বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ , ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৮

খেলা
  >
ফুটবল

শেষ হলো এক মহাকাব্য, নীল-সাদা জার্সিতে আর দেখা যাবে না মেসিকে

ক্রীড়া ডেস্ক ১ সেপ্টেম্বর , ২০২৬, ১১:৫৬:৪৭

245
  • সংগৃহীত

আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির দীর্ঘ পথচলায় এবার সত্যিই পড়ল পর্দা। ৩৯ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। যে জার্সিকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় গর্বগুলোর একটি মনে করতেন, সেই নীল-সাদা জার্সিকে এবার বিদায় জানালেন তিনি।

সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন বার্তায় অবসরের সিদ্ধান্ত জানান মেসি। বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের দুই দিন পরই তিনি বিদায়ের বার্তাটি লিখেছিলেন। পরে বাবার মৃত্যুর পর সিদ্ধান্তটি প্রকাশ করার ব্যাপারে আরও দৃঢ় হন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।

নিজের ফেসবুক পেজে অবসরের সিদ্ধান্ত জানান ৩৯ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি মেসি। সেখানে তিনি লেখেন, ‘(বিশ্বকাপ) ফাইনালের পর এত দিন সময় যাওয়ার পর অনেক ভেবেচিন্তে আমি আপনাদের সবাইকে জানাতে চাই যে আমি জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছি…। এই কথাগুলো আমি ২১ জুলাই লিখেছিলাম, ফাইনালের দুই দিন পর। আজ আমার বাবার ঘটনার পর আমি আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত।’

মেসির বিদায়টা অবশ্য কোনো অপূর্ণতার গল্প নয়। বরং দীর্ঘ অপেক্ষা, হতাশা আর অসংখ্য ব্যর্থতার পর পাওয়া এক অবিশ্বাস্য পূর্ণতার গল্প। ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেকের পর শুরু হয়েছিল যে যাত্রা, তার সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় আসে ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয় দিয়ে। এরপর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে বহু প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ ট্রফি তুলে ধরেন মেসি। ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতে নিজের উত্তরাধিকারকে আরও সমৃদ্ধ করেন তিনি।

২০২৬ বিশ্বকাপেও থামেনি মেসির লড়াই। বয়সের ভারকে পেছনে ফেলে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে যান ফাইনাল পর্যন্ত। শেষ ম্যাচে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারলেও টুর্নামেন্টে মেসির পারফরম্যান্স ছিল দুর্দান্ত। বিশ্বকাপের শেষ মঞ্চে দাঁড়িয়েই যেন নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়টি লিখে ফেলেছিলেন তিনি।

আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল করেছেন মেসি, গোল বানিয়েছেন ৬৮টি। দেশটির জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা তো বটেই, আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ও গোল করায় এগিয়ে শুধু ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। এই পথ পর্যন্ত এসে মেসি মনে করেন, আকাশি–সাদা জার্সিতে তাঁর আর কিছু দেওয়ার নেই। পাশাপাশি আর্জেন্টিনার তরুণ খেলোয়াড়দের জন্যও জায়গা ছাড়তে চান।

মেসির স্ট্যাটাসে বলা হয়েছে সে কথাও, ‘সময় খুব অল্প বাকি আর এভাবে একেকটি অধ্যায় শেষ হয়ে যায়; এটি তেমনই একটি অধ্যায়, যা আমাকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে। আমি জাতীয় দলের অংশ হতে সব সময় ভালোবেসেছি, ভালোবাসি এবং ভালোবেসে যাব। নিজেকে সম্পূর্ণ উজাড় করে দিয়েছি, আমার দেওয়ার মতো আর কিছু বাকি নেই। তা ছাড়া পেছনে অনেক দুর্দান্ত তরুণ খেলোয়াড় আসছে, যাদের (জাতীয় দলে) থাকাটা প্রাপ্য।’

তবে সংখ্যার চেয়েও বড় হয়ে থাকবে মেসির সঙ্গে আর্জেন্টিনার মানুষের আবেগের সম্পর্ক। একসময় যিনি ফাইনালে হারার পর সমালোচনার কেন্দ্রে ছিলেন, সেই মেসিই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতীকগুলোর একজন।

অবসর নেওয়ার জন্য মেসির মনে হয়েছে এটাই সঠিক সময়, ‘এটি এমন এক সিদ্ধান্ত, যা আমার আত্মাকে ব্যথিত করেছে এবং এখনো করছে, তবে আমি বুঝতে পারছি যে এটাই সঠিক সময়। আমি আপনাদের কসম কেটে বলছি, সব সময় নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি—শুধু গত কয়েক বছরে যা কিছু জিতেছি তখন নয়, তার আগেও।’

সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে স্ট্যাটাসে লেখা হয়, ‘গত ২০ বছরের সমস্ত ভালোবাসার জন্য ধন্যবাদ। মাঠের ভেতরে আপনাদের চিৎকার ও সমর্থন শোনাটা খুব মিস করব। এখন থেকে আমি আপনাদের মতোই একজন হয়ে যাব, যে বাইরে থেকে সব সময় দলকে সমর্থন দিয়ে যাবে এবং পাশে থাকবে (ভালো সময়ে তো বটেই, খারাপ সময়ে আরও বেশি)।’

পরিবার, সতীর্থ ও কোচদের প্রতি মেসির স্ট্যাটাসে লেখা হয়, ‘আমার পরিবারকে সব সময় পাশে থাকার জন্য ধন্যবাদ, এত সুন্দর কিন্তু কঠিন একটি যাত্রায় আমার সঙ্গী হওয়ার জন্য। যেসব কোচ, সতীর্থ ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে, তাদের প্রত্যেককে ধন্যবাদ। অবিস্মরণীয় সব স্মৃতি আর মুহূর্ত সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি।’

সবাইকে ভালোবাসার কথা জানিয়ে মেসির এই স্ট্যাটাসের শেষে লেখা হয়, ‘সতীর্থদের সঙ্গে নিয়ে আপনাদের স্বপ্নের মতো কিছু মুহূর্ত উপহার দিতে পারার শান্তি আর গর্ব নিয়ে আমি বিদায় নিচ্ছি। আপনাদের সঙ্গে এই অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে বেঁচে থাকা সত্যিই এক উন্মাদনার মতো ছিল। সবাইকে ভালোবাসি!’

সব শেষে মেসির দুটি কথা আর্জেন্টাইন সমর্থকদের হৃদয় ভিজিয়ে দেয়, ‘আমাকে আর্জেন্টাইন বানানোর জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। ভামোস আর্জেন্টিনা!’

একটি যুগের শেষ হলো। নীল-সাদা জার্সিতে আর দেখা যাবে না সেই ১০ নম্বরকে। থাকবে শুধু স্মৃতি—কোপা আমেরিকার কান্না, বিশ্বকাপ জয়ের উল্লাস, ট্রফি হাতে মেসির হাসি আর কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া এক ফুটবল জাদুকরের গল্প।

মেসি বিদায় নিলেন, কিন্তু আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে তাঁর অধ্যায়টি শেষ হওয়ার নয়।

 

নিউজজি/সিআর

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
 নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers