মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩ , ২৫ জিলকদ ১৪৪৭

বিদেশ

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা ঘিরে দুশ্চিন্তায় উপসাগরীয় দেশগুলো

নিউজজি ডেস্ক ২১ এপ্রিল , ২০২৬, ১৫:২৫:৫৭

41
  • সংগৃহীত

ঢাকা: হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-এর সম্ভাব্য আলোচনা যত এগোচ্ছে, ততই উদ্বেগ বাড়ছে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে। তাদের ধারণা, আলোচনাটি শেষ পর্যন্ত শুধু প্রণালির স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করাতেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে, অথচ এতে ইরানের কৌশলগত প্রভাব আরও দৃঢ় হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উপেক্ষিত হলে, এমন কোনো সমঝোতা তাদের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে তারা।

বার্তাসংস্থা রয়টার্স বলছে, রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভের এক মন্তব্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে একটি আশঙ্কাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। আর তা হচ্ছে- হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করাই হয়তো যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার প্রধান অর্জন হতে পারে, কিন্তু তারা (উপসাগরীয় দেশগুলো) যে বৃহত্তর উত্তেজনা প্রশমনের আশা করছে, তা এতে পূরণ নাও হতে পারে।

কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের ধারণা, ইসলামাবাদে সম্ভাব্য পরবর্তী দফার আলোচনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বা আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর বিষয় কম গুরুত্ব পাবে। বরং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমা এবং বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব কীভাবে সামলানো হবে- সেই বিষয়েই বেশি জোর দেয়া হবে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তাদের সতর্কবার্তা, এই পদ্ধতি ইরানের প্রভাব কমানোর বদলে সেটিকে আরও স্থায়ী করে তুলতে পারে। এতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়া হলেও, যেসব দেশ জ্বালানি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে রয়েছে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রাখা হচ্ছে। তাদের মতে, এখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও হরমুজে ইরানের প্রভাব। কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক প্রক্সি ইস্যুগুলো তুলনামূলকভাবে গুরুত্ব হারাচ্ছে। মূলত হরমুজ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয়।

যদিও সমৃদ্ধকরণ ইস্যুতে আলোচনা এখনও অচলাবস্থায় রয়েছে। ইরান শূন্য সমৃদ্ধকরণ কিংবা ইউরেনিয়ামের মজুত বিদেশে পাঠানোর দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে, তবুও অগ্রাধিকারের এই পরিবর্তন উপসাগরীয় দেশগুলোকে উদ্বিগ্ন করছে। উপসাগরীয় একটি সূত্র বলছে, ‘শেষ পর্যন্ত হরমুজই হবে রেড লাইন। আগে এটি কোনও ইস্যু ছিল না, এখন এটাই ইস্যু হয়ে উঠেছে। লক্ষ্যই বদলে গেছে।’

এ বিষয়ে উপসাগরীয় আরব সরকারগুলোর তাৎক্ষণিক কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। যুদ্ধ চলাকালে উপসাগরীয় অঞ্চলের জাহাজ চলাচল লক্ষ্য করে ইরানের হুমকি হরমুজ নিয়ে দীর্ঘদিনের ‘ট্যাবু’ ভেঙে দিয়েছে, ফলে আলোচনায় এটিকে বাস্তব চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে মেদভেদেভ গত ৮ এপ্রিল এক্সে লিখেছিলেন, ‘ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কীভাবে এগোবে, তা স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত- ইরান তার পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করেছে। সেটির নাম হরমুজ প্রণালি। এর সম্ভাবনা অসীম।’

তার এই মন্তব্যে হরমুজকে এমন এক কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যা পারমাণবিক সীমা অতিক্রম না করেই ইরানকে চাপ সৃষ্টি ও নিয়ম নির্ধারণের সুযোগ দেয়। ইরানের নিরাপত্তা সূত্রগুলোও এই

ধারণার সঙ্গে একমত। তাদের মতে, হরমুজ প্রণালি কোনও জরুরি বিকল্প নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত একটি প্রতিরোধমূলক অস্ত্র।

এক জ্যেষ্ঠ ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য ইরান বহু বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে। আজ এটি আমাদের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ারগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ ভৌগোলিক সুবিধা থেকে পাওয়া শক্তিশালী প্রতিরোধ।’

তিনি আরও বলেন, এটি একটি ‘সোনালি ও অমূল্য সম্পদ’, যা ইরানের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিশ্বের পক্ষে কেড়ে নেয়া সম্ভব নয়।

ইরানের বিপ্লবী গার্ডের ঘনিষ্ঠ আরেকটি সূত্র বলেন, হরমুজ ব্যবহারের দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা এখন ভেঙে গেছে। তার ভাষায়, এটি এখন এমন একটি ‘তলোয়ার, যা খাপ থেকে বের করা হয়ে গেছে’- যা যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক দেশগুলো উপেক্ষা করতে পারবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন এই কারণে যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও প্রক্সি বাহিনী বারবার তাদের অঞ্চল লক্ষ্যবস্তু করলেও, আলোচনায় এখন প্রায় পুরোপুরি হরমুজকেই গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, আর সেটি এর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণেই। যার ফলে তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগ উপেক্ষিত হচ্ছে।

উপসাগরীয় সূত্রগুলো বলছে, হরমুজ ইস্যুটি এখন শুধু নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়, বরং কে চলাচলের নিয়ম নির্ধারণ করবে সেই প্রশ্নে রূপ নিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক নিয়মের পরিবর্তে শক্তির ভিত্তিতে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।

এমিরেটস পলিসি সেন্টারের প্রধান এবতিসাম আল-কেতবি বলেন, ‘যা অবস্থা তৈরি হচ্ছে, তা কোনও ঐতিহাসিক সমাধান নয়, বরং টেকসই সংঘাতের পরিকল্পিত কাঠামো।’

তিনি বলেন, ‘ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রক্সি হামলার শিকার কারা? ইসরায়েল এবং বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো। আমাদের জন্য ভালো চুক্তি হবে ক্ষেপণাস্ত্র, প্রক্সি ও হরমুজ- সবকিছু নিয়ে। কিন্তু মনে হচ্ছে তারা ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রক্সি নিয়ে ততটা গুরুত্ব দিচ্ছে না।’

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের আলোচনার ফলে উত্তেজনা পুরোপুরি সমাধান হবে না, বরং নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে স্থিতিশীল থাকবে। যা ওয়াশিংটন ও তেহরানের জন্য সুবিধাজনক হলেও উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদে অস্থিরতা স্থায়ী করতে পারে।

ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতে পড়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, রপ্তানি ও বীমা ব্যয় বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। বিকল্প পথে জ্বালানি রপ্তানি এসব দেশের ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং সেগুলোও একই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হুমকির মুখে রয়েছে।

কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করে ধাপে ধাপে এগোনোর পরামর্শ দিয়েছে, যাতে ইরানের আচরণ যাচাই করা যায়। তাদের মতে, এখনও গুরুত্বপূর্ণ হুমকিগুলো রয়ে গেছে— বিশেষ করে এমন ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের হাতে রয়েছে যা উপসাগরীয় দেশগুলোর রাজধানীতে আঘাত হানতে পারে এবং ইরানের প্রক্সি বাহিনীও এখনও সক্রিয়।

এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে এখন মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। এমনকি ওয়াশিংটনকে নিয়ে নীরব অসন্তোষ থেকে দেশগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান হতাশা ও বিভ্রান্তিও কাজ করছে। সৌদি-ভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগের বলেন, ‘ইরান ইস্যু মোকাবিলায় ভিন্ন ধরনের পদ্ধতি প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও, একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়।’

যদিও উপসাগরীয় নেতারা আলোচনায় নিজেদের উপেক্ষিত মনে করছেন, তবুও তারা স্বীকার করেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা এখনও ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিশ্লেষক আবদুলখালেক আবদুল্লাহ বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা থাড ও প্যাট্রিয়টের মতো উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণে যুদ্ধ টিকে থাকতে পেরেছে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অপরিহার্য হলেও সবসময় নির্ভুল নয়, বিশেষ করে হরমুজ ইস্যুতে সম্ভাব্য সংঘাতের গুরুত্ব তারা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি। যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় মিত্রদের সুরক্ষা দিতে আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, নৌ নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

দুবাইভিত্তিক গবেষণা কেন্দ্র ‘বহুথ’-এর পরিচালক মোহাম্মদ বাহারুন বলেন, এই যুদ্ধের একটি বড় শিক্ষা হলো— একটি মাত্র বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভরতার সীমাবদ্ধতা।

উপসাগরীয় নেতারা দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে সংঘাত এড়ানোর পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তারা প্রকাশ্যে নীরব থেকেছেন- যা কেবল কূটনৈতিক কৌশল নয়, বরং এমন এক সংঘাত নিয়ে অনিশ্চয়তা, যার অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা খরচ তারা বহন করলেও নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নেই।

এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যখন আলোচনায় বসতে যাচ্ছে, তখন উপসাগরীয় কর্মকর্তারা বলছেন- এই আলোচনা থেকে তাদের বাদ রাখা আর কেবল আঞ্চলিক ইস্যু নয়, বরং বৈশ্বিক বিষয়, কারণ হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব পুরো বিশ্বের জন্য।

 

নিউজজি/এস আর

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers