বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১ , ১৮ মুহররম ১৪৪৬

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

এআই নিয়ে ব্যস্ত টেক জায়ান্টরা, কার্বন প্রতিশ্রুতির কী হবে

নিউজজি ডেস্ক ১০ জুলাই , ২০২৪, ১২:০৮:২৫

63
  • ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা: গোটা দুনিয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও এর নতুন নতুন প্রায়োগিক ক্ষেত্র নিয়ে তুমুল ব্যস্ত। সাধারণ মানুষও তীব্র আগ্রহ নিয়ে এআইয়ের নানা অগ্রগতির খবরাখবর নিচ্ছেন, বনে যাচ্ছেন ভোক্তাও। ফলে গুগল, মাইক্রোসফটের মতো টেক জায়ান্টরা এই খাতে বিনিয়োগ বাড়াবে—এটাই স্বাভাবিক। মুশকিল হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই টেক জায়ান্টরাই আবার ‘শূন্য নিঃসরণ’ সম্পর্কিত কার্বন প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে, যা রাখতে এখন তারা হিমশিম খাচ্ছে। কেন? উত্তর—এআই।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে যে আলোড়ন তৈরি হয়েছে, তা নিকট ভবিষ্যতে স্তিমিত হবে এমন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বরং প্রতিনিয়ত বাড়ছে এআই নিয়ে গবেষণা। ফলে এআই-ভিত্তিক নিত্যনতুন টুলের আবির্ভাবও ঘটছে নিয়মিতই।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই পথচলা প্রযুক্তিবিদদের জন্য যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, পরিবেশবিদদের কপালে কিন্তু চিন্তার রেখা ইতোমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত গুগলের বার্ষিক পরিবেশ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে (২০১৯ থেকে ২০২৩) প্রতিষ্ঠানটির গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ বেড়েছে ৪৮ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে শুধু ২০২৩ সালেই গত বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ নিঃসরণ বেড়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ২০৩০ সালের মধ্যে শূন্য নিঃসরণ বা নেট জিরো এমিশন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে ‘অতি উচ্চাভিলাষী’ বলছে খোদ গুগল। এই লক্ষ্যে পৌঁছনোর কাজটি যে মোটেই সহজ হবে না, সেটাও অকপটে স্বীকার করে নিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন প্রতিষ্ঠানটি।

 প্রতীকী ছবিকার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হওয়ার কারণ হিসেবে গুগল মূলত তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন সেবার কথা উল্লেখ করেছে। এআই নির্ভর বিভিন্ন সেবা প্রদানের জন্য বিশাল আকৃতির ডেটা সেন্টারগুলোতে প্রয়োজন হয় শক্তিশালী কম্পিউটার সার্ভারের। এই সার্ভারগুলো রাতদিন চালু রাখতে চাই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎশক্তির, যার একটি বড় অংশেরই সংস্থান হয় অ-নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। অর্থাৎ, বিপুল এই শক্তির উৎপাদন এখনো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকেই আসছে, যা একই সাথে গ্রিন হাউস গ্যাসেরও একটি বড় উৎস।

ওপেনএআই এর জিপিটি-৪ ও গুগলের জেমিনির মতো এআই মডেলের প্রশিক্ষণ ও সেগুলো অপারেটের জন্য বিদ্যুৎ শক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন হয় বিশাল আকারের কম্পিউটার সার্ভারের। এই সার্ভারগুলো তৈরি ও পরিবহনও সরাসরি ভূমিকা রাখে কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধিতে।

গুগলের মতোই প্রযুক্তির আরেক জায়ান্ট মাইক্রোসফটও বিপাকে পড়েছে তাদের ‘মুনশট’ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে। অর্থাৎ, ২০৩০ সালের মধ্যে ‘কার্বন নেগেটিভ’ হওয়ার চ্যালেঞ্জটি দিনকে দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে তাদের জন্য। সম্প্রতি এমনটাই জানিয়েছেন মাইক্রোসফট প্রেসিডেন্ট ব্র্যাড স্মিথ। কারণ হিসেবে এআই প্রযুক্তি নিয়ে তাদের কৌশলগত অবস্থানের কথাই বলেছেন তিনি।

উল্লেখ্য, আগামী ৩ বছরে শুধু যুক্তরাজ্যেই এআই ডেটা সেন্টারের অবকাঠামো নির্মাণে ২.৫ বিলিয়ন পাউন্ড (৩১৯ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি) খরচ করতে যাচ্ছে মাইক্রোসফট।

বিশাল বিশাল ডেটা সেন্টারের জন্য যেমন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হয়, তেমনি এগুলো থেকে নিঃসরিত তাপ নিয়ন্ত্রণের জন্যও দরকার হয় প্রয়োজনীয় কুলিং সিস্টেমের। এতে প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ পানির। এআই এর ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে এটাও অনেক বড় একটি পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ।

মাইক্রোসফট তাদের ২০২২ সালের বার্ষিক পরিবেশ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২১ ও ২০২২ সালের মধ্যে তাদের ডেটা সেন্টারগুলোতে ১.৭ বিলিয়ন গ্যালন পানি ব্যবহৃত হয়েছে, যা এর আগের বছরের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেশি। তার ঠিক এক বছর পর গুগল তাদের বার্ষিক পরিবেশ প্রতিবেদনে আগের বছরের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি (৫.৬ বিলিয়ন গ্যালন) পানি ব্যবহারের কথা উলেখ করেছে।

২০২৩ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক শাওলেই রেন এর এক গবেষণায় এক চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ভিত্তিক চ্যাটবট চ্যাটজিপিটিতে প্রতি ৫ থেকে ৫০টি প্রম্পট বা প্রশ্নের জন্য ৫০০ মিলিলিটার পানি খরচ হয়ে থাকে। অন্য এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, সারা বিশ্বে ২০২৭ সালের মধ্যে ৬.৬ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি ব্যবহৃত হতে পারে শুধু এআই প্রযুক্তি খাতে, যা ইংল্যান্ডে সারা বছরে ব্যবহৃত পানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।

প্রযুক্তি জগতের জায়ান্টদের মধ্যে এআই-ভিত্তিক নিত্যনতুন সেবা প্রদানের প্রতিযোগিতা সামনের দিনগুলোতে আরও তীব্র হবে, এমনটা বলাই যায়। তাহলে ‘জিরো এমিশন’ এর মতো পরিবেশবান্ধব উদ্যোগগুলোর কী হবে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আশাজাগানীয়া পথচলায় পরিবেশের বিষয়টি কি তাহলে অন্ধকারে চলে যাবে?

মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস অবশ্য তেমনটা মনে করছেন না। সম্প্রতি তিনি দাবি করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কেননা ‘বিগ টেক’ প্রতিষ্ঠানগুলো ‘গ্রিন এনার্জি’ উৎস থেকে বিদ্যুৎ কিনে নিতে যথেষ্ট আগ্রহী এবং এর জন্য বড় অঙ্কের অর্থ খরচেও তারা প্রস্তুত।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই শেষ পর্যন্ত কতটা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি হয়ে উঠতে পারবে, সেটা অবশ্য সময়ই বলে দিবে।

 

নিউজজি/ পি.এম

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন