বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ , ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৮

খেলা
  >
ফুটবল

অভিমান থেকে আরাধনা—আর্জেন্টিনার মেসি হয়ে ওঠার অবিশ্বাস্য গল্প

চঞ্চল রহমান ১ সেপ্টেম্বর , ২০২৬, ১২:০৭:৪৭

211
  • সংগৃহীত

একসময় তিনি ছিলেন প্রশ্নের মুখে। জাতীয় দলের জার্সিতে ব্যর্থতার দায় বারবার এসে পড়ত তার কাঁধে। এমনকি কেউ কেউ বলতেন, বার্সেলোনার লিওনেল মেসি আর আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি যেন দুই ভিন্ন মানুষ। আজ সেই গল্পের শেষ অধ্যায়ে এসে চিত্রটা পুরোপুরি বদলে গেছে। যে মেসিকে একসময় ঘিরে ছিল হতাশা ও সমালোচনা, বিদায়ের মুহূর্তে তিনিই আর্জেন্টিনার ফুটবলের সবচেয়ে প্রিয় নাম।

লিওনেল মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন ৩৯ বছর বয়সে। আর্জেন্টিনার হয়ে তার শেষ ম্যাচ ছিল ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল—স্পেনের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হেরে যাওয়া সেই ম্যাচ। হয়তো স্বপ্নের মতো বিদায় হয়নি, কিন্তু মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়েছে এমন এক জায়গায়, যেখানে তাকে নিয়ে আর কোনো প্রশ্নই অবশিষ্ট নেই। কারণ মেসির আর্জেন্টিনা-গল্পটা শুধু ট্রফি জেতার গল্প নয়। এটা প্রত্যাখ্যান, কান্না, ব্যর্থতা, ফিরে আসা এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের ভালোবাসা অর্জনের গল্প।

শুরুটা ছিল সহজ নয়-

রোজারিও থেকে মাত্র ১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনায় পাড়ি জমান মেসি। ইউরোপে তাঁর প্রতিভার বিস্ফোরণ যতটা দ্রুত হয়েছিল, আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের সঙ্গে সম্পর্কটা ততটা সহজ ছিল না। জাতীয় দলের জার্সিতে প্রথম বড় পরীক্ষাগুলোতে বারবার থমকে যেতে হয়েছিল তাঁকে। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে পরাজয়—প্রতিটি ব্যর্থতার পর মেসিই হয়ে উঠতেন সবচেয়ে বড় আলোচনার কেন্দ্র। বিশ্বের সেরা ফুটবলার হয়েও দেশের হয়ে বড় ট্রফি জিততে না পারার প্রশ্নটি যেন তাঁর সমস্ত অর্জনকে ঢেকে দিত। ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে আবারও পেনাল্টি শুটআউটে হারার পর ভেঙে পড়েছিলেন মেসি। এমনকি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, জাতীয় দলের অধ্যায় তাঁর জন্য শেষ। কিন্তু সেটি যে শেষ কথা নয়, সময়ই পরে তা প্রমাণ করে।

তারপর বদলে গেল গল্প-

মেসি ফিরে এলেন। আর সেই ফেরার পর ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল আর্জেন্টিনা দলও। লিওনেল স্কালোনির অধীনে দলটি মেসির ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে তাঁকে ঘিরে একটি শক্তিশালী দল গড়ে তুলল। মেসির পাশে উঠে এল নতুন প্রজন্মের একদল যোদ্ধা—যারা শুধু বল পায়ে জাদু দেখাতে নয়, অধিনায়কের জন্য লড়তেও প্রস্তুত। এর ফল এল ২০২১ সালে। মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতল আর্জেন্টিনা। মেসির হাতে উঠল জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় সিনিয়র আন্তর্জাতিক ট্রফি।

সেই একটি ট্রফিই যেন বদলে দিল বহু বছরের সম্পর্ক।

এরপর এল কাতারের সেই রাত-

২০২২ বিশ্বকাপ ছিল মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। টুর্নামেন্টের শুরুতেই সৌদি আরবের কাছে হার। আবারও প্রশ্ন উঠল—মেসি কি পারবেন? উত্তরটা তিনি মাঠেই দিয়েছেন।

গোল, অ্যাসিস্ট, নেতৃত্ব আর অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতায় মেসি আর্জেন্টিনাকে নিয়ে গেলেন ফাইনালে। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই মহাকাব্যিক ম্যাচে করলেন দুই গোল, টাইব্রেকারেও গোল করলেন। শেষ পর্যন্ত ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপ উঠল মেসির হাতে। সেই মুহূর্তেই যেন আর্জেন্টিনার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের শেষ দেয়ালটিও ভেঙে গেল। যে মানুষটিকে একসময় দিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা করে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হতো, তিনিই এবার নিজের গল্প নিজেই লিখলেন।

‘ম্যারাডোনার ছায়া’ থেকে নিজের আকাশে-

আর্জেন্টিনার ফুটবলে ম্যারাডোনা ছিলেন আবেগের নাম। ১৯৮৬ বিশ্বকাপজয়ী সেই কিংবদন্তির সঙ্গে তুলনা মেসিকে কখনোই ছাড়েনি। কিন্তু মেসির সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো এখানেই—তিনি ম্যারাডোনাকে সরিয়ে জায়গা নেননি; বরং আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে নিজের আলাদা অধ্যায় তৈরি করেছেন। ২০২২ বিশ্বকাপের পর সেই বিতর্ক অনেকটাই অর্থহীন হয়ে যায়। কারণ একজন এনে দিয়েছিলেন ১৯৮৬-এর বিশ্বকাপ, অন্যজন ২০২২-এ। দুজনের গল্প আলাদা, কিন্তু দুজনের জায়গাই এখন আর্জেন্টিনার ফুটবল-হৃদয়ে।

বিশ্বকাপের পরও থামেননি-

বিশ্বকাপ জয়ের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার হয়তো মেসি থামবেন। কিন্তু তিনি খেলেছেন আরও। ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। এরপর ২০২৬ বিশ্বকাপেও দলকে নিয়ে যান ফাইনালে। এবার অবশ্য শেষ হাসি হাসতে পারেনি আর্জেন্টিনা। স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হেরে যায় তারা। মেসির দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও সেখানেই শেষ হয়।

কিন্তু ততক্ষণে মেসির গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় লেখা হয়ে গেছে।

সংখ্যার বাইরেও যে মেসি-

আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল—দুটিই দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। জিতেছেন ২০২১ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ বিশ্বকাপ। ২০০৫ সালে অভিষেকের পর দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নীল-সাদা জার্সিতে খেলেছেন তিনি। তবে মেসির আসল উত্তরাধিকার কোনো সংখ্যায় আটকে নেই। এটি সেই ছেলেটির গল্প, যাকে একসময় বলা হয়েছিল জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের ক্লাবের মতো আলো ছড়াতে পারেন না। এটি সেই অধিনায়কের গল্প, যিনি একের পর এক ফাইনালে হেরে কেঁদেছেন। এটি সেই ফুটবলারের গল্প, যিনি একসময় নিজেই জাতীয় দল ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

আর শেষ পর্যন্ত এটি সেই মেসির গল্প, যিনি বিশ্বকাপ হাতে দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনার কোটি মানুষের স্বপ্ন পূরণ করেছেন।

শেষ পর্যন্ত মেসিই হয়ে উঠলেন আর্জেন্টিনা-

মেসির বিদায়ের ঘোষণার পর আর্জেন্টিনায় যে আবেগ তৈরি হয়েছে, সেটিই হয়তো তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সমর্থকদের কাছে এখন তিনি শুধু একজন ফুটবলার নন—একটি প্রজন্মের স্মৃতি, একটি দেশের গর্ব। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও তাঁকে বিদায় জানিয়ে বলেছে, মেসি তাঁদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর যাত্রার অংশ হয়ে থাকবেন। সতীর্থরা তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন শুধু মাঠের পারফরম্যান্সের জন্য নয়, নেতৃত্ব, ব্যক্তিত্ব এবং অন্যদের অনুপ্রাণিত করার জন্যও।

একসময় মেসিকে নিয়ে প্রশ্ন ছিল—তিনি কি সত্যিই আর্জেন্টিনার?-

আজ সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ মেসি এখন শুধু আর্জেন্টিনার হয়ে খেলা একজন ফুটবলার নন। মেসি এখন আর্জেন্টিনার ফুটবল-গল্পেরই একটি নাম। একদিন যে মানুষটি ছিলেন সমালোচনার কেন্দ্রে, বিদায়ের দিনে তিনিই হয়ে উঠেছেন ভালোবাসার প্রতীক। আর এভাবেই মেসির আর্জেন্টিনা-অধ্যায় শেষ হলো—অভিমান থেকে আরাধনায়, প্রশ্ন থেকে কিংবদন্তিতে।

 

নিউজজি/সিআর

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
 নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers