বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ , ২৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

বিদেশ

ক্ষীণ কান্নার শব্দে ধ্বংসস্তূপ থেকে নবজাতক উদ্ধার

নিউজজি ডেস্ক ১২ আগস্ট , ২০২৬, ১৭:২৭:১০

62
  • সংগৃহীত

ঢাকা: কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে একটি পাঁচতলা আবাসিক ভবন ধসে পড়ার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে ভেসে আসা ক্ষীণ ফিসফিস শব্দের সূত্র ধরে এক ব্যক্তি ও এক নবজাতককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে দেশটিতে দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

সোমবার স্থানীয় সময় ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার সময় ব্রায়ান ওসোরিও জুলুয়াগা কলম্বিয়ার কালি শহরে কর্মস্থলে ছিলেন। কম্পন শুরু হলে দ্রুত অফিস থেকে বের হয়ে মোটরসাইকেলে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন তিনি।

পথে একটি পাঁচতলা আবাসিক ভবন পুরোপুরি ধসে পড়তে দেখে তিনি থেমে যান। ভবনটি ছিল ‘লা তোরেস দেল লিমোনার’ নামের একটি বড় আবাসিক কমপ্লেক্সের অংশ, যা পুরো একটি ব্লকজুড়ে বিস্তৃত ছিল।

ওসোরিও সিএনএনকে বলেন, ভূমিকম্পের পর আশপাশের বাসিন্দারা আতঙ্কে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। কারও পরনে ছিল ঘুমের পোশাক বা পায়জামা, কেউ কাঁদছিলেন, আবার কেউ ছিলেন পুরোপুরি হতবিহ্বল।

ধ্বংসস্তূপ থেকে ভেসে এলো ক্ষীণ শব্দ

ভবনটি ধসে পড়ার পর গ্যাস লিকের সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক করা হলেও ওসোরিও ধ্বংসস্তূপের কাছে এগিয়ে যান। তিনি ধ্বংসস্তূপের ভেতরে কেউ জীবিত আছেন কি না, তা জানতে জোরে জোরে ডাকতে শুরু করেন।

হঠাৎ আশপাশের সবাইকে চুপ থাকতে বলেন তিনি। কারণ ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে খুব ক্ষীণ একটি শব্দ ভেসে আসছিল- প্রায় ফিসফিসের মতো।

কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে এক পুরুষের কণ্ঠ শোনা যায়, “হ্যাঁ, আমি এখানে। আমি একটি শিশুর সঙ্গে আছি।”

এরপর শুরু হয় প্রাণপণ উদ্ধার অভিযান।

ওসোরিও ও আরও কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ওই ব্যক্তি ও শিশুটির কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাদের পথ আটকে ছিল বিশাল একটি কংক্রিটের স্ল্যাব।

ওসোরিও বলেন, প্রথমবার তারা সেটি সরাতে পারেননি। পরে সবাই একসঙ্গে শক্তি প্রয়োগ করেন- “এক, দুই, তিন- উঠাও।”

শিশুটির মাথা দেখে আরও মরিয়া উদ্ধারকারীরা

কংক্রিটের ভারী স্ল্যাবটি সরিয়ে এক পাশে ফেলে দেওয়া সম্ভব হয়নি। আবার এর নিচে আরও কেউ আটকে থাকতে পারেন- এই আশঙ্কাও ছিল। তাই কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক স্ল্যাবটি উঁচু করে ধরে রাখেন এবং অন্যরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে শিশুটির কাছে পৌঁছানোর পথ তৈরি করতে থাকেন। একপর্যায়ে উদ্ধারকারীরা শিশুটির ছোট্ট মাথাটি দেখতে পান।

ওসোরিও বলেন, তখন শিশুটির মাথার রং কিছুটা বেগুনি হয়ে গিয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছিল, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার কারণে সে ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছিল না।

তিনি বলেন, ধ্বংসস্তূপ সরাতে শুরু করার পর শিশুটি ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে শুরু করে এবং তার শরীরের স্বাভাবিক রং ফিরে আসতে থাকে।

ওসোরিওর ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, ধুলায় ঢাকা পোশাক পরা ছোট্ট শিশুটিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে আনা হচ্ছে। কাছেই রক্তাক্ত হাতের এক ব্যক্তি কাত হয়ে পড়ে আছেন। তার শরীরের একটি অংশ তখনো কংক্রিটের একটি কাঠামোর নিচে আটকে ছিল।

শিশুটিকে বের করার পর ওসোরিও তাকে একজন পুলিশ কর্মকর্তার হাতে তুলে দেন। পুলিশ সদস্য শিশুটিকে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যান। এরপর উদ্ধারকারীরা আটকে থাকা ব্যক্তিটিকে উদ্ধারে মনোযোগ দেন।

ধ্বংসস্তূপ সরানোর সময় ওসোরিও সেখানে ধুলায় ঢাকা পোশাক, জুতা ও একটি খেলনা দেখতে পান। সেগুলো দেখে তার মনে হতে থাকে, ভবনটির নিচে হয়তো আরও অনেক মানুষ আটকে থাকতে পারেন।

তিনি বলেন, “এসব চিন্তা তখন মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে।”

ঐক্যই শক্তি

ওসোরিওর মতে, ওই দু’জনের জীবন রক্ষা সম্ভব হয়েছে উদ্ধারকারীদের সাহস ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার কারণে।

তিনি বলেন, “ঐক্যই শক্তি। কারণ একজন মানুষের পক্ষে একা ওই ধ্বংসস্তূপের অংশটি তোলা সম্ভব ছিল না। সেটি ছিল অনেক বড় ও অত্যন্ত ভারী।”

তিনি আরও বলেন, “স্থির দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে কাজ করা ভালো। প্রত্যেকের সামান্য সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ।”

তৃতীয় দিনে গড়াল উদ্ধার অভিযান

ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর বুধবার ভোরে উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান তৃতীয় দিনে প্রবেশ করেছে। পশ্চিম কলম্বিয়ায় আঘাত হানা শক্তিশালী এই ভূমিকম্পে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সিএনএনের হিসাব।

দেশটির কফি উৎপাদনকারী অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্রে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির পর কলম্বিয়াজুড়ে জাতীয় দুর্যোগ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা ইতোমধ্যে দেশটির পাশে দাঁড়ানোর এবং সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নও উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতায় সহায়তা করছে। ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন ও উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য জোটটি তাদের কোপার্নিকাস স্যাটেলাইট পরিষেবা সক্রিয় করেছে এবং অর্থায়নের ব্যবস্থাও করছে।

কালি ও পেরেইরায়ও চলছে উদ্ধার অভিযান

কালি শহরে মঙ্গলবার ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এক নারীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। জটিল ও বহুজাতিক উদ্ধার অভিযানের পর দমকলকর্মীরা তাকে স্ট্রেচারে করে বের করে আনলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত মানুষ উল্লাসে ফেটে পড়েন।

পেরেইরাতেও উদ্ধারকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা ধসে পড়া একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে আটকে পড়াদের উদ্ধারে মানবশৃঙ্খল তৈরি করেন।

ঘটনাস্থল থেকে সিএনএনের সাংবাদিক ডেভিড কালভার জানান, স্থানীয় মানুষ কোনও প্রস্তুতি ছাড়াই উদ্ধারকাজে নেমে পড়েছেন। কারও পরনে ছিল স্পোর্টস পোশাক, কারও শর্টস, আবার কারও পায়ে ছিল টেনিস জুতা। ভূমিকম্পের আকস্মিকতায় তারা যে অবস্থায় ছিলেন, সেভাবেই মানুষকে উদ্ধারে ছুটে এসেছেন।

কালভার বলেন, পেরেইরার বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের দৃশ্য দেখা গেছে এবং শহরটি ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি।

চোকোতে পৌঁছায়নি পর্যাপ্ত সহায়তা

তবে ভূমিকম্পের উপকেন্দ্রের কাছাকাছি চোকো অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কলম্বিয়ার দরিদ্রতম অঞ্চলগুলোর একটি এই এলাকায় রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় এক আদিবাসী নেতা।

চোকোর লিতোরাল দেল সান হুয়ানের ‘বুয়েনাভিস্তা’ আদিবাসী রিজার্ভের নেতা ভিক্টর চামাপুরো সিএনএনকে বলেন, তাদের এলাকার ‘সব বাড়ি মাটিতে মিশে গেছে।’

তিনি বলেন, “এখন আমরা কোথায় ঘুমাব? আমাদের সতর্ক থাকতে হচ্ছে। এখন বাইরে ঘুমাচ্ছি।”

চামাপুরো কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত খাবার ও ওষুধ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জানান, তাদের সম্প্রদায়ের অন্তত একজন ব্যক্তি আহত হয়েছেন।

বুয়েনাভিস্তা রিজার্ভে সড়কপথে সরাসরি পৌঁছানোর সুযোগ নেই। কলম্বিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত বুয়েনাভেনতুরা বন্দর থেকে নৌপথে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা যাত্রা করে সেখানে পৌঁছাতে হয়।

চামাপুরোর পাঠানো ভিডিওতে দেখা গেছে, কাঠ ও ঢেউটিন দিয়ে তৈরি বেশ কয়েকটি ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে। কিছু ভবন এখনও দাঁড়িয়ে থাকলেও সেগুলো বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নতুন প্রেসিডেন্টের সামনে বড় পরীক্ষা

ভূমিকম্পটি কলম্বিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলারির জন্যও বড় ধরনের প্রথম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগে দায়িত্ব নেওয়া এই ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারে দেশটির অপরাধী চক্র ও বামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য মঙ্গলবার অর্থনৈতিক সহায়তার বিভিন্ন পদক্ষেপ ঘোষণা করেছেন তিনি। যারা ভূমিকম্পে নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, তাদের অস্থায়ী বাসস্থানের ভাড়া পরিশোধে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট।

এদিকে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও কেউ জীবিত আটকে আছেন কি না, তা জানতে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কলম্বিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে স্বেচ্ছাসেবক, দমকলকর্মী, পুলিশ ও আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল একসঙ্গে কাজ করছে। প্রতিটি ক্ষীণ শব্দ বা সামান্য নড়াচড়াও এখন উদ্ধারকারীদের কাছে সম্ভাব্য জীবনের সংকেত- যেমনটি হয়েছিল সেই ছোট্ট শিশুটির ক্ষেত্রে। সূত্র: সিএনএন

 

নিউজজি/এস আর

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers