শনিবার, ৮ মে ২০২১, ২৫ বৈশাখ ১৪২৮ , ২৫ রমজান ১৪৪২

সাহিত্য

রবীন্দ্রানুসারী কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা

নিউজজি ডেস্ক ২ মে , ২০২১, ০১:৫৪:১২

  • সংগৃহীত

ঢাকা : বিশ শতকে বাঙালি মুসলমানের সামাজিক জাগরণে নারীর অবস্থান যারা নিশ্চিত করেছেন, তাদের একজন মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা। স্বনামধন্য রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, শামসুন্নাহার মাহমুদ ও সুফিয়া কামালের পর্যায়ভুক্ত তিনি। আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত না হলেও সৃজনশীল মন ও বুদ্ধিবৃত্তিক মনন দিয়ে স্বকালের স্বসমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ১৯০৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর পৈতৃক নিবাস কুষ্টিয়া জেলার পাবনা শহরের নিয়াজতবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই কবি। কৈশোরে রচিত কবিতা ও রূপকথায় তার নাম পাওয়া যায় শ্রী রকিবননেছা মহম্মদা খাতুন। তাছাড়া সে সময়ে তার ডাক নাম ছিল বাতাসি।

মাহমুদা খাতুনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত। আকৈশোর ছবি আঁকার প্রতি তার ঝোঁক ছিল। পরবর্তীকালে স্বাস্থ্যরক্ষা ও রন্ধনশিক্ষায় ডিপ্লোমা অর্জন করেন। পারিবারিক পরিবেশ ছিল সাহিত্যচর্চার অনুকূলে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে লেখা ‘বসন্ত’ নামক কবিতায় লিখেছেন- আজি কত দিন পরে/বসন্ত আইল ঘরে/চারিদিক সাজাইয়া/ঢোলবাদ্য বাজাইয়া/ফুলের সাজে আইলরে/বসন্ত আবার ঘরে/জুঁই বেলি চারিদিকে/বসন্ত মাঝারে থাকে/কচি কচি পাতা ফোটে/বসন্ত বাহার উঠে।

কথাসাহিত্যিক মোহাম্মদ নজিবর রহমান ছিলেন তার গৃহশিক্ষক। কায়কোবাদের অশ্রুমালা ও সমকালীন সাহিত্যপত্রে প্রকাশিত রচনাবলি তাকে প্রভাবিত করে। পিতার সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে থেকেছেন। একসময় জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিঙেও কিছুকাল অবস্থান করেছেন। তাছাড়া দিল্লি, আগ্রা, আজমির প্রভৃতি স্থান ভ্রমণ করেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাননি। বাড়িতেই উচ্চশিক্ষিত বাবার কাছে এবং গৃহশিক্ষকের কাছে পাঠ নিয়েছেন। আর পাঠ নিয়েছেন প্রকৃতি থেকে। সবাই তাকে চিরকুমারী বলেই জানে। নাসিরউদ্দিন এক লেখায় লিখেছেন- ‘বাল্যকালে মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার বিবাহ হয় কিন্তু তার বিবাহিত জীবন খুব স্বপ্নকাল স্থায়ী। তিনি স্বামীগৃহে যাননি, বিবাহিত জীবন উপভোগ করেননি।’

মাহমুদা খাতুন তার আত্মকথায় লিখেছেন- ‘আমি যখন মিশন স্কুলে ক্লাস টুতে পড়ি, সেই সময় কবিতা লিখতে শুরু করি। বারো কি তেরো বছর বয়সে আমার প্রথম কবিতা পত্রিকায় ছাপা হয়। ছোটবেলা থেকে আমি মুক্ত প্রকৃতির মধ্যে ঘুরে বেড়াতাম। মায়ের মৃত্যুর পর কোনো শাসন ছিল না বলেই আমার এক কৃষাণী বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতাম বনে-জঙ্গলে, পুকুর ধারে, বাড়ির পেছনে ছিল বিরাট আমবাগান। সেখানকার পাখির ডাক, বুনোফুল আমাকে মুগ্ধ করত। দু-এক লাইন করে কবিতা লিখতাম। সেই সময় আমার গৃহশিক্ষক ছিলেন বিখ্যাত ‘আনোয়ারা’ গ্রন্থের লেখক মজিবর রহমান। তিনি আমার কবিতা লেখায় উৎসাহ দিতেন। আমার মায়ের অনেক বই ছিল। আমি চুপি চুপি সেইসব বই পড়তাম। তা থেকেই আমি জীবন ও প্রেম সম্পর্কে সচেতন হই। বাবার একজন হিন্দু কেরানি আমাকে ‘খোকাখুকু’ ও ‘শিশুসাথী’র গ্রাহক করে দেন। আমার কবিতা লেখার পেছনে বাবার প্রেরণা ছিল। বাবার বদলির চাকরির জন্য কোনো এক জায়গায় বেশি দিন থাকতে পারতাম না। তাই বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন স্কুলে পড়াশোনা করেছি। রাজশাহী এসে মিশন স্কুলে ভর্তি হলাম, তখন মেমসাহেবের সংস্পর্শে এসে আমার মনে অনেক আধুনিক চিন্তাধারার সৃষ্টি হয়। বাড়িতে তখন ভীষণ কড়া পর্দা। আমার বড় বোনকে স্কুল থেকে নাম কাটিয়ে পর্দায় আব্রু করা হয়েছে। আমার বেলা সেটা সম্ভব হতে দেইনি। দেশ বিভাগের পূর্বে কোলকাতা থেকে প্রকাশিত মানসী ও মর্ম্মবাণী, উদয়ন, বসুমতি, প্রদীপ, কিষাণ, অগ্রগতি, সওগাত, মোহাম্মদী, বুলবুল, আজকাল, দীপালি, জয়ন্তী, বঙ্গলক্ষ্মী, উত্তরায়ণ, গুলিস্তান, যুগান্তর, মোয়াজ্জিন, আনন্দবাজার [পত্রিকা], বেগম, নবশক্তি, নবযুগ, স্বাধীনতা, নায়ক, সত্যযুগ, পুষ্পপত্র ইত্যাদি পত্রিকায় আমার লেখা বের হয়েছে।’

মাহমুদা খাতুন ছিলেন শান্তশিষ্ট। কিন্তু ভেতরে ছিলেন দ্রোহী। সমাজে প্রচলিত নারীর অবরোধ প্রথা মেনে নেননি। অল্প বয়সেই বেরিয়ে আসেন চার দেয়াল থেকে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা হওয়া নিয়ে তিনি স্মৃতিকথায় লিখেছেন- ‘বিশ্বকবির পায়ে হাত দিয়ে সেলাম করলাম। আমি সেলাম করে উঠলে দু’হাত ঊর্ধে- তুলে চোখ বন্ধ করে বহুক্ষণ ধরে কী প্রার্থনা সারলেন। আমি অবাক হয়ে দেখছি তার সর্বদেহ থেকে আলোক বিকিরণ হতে লাগল। তারপরে তিনি পাশে বসিয়ে গল্প করতে আরম্ভ করলেন, ‘তোমরা যে পর্দা থেকে বাইরে এসেছ এই আমি আশ্চর্য হয়েছি। দ্যাখো সূর্যের কিরণ না পেলে যেমন গাছপালা বড় হয় না, ফল-ফুল ভালো দেয় না, মানুষও তেমনি বাইরের আলো-বাতাস ছাড়া পূর্ণ হতে পারে না। পদ্ম পঙ্ক থেকে ঊর্ধে- উঠেই সূর্যের কিরণ লাভ করে, না হলে সে লাভ করতে পারত না। আর এখানেই তার সার্থকতা।’ 

মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা মূলত কবিতাই লিখেছেন। স্বভাবজাত প্রেরণায় অনবরত কবিতা লিখেছেন এবং সেগুলো সমকালীন সাময়িক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তার কাব্যপ্রতিভা হয়তো তার কর্মখ্যাতির সমতুল্য ছিল না, কিন্তু নিষ্ঠা ও প্রয়াস তাকে রবীন্দ্রানুসারী কবিদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট আসনে সমাসীন করেছে। মাহমুদা খাতুন সনেট এবং গদ্যছন্দেও কিছু কবিতা রচনা করেছেন। প্রকৃতি ও পরিবেশ এবং মানুষ ও সমাজ তার কবিতায় ঘুরে ফিরে এসেছে। কখনো সাময়িক প্রসঙ্গ হয়েছে তার কবিতার বিষয়বস্তু। দুই মহাযুদ্ধের তা-বলীলা তাকে শান্তির অনিবার্যতায় আস্থাশীল করেছে। তাই শান্তির স্বপক্ষে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন উদাত্ত কণ্ঠে। যেহেতু তার কাছে কবিতা ছিল ‘হৃদয়ের বিশুদ্ধ উচ্চারণ’, সেহেতু তার নিজের কবিতাও ছিল মৌলিক এবং এক প্রশান্ত গতিপথে প্রবাহমান।

১৯৩০-এর দশকের শুরুতে কবি হিসেবে মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার আত্মপ্রকাশ। তার প্রথম কবিতার বই ‘পশারিনী’ প্রকাশিত হয় ১৯৩২ সালে। এই বই সম্পর্কে সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনের মন্তব্য- ‘বাংলা ভাষায় মুসলিম (মহিলা) কবির ইহাই প্রথম প্রকাশিত আধুনিক কবিতার বই। এতে তিনি প্রকৃতি, প্রেম ও বিরহ নিয়ে কতকগুলো কবিতা লিখেছেন।’

বসন্ত বিদায় কবিতায় মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা লিখেছেন- বসন্ত উৎসব আজ হয়ে গেছে শেষ/পড়ে আছে বাসি ফুল-মালা,/রিক্ত ভূষা উদাসিনী ধরণীর বুকে/জাগে শুধু বুক ভরা জ্বালা।

মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার কবিতায় মানুষের সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনার আন্তরিক প্রকাশ ঘটেছে। প্রকৃতির রূপবৈচিত্র তার কবিতায় প্রাণের স্পর্শ লাভ করেছে। অত্যন্ত অল্প বয়সে কবি প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে। তিনি কেবল কবিতাই লিখতেন না, ‘শান্তি’, ‘দীপক’ ও ‘সবুজ বাংলা’ প্রভৃতি পত্রিকায় তার বেশ কয়েকটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছিল। দুই শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলামের সঙ্গে মাহমুদা খাতুন যোগাযোগ করেন। তাদের আশীর্বাদ ও অনুপ্রেরণা পান। ‘পরিচয়’ প্রকাশের জন্যে মাহমুদা রবীন্দ্রনাথকে একটি কবিতা পাঠিয়েছিলেন, কবিতা পেয়ে প্রাপ্তি স্বীকার করে রবীন্দ্রনাথ তাকে লেখেন-

কল্যাণীয়াসু,

আমার শরীর অত্যন্ত ক্লান্ত এবং দুর্বল। যথাসাধ্য সকল কাজ থেকে নিষ্কৃতি নেওয়ার চেষ্টা করছি। তোমার কবিতাটি পরিচয়-এর সম্পাদকের কাছে পাঠাই, আশা করি তারা ছাপাবেন, কিন্তু সম্পাদকীয় বিচারবুদ্ধির ওপর আমার কোনো হাত নেই এ কথা নিশ্চিত জেনো। দেখেছি তারা অনেক সময় অনেকের ভালো লেখাকেও বর্জন করে থাকেন; তার পরিচয় পেয়েছি।

ইতি

শুভার্থী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

৩ আশ্বিন, ১৩৪২

মাহমুদা খাতুনের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ তিনটি- পশারিণী, মন ও মৃত্তিকা, এবং অরণ্যের সুর। এ ছাড়া কিছু প্রবন্ধ ও ছোটগল্পও রচনা করেছিলেন, কিন্তু সেগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। ষাটের দশক পর্যন্ত তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ও খ্যাতিমান মহিলা কবি। স্বাধীনতার পরে তিনি আড়ালে চলে যান। সমাদর ছিল না বলে জীবনের শেষ আট-দশ বছর সভা-সমাবেশে আসতেন না। ধর্মান্ধতা, গোড়ামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার বলিষ্ঠ প্রতিবাদের ফলে বন্ধিত্বের অবসান ঘটিয়ে আলোয় এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তার সংগ্রাম ছিল সমকালীন সমাজে নারীর প্রতি অযাচিত ও অন্যায়ভাবে আরোপিত বিধি-নিষেধের বিরুদ্ধে। এ ছাড়াও তিনি অধিকার বঞ্চিত নিগৃহীত নিপীড়িত অসহায় মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সর্বাত্মক সহানুভূতি ব্যক্ত করেছেন নির্দ্বিধায়। শুধু কাব্যচর্চা নয়, সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করতেও তিনি সমাজসেবামূলক কাজ করতেন। তার কবিতার স্বভাব ছিল শীতল, ছন্দের কোমল মাধুর্য পাঠকের মনকে পরিষ্কৃত করে, তার বক্তব্যে কোথাও অস্পষ্টতা নেই। মাহমুদা খাতুন বহু সাহিত্যসভায় অংশগ্রহণ করেছেন। সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক জীবনযাপন তার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। ১৯৬৭ সালে বাংলা একাডেমি তাকে সাহিত্য পুরস্কার এবং ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার একুশে পদকে ভূষিত করে। ৭১ বছর বয়সে এই কবি ১৯৭৭ সালের ২ মে পরলোকগমন করেন।

বিভাগপূর্ব বাংলা সাহিত্যে মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের কাব্যকীর্তির অপ্রতুলতায় পূর্ণতার মানসে হঠাৎ আলোর দ্যুতি নিয়ে আবির্ভাব যশস্বী কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা। তিনি স্বকালে মুসলিম কবিদের অকর্ষিত ঊষর কাব্যভূমে স্বীয় মেধা, মনন ও প্রজ্ঞার অমিয় বারি সিঞ্চনে সজীব ও শ্যামলতায় প্রাণবন্ত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। দৃঢ় প্রত্যয় ও একনিষ্ঠতায় বিভাগপূর্ব বাংলা সাহিত্যে মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের অস্তিত্বের সংকটকালে শেষ পর্যন্ত তিনি নিজস্ব অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। তার সৃষ্ট পথপরিক্রমায় পরবর্তী মুসলিম কবি-সাহিত্যিকরা সাহিত্য সাধনার পরম্পরা ও প্রেরণার যোগসূত্রের সন্ধান পেয়েছিলেন।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers