মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩ , ২৫ জিলকদ ১৪৪৭

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

রাস্তায় চললেই চার্জ হবে গাড়ি!

নিউজজি ডেস্ক ৩ মে , ২০২৬, ১৬:৫৬:১২

54
  • রাস্তায় চললেই চার্জ হবে গাড়ি!

ঢাকা: জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশবান্ধব হওয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। তবে দূরপাল্লার যাত্রায় অনেক চালকেরই দুশ্চিন্তা থাকে—পথে চার্জ ফুরিয়ে যাবে কি না। পাশাপাশি চার্জিং স্টেশনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করাও বেশ ঝামেলার।

তবে প্রযুক্তির অগ্রগতিতে এই সমস্যার সমাধান ধীরে ধীরে সামনে আসছে। স্মার্টফোনের মতো ওয়্যারলেস চার্জিং প্রযুক্তি এখন গাড়িতেও ব্যবহৃত হচ্ছে, ফলে চলন্ত অবস্থাতেই রাস্তা থেকে চার্জ নেয়া সম্ভব হচ্ছে। যা একসময় কেবল সায়েন্স ফিকশন মনে হতো, তা এখন বাস্তব। প্যারিস থেকে শুরু করে ডেট্রয়েট পর্যন্ত বিশ্বের ব্যস্ত সড়কগুলো ধীরে ধীরে ‘স্মার্ট এনার্জি করিডোরে’রূপ নিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা এই নতুন উদ্ভাবনকে বৈদ্যুতিক গাড়ি বিপ্লবের 'দ্বিতীয় ধাপ' হিসেবে দেখছেন। এই প্রযুক্তির মূলে রয়েছে ‘ইন্ডাকটিভ চার্জিং’ ব্যবস্থা, যেখানে রাস্তার পিচের কয়েক ইঞ্চি নিচে বসানো থাকে বিশেষ কপার কয়েল। এই কয়েলগুলো বিদ্যুৎ গ্রিডের সাথে যুক্ত থেকে ‘ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স’ পদ্ধতিতে তার ছাড়াই সরাসরি গাড়ির ব্যাটারিতে শক্তি পাঠাতে সক্ষম। এটি এতটাই নিরাপদ যে রাস্তায় মানুষ বা প্রাণী থাকলেও বৈদ্যুতিক শকের কোনো ভয় নেই। তবে এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের ভবিষ্যৎ কতটা সুদূরপ্রসারী, তা নিয়ে বর্তমানে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ‘ওয়্যারলেস চার্জিং সড়ক’ বা ইলেকট্রিক রোড সিস্টেম (ইআরএস) বাস্তবায়নে বিভিন্ন অঞ্চল ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই প্রযুক্তির প্রাথমিক ধারণা কয়েক দশক পুরোনো হলেও সুইডেন বর্তমানে এর স্থায়ী সমাধানের প্রধান পথিকৃৎ হিসেবে কাজ করছে। তারা ২০২৫-২৬ সালের মধ্যে তাদেরই ২০ মোটরওয়েকে বিশ্বের প্রথম স্থায়ী চার্জিং সড়কে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। দেশটির দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হলো ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩ হাজার কিমি রাস্তা বিদ্যুতায়িত করা। এছাড়া ফ্রান্সের প্যারিসে এ১০ হাইওয়েতে ১.৫ কিমি দীর্ঘ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন চার্জিং প্রকল্প এবং জার্মানিতে বাণিজ্যিক বাস রুট নিয়ে কাজ চলছে।

এছাড়া উত্তর আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েট শহরে প্রথম পাবলিক ওয়্যারলেস চার্জিং রাস্তা চালু হয়েছে এবং ইন্ডিয়ানা ও পেনসিলভেনিয়াতেও একই ধরনের পাইলট প্রকল্প চলমান রয়েছে। এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল তাদের পাবলিক বাস সার্ভিসের জন্য একটি সফল ও বিরতিহীন মডেল তৈরি করেছে। এছাড়াও এশিয়ায় চীন তাদের হাইওয়েতে সোলার প্যানেল যুক্ত চার্জিং সড়ক এবং দক্ষিণ কোরিয়া তাদের নিজস্ব 'অনলাইন ইলেকট্রিক ভেহিকেল' (ওএলইভি) প্রযুক্তির আরও উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। এসব বৈশ্বিক প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য হলো বৈদ্যুতিক গাড়ির রেঞ্জ অ্যাংজাইটি দূর করে একটি টেকসই যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

মূলত, সড়কে ব্যাটারি রিচার্জের এই বৈপ্লবিক প্রযুক্তির ভবিষ্যৎত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এটি ব্যাপকভাবে কার্যকর হলে গাড়ির ব্যাটারির আকার ৫০ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যা যানবাহনের ওজন কমিয়ে জ্বালানি দক্ষতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে। এর ফলে ব্যাটারি উৎপাদন খরচ কমবে এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির দাম সাধারণ পেট্রোল চালিত গাড়ির সমান বা তারও নিচে নেমে আসবে।

তবে ব্যক্তিগত গাড়ির চেয়েও পণ্যবাহী ট্রাক এবং পাবলিক বাসের ক্ষেত্রে এই প্রকল্পের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। মালবাহী ট্রাকগুলোকে চার্জ দেয়ার জন্য আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না, যা বিশ্বজুড়ে লজিস্টিক খরচ কমিয়ে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া ভবিষ্যতের স্মার্ট শহরগুলোতে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় বাস বা ট্যাক্সি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চার্জ হবে। এমনকি চালকবিহীন রোবোট্যাক্সির জন্য এটি হবে এক জাদুকরী সমাধান, কারণ তাদের প্লাগ লাগিয়ে চার্জ দেয়ার জন্য তখন আর মানুষের প্রয়োজন হবে না। সব মিলিয়ে এই প্রযুক্তি যাতায়াত ব্যবস্থাকে একটি বিশাল পাওয়ার ব্যাংকে পরিণত করার সম্ভাবনা রাখে।

তবে এই বৈপ্লবিক প্রযুক্তির বাস্তবায়নের পথে বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জ বা বাধাও রয়েছে। প্রথমত, সাধারণ হাইওয়ে তৈরির তুলনায় ওয়্যারলেস চার্জিং রাস্তা তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল; প্রতি কিলোমিটার রাস্তা বিদ্যুতায়িত করতে গড়ে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়। দ্বিতীয়ত, বর্তমানে বিভিন্ন কোম্পানি নিজস্ব প্রযুক্তিতে চার্জিং কয়েল তৈরি করায় কোনো বৈশ্বিক মানদণ্ড নেই, যা মোবাইল ফোনের টাইপ-সি চার্জারের মতো সর্বজনীন হওয়া প্রয়োজন। এছাড়া একসাথে অনেক গাড়ি চার্জ নিলে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়াও রাস্তার নিচে বসানো কয়েলগুলো মেরামত করা অত্যন্ত জটিল এবং আবহাওয়া ও ভারী যানবাহনের চাপে এগুলোর স্থায়িত্ব নিয়ে এখনো দীর্ঘমেয়াদী পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।

এদিকে, কয়েক বছর আগে বাংলাদেশেও বৈদ্যুতিক চার্জিং স্টেশনের যুগে প্রবেশ করছে। তবে শুরুতেই সৃষ্টি হয়েছে নানা জটিলতা। কোনও কোনও প্রতিষ্ঠান চার্জিং স্টেশন তৈরি করে বসে থাকলেও পর্যাপ্ত গাড়ি পাচ্ছে না। কোনোটির আবার এখনও সার্ভিস চার্জ ঠিক হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের তরফ থেকে দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রচলনের চেষ্টা চলছে। তবে দেশে পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশন না থাকায় সাধারণ মানুষ বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনায় খুব আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে বিশ্বজুড়ে যখন চলন্ত রাস্তায় চার্জের প্রযুক্তি নিয়ে তোড়জোড় চলছে, তখন বাংলাদেশে প্রাথমিক অবকাঠামো নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers