নিতে হয় এবং প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও শতভাগ নির্ভুলতা নিশ্চিত করা কঠিন।

তবে একটি বিষয় নিয়ে অধিকাংশেরই মত এক—বিশ্বকাপের মতো মর্যাদাপূর্ণ আসরে রেফারিংয়ের মান, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা এবং VAR ব্যবহারের প্রক্রিয়া আরও উন্নত করা জরুরি। কারণ, এমন প্রতিযোগিতায় একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তই একটি দলের স্বপ্ন ভেঙে দিতে পারে এবং পুরো টুর্নামেন্টের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

 

সমর্থকদের আস্থায় ধাক্কা

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। রেফারির একটি ভুল সিদ্ধান্ত কয়েক মিনিটের মধ্যেই কোটি মানুষের আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। এর ফলে শুধু একটি ম্যাচ নয়, পুরো টুর্নামেন্টের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। অনেক সমর্থকের অভিযোগ, বড় দল কিংবা প্রভাবশালী ফুটবল শক্তিগুলো কখনও কখনও সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরোক্ষ সুবিধা পায়। যদিও এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে সবসময় প্রমাণ পাওয়া যায় না, তবুও এসব ধারণা বিশ্বকাপের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর।

 

ফিফার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা FIFA-এর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো প্রতিযোগিতার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা, VAR-এর অডিও প্রকাশ, রেফারিদের জবাবদিহিতা এবং প্রযুক্তির আরও কার্যকর ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। শুধু নিয়ম প্রণয়ন করলেই হবে না, সেই নিয়মের সমান ও ধারাবাহিক প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি।

 

ফুটবলের সৌন্দর্য নাকি বিতর্কের আধিপত্য?

ফুটবল সবসময়ই আবেগের খেলা। ভুল সিদ্ধান্ত অতীতেও ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু প্রযুক্তির যুগে যখন নির্ভুলতার প্রত্যাশা বেড়েছে, তখন একই ধরনের ভুল বারবার ঘটলে তা আর সাধারণ মানবিক ত্রুটি হিসেবে গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ম্যাচের ফল নির্ধারণে একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত কখনও একটি দেশের কোটি মানুষের স্বপ্ন ভেঙে দিতে পারে।

বিশ্বকাপের মর্যাদা গড়ে উঠেছে দীর্ঘ ইতিহাস, সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা এবং কোটি মানুষের বিশ্বাসের ওপর। সেই বিশ্বাস যদি বারবার বিতর্কিত সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে ক্ষতি শুধু একটি দলের নয়—ক্ষতি বিশ্ব ফুটবলেরও। তাই বিশ্বকাপের গ্রহণযোগ্যতা অটুট রাখতে FIFA-কে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় মাঠের লড়াইয়ের চেয়ে বিতর্কই বড় হয়ে উঠবে, আর ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাবে বিশ্বকাপের বহু বছরের অর্জিত মর্যাদা।

নিউজজি/সিআর/নাসি  

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers