রবিবার, ২০ জুন ২০২১, ৫ আষাঢ় ১৪২৮ , ৯ জিলকদ ১৪৪২

সাহিত্য

গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও নিপুণ বিশ্লেষক ছিলেন কবি মোহিতলাল মজুমদার

ফারুক হোসেন শিহাব ২৬ অক্টোবর , ২০১৯, ১৪:৩০:২১

  • গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও নিপুণ বিশ্লেষক ছিলেন কবি মোহিতলাল মজুমদার

বাংলা সাহিত্যের একজন নিপুণ ও শব্দ সচেতন কবি ছিলেন মোহিতলাল মজুমদার। ভাবে ও ভাষায় প্রচলিত কাব্যরীতিতে তিনি ছিলেন বিদ্রোহীস্বরূপ। বাংলা সাহিত্যের দেহাত্মবাদী কবি হিসেবে তার রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। তার কাব্যে ক্লাসিক্যাল ভঙ্গি এবং রোমান্টিক ভাবের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। 

প্রথম জীবনে কবিতা লিখলেও পরবর্তী জীবনে সাহিত্য-সমালোচক হিসেবেই তিনি খ্যাতি লাভ করেন। গভীর অন্তর্দৃষ্টি, নিপুণ বিশ্লেষণ ও ভাবগম্ভীর ভাষার মহিমায় মোহিতলালের সমালোচনাধর্মী গ্রন্থগুলো ধ্রুপদী সাহিত্যের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। তথাকথিত সূচীশুদ্ধতার বিপরীতে  রক্ত-মাংস সহ জীবন সাধনার প্রবৃত্তিতে আকৃষ্ট ছিলেন মোহিতলাল মজুমদার। রবীন্দ্র পরবর্তী কাব্যে কবি মোহিতলালের স্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

ভাষারীতির বিশুদ্ধতা নিয়ে তার প্রবল আগ্রহ ও নিষ্ঠা ছিল। কবি ও প্রবন্ধকার-রূপে তিনি বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন লাভ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবদ্দশাতেই তার কাব্য আপন বৈশিষ্ট্যে প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। নজরুল ইসলামের পূর্বে আরবি-ফারসি শব্দের সার্থক প্রয়োগ তার রচনায়ই বিশেষভাবে লক্ষণীয়। 

আজ ২৬ অক্টোবর জন্মদিন। ১৮৮৮ সালের এইদিনে নদীয়ার কাচঁড়াপাড়া গ্রামে মোহিতলাল মজুমদার জন্মগ্রহণ করেন। মোহিতলাল মজুমদারের পৈতৃক বাড়ি ছিল অধুনা পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার চুঁচুড়া মহকুমার অন্তর্গত বলাগড় গ্রামে। তার বাবার নাম নন্দলাল মজুমদার। নন্দলাল ছিলেন কবি দেবেন্দ্রনাথ সেনের জ্ঞাতি ভাই। মোহিতলালের কৈশোর এবং বিদ্যালয়জীবন বলাগড় গ্রামেই অতিবাহিত হয়।

ছোটবেলায় তিনি কিছুদিন কাঁচড়াপাড়ার কাছে হালিশহরে মায়ের মামাবাড়িতে অবস্থান করে সেখানকার বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। মোহিতলাল চার-পাঁচ বছর বয়সে কাশীরাম দাসের মহাভারতের সঙ্গে পরিচিত হন। নয় বছর বয়সে তার রোমান্স পাঠে আগ্রহ জন্মায়। বারো-তেরো বছর বয়সে পলাশীর যুদ্ধ এবং মেঘনাদ বধ কাব্য পড়ে শেষ করেন।

বলাগড় বিদ্যালয় থেকে ১৯০৪ সালে এন্ট্রান্স পাস করেন। ১৯০৮ সালে মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন থেকে বি.এ পাস করেন। কিন্তু অসুবিধায় পড়ে এম.এ পড়া ছেড়ে দেন। ক্যালকাটা হাইস্কুলে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করে ১৯২৮ পর্যন্ত তিনি এই পেশায়ই নিযুক্ত ছিলেন। মাঝে কিছুদিন (১৯১৪-১৭) সেটেলমেন্ট বিভাগে কানুনগো পদে কাজ করেন। 

১৯২৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃত বিভাগে অধ্যাপনা কর্মে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৪৪ সালে অধ্যাপনার চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন মোহিতলাল। তারপর তিনি কলকাতায় চলে যান। পরে বঙ্গবাসী কলেজে গিরিশ সংস্কৃতি ভবনে অধ্যাপনায় যোগ দেন এবং ১৯৪৪ সালে অবসরে যান।

মোহিতলাল মজুমদারের সাহিত্যচর্চার শুরু মানসী পত্রিকার মাধ্যমে। পরে ভারতী ও শনিবারের চিঠিসহ অন্যান্য পত্র-পত্রিকায়ও তিনি নিয়মিত লিখতেন। তার প্রথম দিকের কবিতায় স্বপ্নবিহবল তরুণ মনের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও বেদনা মনোরম ছন্দে প্রকাশ পেয়েছে। 

তার সাহিত্য সৃষ্টির পশ্চাতে নিজস্ব কাব্যাদর্শ, সৌন্দর্যবোধ ও আধ্যাত্মিক মতবাদ ক্রিয়াশীল ছিল।

অবশ্য এই আধ্যাত্মিক মতবাদটি খুব স্পষ্ট নয় বৈষ্ণবতত্ত্বের সঙ্গে বেদান্তের একটা সমন্বয়ের প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। ভাবসাধনার দিক থেকে মোহিতলাল ভোগসর্বস্ব দেহবাদী কবি হয়ে ওঠেন। অর্থাৎ, মোহিতলালের বিদগ্ধ কবি-মানসে শেষ পর্যন্ত ‘কাম’ দেহকে আশ্রয় করে সার্থক হয়ে উঠে। যা তাকে ভাব ও দেহবাদী কবির স্বীকৃতি দেয়।

কবি মোহিতলাল রচিত মানস-লক্ষ্মী কবিতার প্রথম কয়েকটি পঙক্তি এমন-

‌আমার মনের গহন বনে

পা টিপে বেড়ায় কোন উদাসিনী

নারী-অপ্সরী সঙ্গোপনে!

ফুলেরি ছায়ায় বসে তার দুই চরণ মেলি

বিজন-নিভৃতে মাথা হতে দেয় ঘোমটা ফেলি,

শুধু একবার হেসে চায় কভু

নয়ন কোণে,

আমারি মনের গহন বনে।'

দুরন্ত দেহবাসনার উত্তাল তরঙ্গেই প্রেয়সী নারীর সৌন্দর্য-সম্মোহন উপভোগ করেছেন মোহিতলাল। তিনি নারীর মোহিনীরূপে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন-

‘সুন্দরী সে প্রকৃতিরে জানি আমি মিথ্যা সনাতনী

সত্যেরে চাহিনা তবু সুন্দরের করি আরাধনা’

‘তিমির তীর্থে’ কবি ‘দেহ’-কে ক্ল্যাসিক কবির মতোই মন্দির বলেছেন এবং প্রেমকেও ক্ল্যাসিকাল  পূজার মনোবৃত্তিতেই দেহোপাসনা বলেছেন বারংবার। বাংলা কাব্যে বিদেশী শব্দ, বিশেষ করে আরবি-ফারসি শব্দ প্রয়োগে মোহিতলালের বিশেষ কৃতিত্ব ছিল। তিনি ইংরেজি সাহিত্যেও সুপণ্ডিত ছিলেন। বাংলা ছন্দ ও অলঙ্কার বিষয়ে তার বিশেষ ব্যুৎপত্তি ছিল। মোহিতলাল রবীন্দ্রকাব্যের একজন রসজ্ঞ ও মর্মজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। 

তবে পরবর্তীতে শনিবারের চিঠির দলে যোগ দিয়ে তিনি রবীন্দ্রবিরোধী হয়ে ওঠেন। কাব্য বিচারে তিনি পঞ্চাশ-উত্তীর্ণ রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে বিশেষ মর্যাদার চোখে দেখেননি। তিনি বঙ্গ সাহিত্য-সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ আসনে মাইকেল ও বঙ্কিমচন্দ্রকে বসানোর চেষ্টা করেন।

শিল্প ও সাহিত্য সম্পর্কিত সমস্যাগুলি দেখানোর ক্ষেত্রে তার একটা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। তার মননধর্মিতা এবং কবিসুলভ ভাবাত্মক বিচারবোধ সমালোচনা সাহিত্যকে উচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি তার সমালোচনামূলক প্রবন্ধগুলিতে ‘কৃত্তিবাস ওঝা’, ‘সব্যসাচী’, ‘শ্রী সত্যসুন্দর দাস’ ইত্যাদি ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন।

তার কাব্যে প্রেমপরিবেশে তাই ফুল, মালা, স্রগ্ধ-চন্দন ইত্যাদি অনিবার্যভাবে স্থান নিয়েছে। ‘তিমির তীর্থে’ পথিক কবি ‘দেহ’-কে ক্লাসিক কবির মতোই মন্দির বলেছেন এবং প্রেমকেও ক্লাসিকাল পূজার মনোবৃত্তিতেই দেহোপাসনা বলেছেন বারংবার। বলা বাহুল্য এইখানেই শিল্পী হিসেবে সমকালীন কবিদের তুলনায় মোহিতলালের এতখানি স্বাতন্ত্র্য ও বিশিষ্টতা। তার কাব্যে ক্লাসিক্যাল ভঙ্গি এবং রোমান্টিক ভাবের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।

মৌলিক গ্রন্থ, সমালোচনা ও সম্পাদিত গ্রন্থ মিলিয়ে মোহিতলাল মজুমদারের অনেকগুলো প্রকাশিত গ্রন্থ রয়েছে। প্রথম প্রকাশিত কাব্য ‘দেবেন্দ্রমঙ্গল’ ১৬টি সনেট নিয়ে প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে। তার সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘ছন্দচতুর্দশী’ ৫৪টি সনেট নিয়ে প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালে। 

বর্ণাঢ্য সাহিত্যজীবনে তার রচিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হলো- দেবেন্দ্র-মঙ্গল (১৯২২), স্বপন-পসারী (১৯২২), বিস্মরণী (১৯২৭), স্মরগরল (১৯৩৬), হেমন্ত-গোধূলি (১৯৪১), ছন্দ চতুর্দশী (১৯৪১), সনেট সঙ্কলনের মধ্যে রয়েছে- কাব্য মঞ্জুষা, তন্মধ্যে ‘দেবেন্দ্র-মঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থটি ছিল আত্মীয় ও কবি দেবেন্দ্রনাথ সেনের প্রশস্তিমূলক ১৬টি সনেটের সঙ্কলন। 

একইভাবে তার প্রবন্ধগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- আধুনিক বাংলা সাহিত্য (১৯৩৬), সাহিত্যকথা (১৯৩৮), বিবিধ কথা (১৯৪১), বিচিত্র কথা (১৯৪১), সাহিত্য বিতান (১৯৪২), বাঙলা কবিতার ছন্দ (১৯৪৫), বাঙলার নবযুগ (১৯৪৫), জয়তু নেতাজী (১৯৪৬), কবি শ্রীমধুসূদন (১৯৪৭), সাহিত্য বিচার (১৯৪৭), বঙ্কিমবরণ (১৯৪৯), রবি-প্রদক্ষিণ (১৯৪৯), শ্রীকান্তের শরৎচন্দ্র (১৯৫০), জীবন জিজ্ঞাসা (১৯৫১), বাঙলা ও বাঙালি (১৯৫১), কবি রবীন্দ্র ও রবীন্দ্র কাব্য (প্রথম খণ্ড ১৯৫২, দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৫৩) এবং বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস (১৯৫৫)। বঙ্গদর্শন পত্রিকা তৃতীয় পর্যায়ে মোহিতলালের সম্পাদনায়ই প্রকাশিত হয়।

নিউজজি/ এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers