বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ , ৩ জুমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

খেলা

পাকিস্তান ক্রিকেটের সংকটের নেপথ্যে কারা? মুখ খুললেন পদত্যাগী সাবেক কোচ

ক্রীড়া ডেস্ক সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৬, ১৫:২০:৩৭

189
  • সংগৃহীত

পাকিস্তান ক্রিকেটে একের পর এক কোচিং পরিবর্তন, নির্বাচক নিয়ে বিতর্ক এবং দল গঠনে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে দেশটির ক্রিকেট এখন গভীর সংকটে। সাম্প্রতিক সময়ে ইংল্যান্ড সফরে বড় ধাক্কার পর সাত ক্রিকেটারকে বাদ দেওয়া এবং প্রধান কোচ সরফরাজ আহমেদকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও তীব্র সমালোচনা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পদত্যাগ করা সাবেক কোচের বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তার মতে, পাকিস্তান ক্রিকেটের সমস্যার দায় শুধু ক্রিকেটারদের ওপর চাপিয়ে দিলে প্রকৃত চিত্র আড়াল হয়ে যায়। বরং দীর্ঘদিনের অস্থিতিশীল প্রশাসন, ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন এবং কোচদের কাজে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপই সংকটকে আরও গভীর করেছে।

পাকিস্তানের কোচিং কাঠামোয় অস্থিরতা অবশ্য নতুন নয়। গত কয়েক বছরেই গ্যারি কারস্টেন, জেসন গিলেস্পির মতো বিদেশি কোচদের সঙ্গে বোর্ডের সম্পর্ক নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কারস্টেন ২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় পদত্যাগ করেন। গিলেস্পিও পরে পাকিস্তান ক্রিকেটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানান। ২০২৪ সালের এপ্রিলে পাকিস্তান টেস্ট দলের হেড কোচ হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন গিলেস্পি। কিন্তু মাত্র আট মাস পর, ডিসেম্বরেই তিনি পদত্যাগ করেন। সেই ক্ষত আজও তরতাজা। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে গিলেস্পি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) ওপর ক্ষোভ তো উগড়ে দিয়েছেনই, দলটির প্রধান নির্বাচক আকিব জাভেদকে নিয়ে তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাও বলেছেন। ‘পাকিস্তান দলের দায়িত্ব নেওয়ার আগে এই চরম অস্থিরতা আর বিশৃঙ্খলা সম্পর্কে আমাকে নিশ্চিতভাবেই সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু একটা বড় আন্তর্জাতিক টেস্ট দলের কোচ হওয়াটা আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম হাইলাইট হতে পারত। পাকিস্তান ক্রিকেটের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ, সেখানকার মানুষ ক্রিকেট নিয়ে বাঁচে ও শ্বাস নেয়। এমন দেশের দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগটা আমি হাতছাড়া করতে চাইনি। আমি দারুণ সম্মানিত ও কৃতজ্ঞ বোধ করেছিলাম। জানতাম পরিবেশটা উত্তপ্ত আর বিশৃঙ্খল। তবে ক্যারিয়ারের ওই সময়ে দাঁড়িয়ে আমি নতুন চ্যালেঞ্জের খোঁজে ছিলাম। হুট করেই সুযোগটা আসে, মনে হয়েছিল তা আঁকড়ে ধরা উচিত। ভেবেছিলাম পাকিস্তান টেস্ট দলকে হয়তো আরও উন্নত করতে পারব।’

পিসিবি চেয়ারম্যান ও বোর্ডের পূর্ণ সমর্থন ছিল বলেই আকিব নিজেকে ‘অস্পৃশ্য’ মনে করতেন বলে মনে করেন গিলেস্পি, ‘একজন কোচ হিসেবে প্রতিদিন আপস করতে হতো। উনি সমঝোতায় বিশ্বাসী কোনো নির্বাচক ছিলেন না। অন্যের চিন্তা, মতামত বা আইডিয়া গ্রাহ্য করতেন না। মনে করতে পারেন উনি শোনেন, কিন্তু আসলে শোনেন না। ওনার নীতি ছিল একটাই—আমার কথা মেনে নাও, নয়তো পথ মাপো। চেয়ারম্যানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেই নিজের ইচ্ছামতো সব করতে পেরেছেন। এমন পরিবেশে কোনো আত্মসম্মানবোধ থাকা মানুষ কাজ করতে চাইবে বলে আমার মনে হয় না।’

সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক এই কোচকে উদ্ধৃত করে পাকিস্তানের ক্রিকেটে পরিকল্পনার অভাব ও ঘন ঘন সিদ্ধান্ত বদলের বিষয়টি সামনে এসেছে।

বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইংল্যান্ড সফর। প্রথম দুই টেস্টে বড় ব্যবধানে হারের পর মাঝসিরিজেই পাকিস্তান দলে ব্যাপক পরিবর্তন আনে পিসিবি। সাত ক্রিকেটারকে বাদ দেওয়ার পাশাপাশি সরফরাজ আহমেদ ও বোলিং কোচ উমর গুলকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তকে সাবেক অধিনায়ক রমিজ রাজা ‘প্যানিক বাটন’ চাপার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

পাকিস্তান ক্রিকেট যে ধ্বংসাত্মক এক চক্রে আটকা পড়েছে, তার জন্য আকিব জাভেদকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন গিলেস্পি, ‘এই সংকটের মূল হোতা আকিব জাভেদ। উনি যতক্ষণ থাকবেন, পাকিস্তান ক্রিকেট তত দিন পেছনেই হাঁটবে। পাকিস্তান ক্রিকেটের এখন শক্ত ক্রিকেট মস্তিষ্কের নেতৃত্ব প্রয়োজন। সঠিক কোচ নিয়ে আসুন, নেতৃত্ব কারা দেবে, সেই সিদ্ধান্ত তাঁদের নিতে দিন। ডেস্কে বসে বোর্ডের কর্তারা আর চেয়ারম্যান মিলে অধিনায়ক নির্বাচন করছেন—এর চেয়ে হাস্যকর আর কিছু হতে পারে না! যোগ্য কোচ আনুন, তাঁকে পরিবেশ গুছিয়ে নেওয়ার সময় দিন। এরপর কোচকে অধিনায়ক বাছাইয়ের ক্ষমতা দিয়ে ক্রিকেটটা পুনর্গঠন করতে দিন। কারণ, বর্তমানে পাকিস্তান ক্রিকেট কোনো ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছে না, কেবল অতলেই তলিয়ে যাচ্ছে।’

শুধু তাই নয়, ক্রিকেটারদের আচরণ নিয়েও তদন্ত শুরু করেছে পিসিবি। কয়েকজন খেলোয়াড়ের ফোন জব্দ করে তথ্য যাচাইয়ের খবরও সামনে এসেছে। ফলে মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি দলের ভেতরের পরিবেশ নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।

সাবেকদের অনেকেই মনে করছেন, পাকিস্তান ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সমস্যা কোনো একজন ক্রিকেটার বা কোচ নন। সমস্যার শিকড় প্রশাসনিক অস্থিরতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতিতে। সাবেক কোচদের ধারাবাহিকভাবে দায়িত্ব দেওয়া ও সরিয়ে ফেলার সংস্কৃতি সেই সমস্যাকেই আরও প্রকট করেছে।

এ কারণেই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—পাকিস্তান ক্রিকেটের ‘খলনায়ক’ কি ব্যর্থ ক্রিকেটার, কোচ, নাকি পুরো ব্যবস্থাপনাই? সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বলছে, ব্যক্তিকে দায়ী করার চেয়ে কাঠামোগত সমস্যার সমাধানই এখন পাকিস্তান ক্রিকেটের সবচেয়ে জরুরি কাজ।

 

নিউজজি/সিআর

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
 নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers