বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ২৭ সফর ১৪৪৮

খেলা
  >
ফুটবল

কৌশল বদলে ইংল্যান্ডকে কুপোকাৎ

নিউজজি ডেস্ক ১৬ জুলাই , ২০২৬, ১৮:২৭:৫৪

168
  • কৌশল বদলে ইংল্যান্ডকে কুপোকাৎ

ঢাকা: ৩৯ বছর বয়েসি লিওনেল মেসি আগের মতো দৌড়ান না, বেশিরভাগ সময়ই হাঁটতে দেখা যায় তাকে। তবে ফুটবলে শুধু গতি নয়, বুদ্ধিমত্তাও যে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে, সেটিই আরও একবার প্রমাণ করলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠেই যেন কোচের ভূমিকায় নেমে প্রতিপক্ষের দুর্বলতা খুঁজে বের করে তা কাজে লাগান তিনি। আর তাতেই নাটকীয় প্রত্যাবর্তন করে ২-১ গোলের জয়ে ফাইনালে ওঠে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

 

শুরুতে ইংল্যান্ডের দাপট

ম্যাচের প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনাকে চাপে রাখতে উচ্চ প্রেসিং কৌশল বেছে নেয় ইংল্যান্ড। উইঙ্গার অ্যান্থনি গর্ডন ও মরগান রজার্স আর্জেন্টিনার দুই সেন্টার-ব্যাককে চাপে রাখেন, যাতে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ সহজে ফুল-ব্যাকদের কাছে বল পাঠাতে না পারেন।

মাঝমাঠে জুড বেলিংহ্যামকে এনজো ফার্নান্দেজের দায়িত্ব দেওয়া হয়, ডেকলান রাইস নজর রাখেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের ওপর, আর তরুণ এলিয়ট অ্যান্ডারসনের কাজ ছিল মেসিকে আটকে রাখা। শুরুতে পরিকল্পনাটি সফলও হয়। অ্যান্ডারসনের আগ্রাসী মার্কিংয়ে মেসি কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েন।

 

ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেন মেসি

তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। মেসি আরও নিচে নেমে বল নিতে শুরু করেন। এতে অ্যান্ডারসন দ্বিধায় পড়ে যান—মেসিকে কতদূর অনুসরণ করবেন?

মেসির ধীরগতির হাঁটা এখানেই হয়ে ওঠে বড় অস্ত্র। প্রায় স্থির অবস্থা থেকে হঠাৎ গতিবৃদ্ধি করে বলের দিকে ছুটে যাওয়ায় ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ বারবার ছন্দ হারায়। ফলে আর্জেন্টিনা ধীরে ধীরে বলের দখল ফিরে পায় এবং নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে শুরু করে।

 

গর্ডনের গোল, এরপর মেসির জাদু

৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। এরপর প্রায় ৩০ মিনিট সেই লিড ধরে রাখে তারা।

কিন্তু ৮৫ মিনিটে মেসির বাড়ানো বল থেকে বক্সের বাইরে দুর্দান্ত শটে সমতা ফেরান এনজো ফার্নান্দেজ। এরপর যোগ করা সময়ে মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে হেডে জয়সূচক গোল করেন লাউতারো মার্তিনেজ।

 

গর্ডনের গোলের পর থেকে সমতা ফেরানো পর্যন্ত সময়ে ইংল্যান্ড মাত্র ১২ শতাংশ বলের দখল ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ফলে দ্বিতীয়ার্ধের অধিকাংশ সময়ই নিজেদের অর্ধে রক্ষণ সামলাতে ব্যস্ত থাকতে হয় থমাস টুখেলের দলকে।

 

অ্যান্ডারসনের আগ্রাসনই হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনার সুযোগ

শুরুর দিকে অ্যান্ডারসনের আগ্রাসী ডিফেন্ডিং কার্যকর হলেও পরে সেটিকেই নিজের সুবিধায় ব্যবহার করেন মেসি।

তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কিছুটা সময় বল পায়ে রেখে অ্যান্ডারসনকে সামনে টেনে আনতেন। এরপর এক টাচে সতীর্থের কাছে বল ছেড়ে দিতেন, ফলে অ্যান্ডারসনের ফাঁকা করে দেওয়া জায়গায় আক্রমণ গড়ে তোলা সহজ হয়ে যেত।

সমতাসূচক গোলের আগেও ঠিক এমনটাই ঘটে। শর্ট কর্নার থেকে ওয়ান-টু খেলে মেসি বল নিয়ে ভেতরের দিকে ঢুকতেই অ্যান্ডারসন তাকে থামাতে এগিয়ে আসেন। সেই মুহূর্তে মেসি অপেক্ষা করে নিখুঁত সময়ে বল বাড়িয়ে দেন ফার্নান্দেজকে। পর্যাপ্ত জায়গা ও সময় পেয়ে দূরপাল্লার দুর্দান্ত শটে গোল করেন আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার।

 

ফাঁকা জায়গা খুঁজে ইংল্যান্ডের রক্ষণ ভেঙে দেন

ইংল্যান্ড মাঝমাঠ শক্ত করে আর্জেন্টিনার স্বাভাবিক আক্রমণ ঠেকাতে চেয়েছিল। কিন্তু মেসি ঠিক সেসব জায়গাতেই অবস্থান নেন, যেখানে কোনো ইংলিশ খেলোয়াড় ছিলেন না।

কখনও ডান প্রান্তে, কখনও মাঝমাঠের একটু গভীরে নেমে বল গ্রহণ করে তিনি হয় নিজেই আক্রমণ সাজান, নয়তো প্রতিপক্ষকে নিজের দিকে টেনে এনে অন্যদের জন্য জায়গা তৈরি করেন। তার এই অপ্রচলিত অবস্থান নেওয়ার কৌশল ইংল্যান্ডের রক্ষণকে বারবার অগোছালো করে দেয়।

 

বেলিংহ্যামের অবস্থানও কাজে লাগান

পুরো টুর্নামেন্টে আক্রমণে দারুণ খেললেও সেমিফাইনালে বেলিংহ্যামের রক্ষণাত্মক অবস্থানকে লক্ষ্যবস্তু বানান মেসি।

ডান পাশে বেলিংহ্যামের পেছনের ফাঁকা জায়গায় অবস্থান নিয়ে বারবার বল নেন তিনি। এতে ইংল্যান্ডের মাঝমাঠ দ্রুত চাপ তৈরি করতে পারেনি এবং আর্জেন্টিনা ডান প্রান্ত দিয়ে ধারাবাহিক আক্রমণ চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

 

টুখেলের কৌশলেরও জবাব দেন মেসি

আর্জেন্টিনার ক্রমাগত আক্রমণ ঠেকাতে টুখেল শেষদিকে পাঁচ ডিফেন্ডারের রক্ষণভাগে চলে যান। কিন্তু সেই পরিবর্তনও উল্টো আর্জেন্টিনার জন্য সুবিধা তৈরি করে।

ব্যাক ফাইভের কারণে ইংল্যান্ডের তিন মিডফিল্ডার পুরো প্রস্থজুড়ে রক্ষণ সামলাতে হিমশিম খায়। মেসি সেই সুযোগে আরও বেশি ডান প্রান্তে নেমে এসে খেলা পরিচালনা করতে থাকেন।

পরে ডেকলান রাইসের বদলে নিকো ও'রাইলি নামার পর ইংল্যান্ড ৫-৪-১ ফরমেশনে গেলেও বেলিংহ্যামকে অপরিচিত হোল্ডিং মিডফিল্ড ভূমিকায় খেলতে হয়। ফলে তিনি প্রায়ই পিছিয়ে পড়ছিলেন এবং আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডারদের দ্রুত চাপে ফেলতে পারছিলেন না।

এই সুযোগে এনজো ফার্নান্দেজ একাধিকবার দূর থেকে শট নেয়ার সুযোগ পান। এরই ধারাবাহিকতায় আসে সমতাসূচক গোলের কর্নার।

 

স্কালোনি–মেসির যুগল পরিকল্পনায় বদলে যায় ম্যাচ

ম্যাচের শেষভাগে কোচ লিওনেল স্কালোনি কৌশলগত পরিবর্তন আনেন। ম্যাক অ্যালিস্টারকে আরও আক্রমণাত্মক ভূমিকা দেয়া হয়। নিকো গনসালেস, লাউতারো মার্তিনেজ এবং রদ্রিগো ডি পল মাঠে নামার পর আর্জেন্টিনা ডান দিক দিয়ে একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকেন।

মেসির নেতৃত্বে তৈরি হওয়া এই আক্রমণভাগ ইংল্যান্ডের ক্লান্ত ও এলোমেলো রক্ষণকে শেষ পর্যন্ত ভেঙে ফেলে। মাঠের ভেতরেই যেন একজন প্লেমেকার নয়, একজন কোচের ভূমিকায় নেমে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী।

আর সেই অসাধারণ ফুটবল মেধার ফলেই নাটকীয় জয় নিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা। -বিবিসি।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers