মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ , ২ রবিউস সানি ১৪৪৮

খেলা

ব্যর্থতার কান্না থেকে বিশ্বকাপের উল্লাস, আর্জেন্টিনায় মেসির অবিশ্বাস্য পথচলা

ক্রীড়া ডেস্ক সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬, ১২:১০:৪৮

137
  • সংগৃহীত

একটি জার্সি, দুই দশকের বেশি সময়, অসংখ্য রাতের কান্না আর শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল কিছু মুহূর্ত। আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে লিওনেল মেসির পথচলা ছিল কখনো হতাশার, কখনো বিতর্কের, আবার শেষ পর্যন্ত তা পরিণত হয়েছে এক অবিশ্বাস্য সাফল্যের গল্পে। ২০০৫ সালে শুরু হওয়া সেই যাত্রার সমাপ্তি ঘটল ২০২৬ বিশ্বকাপের পর। ৩৯ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর সময় মেসির নামের পাশে ২০৭ ম্যাচ ও ১২৫ গোল।

শুরুটা ২০০৫ সালে

আর্জেন্টিনার সিনিয়র জাতীয় দলে মেসির অভিষেক ২০০৫ সালের আগস্টে। হাঙ্গেরির বিপক্ষে সেই ম্যাচে মাত্র কয়েক মিনিট মাঠে ছিলেন তিনি; বদলি হিসেবে নেমে দ্রুতই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। কিন্তু সেটিই ছিল একটি মহাকাব্যের শুরু।

এর আগে অবশ্য যুব পর্যায়েই মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়েছিলেন। ২০০৫ সালের অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন দলের অন্যতম প্রধান তারকা। সেই টুর্নামেন্টে গোল্ডেন বুট ও গোল্ডেন বল জেতার পাশাপাশি আর্জেন্টিনাকে শিরোপাও এনে দেন। ২০০৮ সালে অলিম্পিকে জেতেন সোনার পদকও।

জাতীয় দলের শুরু, কিন্তু সাফল্য অধরা

বার্সেলোনায় একের পর এক রেকর্ড গড়ছিলেন মেসি। কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে সাফল্যের প্রশ্ন উঠলেই তাঁকে ঘিরে তৈরি হতো অন্যরকম চাপ। ২০০৭ কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হার দিয়ে শুরু হয় বড় টুর্নামেন্টে হতাশার অধ্যায়। এরপর ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ে পরাজয়। ২০১৫ ও ২০১৬—টানা দুই কোপা আমেরিকার ফাইনালেও চিলির কাছে টাইব্রেকারে হারতে হয় আর্জেন্টিনাকে। বিশ্বের সেরা ফুটবলার হয়েও দেশের হয়ে বড় কোনো শিরোপা না জেতার প্রশ্নটি তখন মেসির ক্যারিয়ারকে ছাপিয়ে যাচ্ছিল।

২০১৬: মেসির প্রথম বিদায়

২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে পেনাল্টিতে হারের পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন মেসি। এরপরই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি। কিন্তু আর্জেন্টিনার গল্পে সেটিই ছিল না শেষ অধ্যায়। দেশের মানুষের আবেগ, সতীর্থ ও কোচদের অনুরোধ—সব মিলিয়ে মেসি ফিরে আসেন জাতীয় দলে। সেই প্রত্যাবর্তনই শেষ পর্যন্ত বদলে দেয় আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাস।

২০২১: অপেক্ষার অবসান

দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে আসে সেই মুহূর্ত। ২০২১ কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলকে তাদেরই মাটিতে হারিয়ে শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। মেসির হাতে ওঠে সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি। মারাকানার সেই রাত শুধু একটি শিরোপা জয়ের গল্প ছিল না; সেটি ছিল মেসি ও আর্জেন্টিনার সম্পর্কের মোড় ঘুরে যাওয়ার মুহূর্ত।

যে মেসিকে একসময় বলা হতো জাতীয় দলের হয়ে ব্যর্থ, তিনিই এবার হয়ে উঠলেন দেশের সবচেয়ে বড় নায়ক।

২০২২: মেসির জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়

তারপর এল কাতার বিশ্বকাপ। প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে হার। কিন্তু সেখান থেকে আর্জেন্টিনাকে ঘুরে দাঁড় করান মেসি। গোল, অ্যাসিস্ট, নেতৃত্ব—সবকিছুর সমন্বয়ে দলকে ফাইনালে নিয়ে যান তিনি। ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালটি হয়ে ওঠে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচ। মেসি করেন দুই গোল। টাইব্রেকারেও নিজের দায়িত্ব পালন করেন। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে হারিয়ে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। মেসির হাতে ওঠে সেই ট্রফি, যেটি নিয়ে তাঁর ক্যারিয়ারজুড়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন ছিল। কাতারে মেসি সাত ম্যাচে সাত গোল ও তিনটি অ্যাসিস্ট করে গোল্ডেন বলও জেতেন। তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে একই আসরে গ্রুপ পর্ব থেকে ফাইনাল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে গোল করার কৃতিত্বও গড়েন।

২০২৪: আবারও শিরোপা

বিশ্বকাপ জয়ের পরও থামেননি মেসি। ২০২৪ কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনাকে আবারও চ্যাম্পিয়ন করেন তিনি। কলম্বিয়ার বিপক্ষে ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে গোল করে লাউতারো মার্তিনেস দলকে জেতান, আর মেসি যোগ করেন ক্যারিয়ারের আরেকটি আন্তর্জাতিক শিরোপা। কোপা আমেরিকার ইতিহাসেও মেসি তৈরি করেছেন একাধিক রেকর্ড। তিনি সাতটি আসরে খেলেছেন এবং টুর্নামেন্টটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩৯ ম্যাচে অংশ নেওয়ার রেকর্ড গড়েছেন। তাঁর কোপা আমেরিকা গোলসংখ্যা ১৪।

২০২৬: শেষ মঞ্চেও ফাইনাল

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ টুর্নামেন্টেও মেসি আর্জেন্টিনাকে নিয়ে যান বিশ্বকাপের ফাইনালে। কিন্তু এবার গল্পটা কাতারের মতো হলো না। স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হেরে রানার্সআপ হয় আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচই শেষ পর্যন্ত হয়ে থাকে নীল-সাদা জার্সিতে মেসির শেষ আন্তর্জাতিক উপস্থিতি। বিশ্বকাপের ছয়টি আসরে অংশ নেওয়া মেসির বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২১-এ। ২০২৬ বিশ্বকাপেও তাঁর গোল ছিল আটটি।

শেষ হলো ২১ বছরের অধ্যায়

২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর ৩৯ বছর বয়সী মেসি অবশেষে জানিয়ে দেন—আর্জেন্টিনার হয়ে আর খেলবেন না। বিদায় নিলেন ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল করে। দুটিই আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে রয়েছে ৬৮টি অ্যাসিস্টও।

জাতীয় দলের হয়ে মেসির বড় অর্জনের তালিকাটিও দীর্ঘ—

🏆 ২০০৫ — অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ

🥇 ২০০৮ — অলিম্পিক সোনা

🏆 ২০২১ — কোপা আমেরিকা

🏆 ২০২২ — ফাইনালিসিমা

🏆 ২০২২ — বিশ্বকাপ

🏆 ২০২৪ — কোপা আমেরিকা

অর্থাৎ সিনিয়র দলের হয়ে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা ও ফাইনালিসিমা—সবকিছুই জিতেছেন মেসি।

রেকর্ডেও অনন্য

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির সবচেয়ে বড় রেকর্ডগুলোও বিস্ময়কর।

ম্যাচ: ২০৭ — আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ

গোল: ১২৫ — আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ

অ্যাসিস্ট: ৬৮

বিশ্বকাপ: ৬টি আসরে অংশগ্রহণ

বিশ্বকাপ গোল: ২১

কোপা আমেরিকা: ৭টি আসর, ৩৯ ম্যাচ

কোপা আমেরিকা গোল: ১৪

বিশ্বকাপ শিরোপা: ১

কোপা আমেরিকা: ২

ফাইনালিসিমা: ১

অলিম্পিক সোনা: ১

অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ: ১

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ছয় বছরে মেসির পারফরম্যান্স ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ওই সময়ে মাত্র ৫৭ ম্যাচে তাঁর গোল ৫০—অর্থাৎ আর্জেন্টিনার হয়ে করা মোট ১২৫ গোলের প্রায় ৪০ শতাংশ এসেছে ক্যারিয়ারের শেষ ছয় বছরে।

সমালোচনা থেকে কিংবদন্তি

মেসির আর্জেন্টিনা-অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় গল্প সম্ভবত তাঁর গোল বা ট্রফির সংখ্যা নয়—বরং মানুষের মন জয় করার পথটি। একসময় সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছিলেন, বার্সেলোনার মেসি কেন আর্জেন্টিনার হয়ে সেই একই মেসি নন। ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনাও ছিল প্রতিনিয়ত। কিন্তু ২০২১-এর কোপা আমেরিকা, ২০২২-এর বিশ্বকাপ এবং ২০২৪-এর কোপা আমেরিকা সেই বিতর্কের প্রায় সবটাই মুছে দেয়। বিশ্বকাপ হাতে মেসির সেই ছবি যেন তাঁর দীর্ঘ অপেক্ষার শেষ উত্তর হয়ে দাঁড়ায়। রাশিয়া, ব্রাজিল, জার্মানি, চিলি—ব্যর্থতার স্মৃতিগুলোকে পেছনে ফেলে কাতারে তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়টি লিখেছিলেন।

বিদায়, কিন্তু শেষ নয়

আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচ হয়তো হারের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। কিন্তু তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে শুধু শেষ ম্যাচ দিয়ে বিচার করার সুযোগ নেই। ২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোল, অসংখ্য অ্যাসিস্ট, ছয়টি বিশ্বকাপ, তিনটি বড় শিরোপা, ২০১৪ ও ২০২৬-এর বিশ্বকাপ ফাইনাল, ২০২২-এর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া—সব মিলিয়ে মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায় ফুটবলের ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। একসময় যে জার্সিতে মেসি সবচেয়ে বেশি কেঁদেছেন, শেষ পর্যন্ত সেই নীল-সাদা জার্সিতেই তিনি হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতীক।

মেসি এখন আর শুধু আর্জেন্টিনার সাবেক অধিনায়ক নন—আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের একটি পূর্ণ অধ্যায়ের নাম।

 

নিউজজি/সিআর

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers