সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১ আশ্বিন ১৪২৮ , ১৮ সফর ১৪৪৩

সাহিত্য

গল্পলেখক নরেন্দ্রনাথ মিত্রের প্রয়াণ দিবস আজ

নিউজজি ডেস্ক ১৪ সেপ্টেম্বর , ২০২১, ১২:১৮:২৮

62
  • গল্পলেখক নরেন্দ্রনাথ মিত্রের প্রয়াণ দিবস আজ

ঢাকা: সাধারণ মানুষের অতিসাধারণ কথা ও মুহূর্তগুলো ছিল তার গল্পের উপাদান। সহজ ভাষায় জীবনের কঠিন অথচ বাস্তবকে তুলে ধরাই ছিল তার গল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি সেই গুটি কয়েক পারদর্শী লেখকদের একজন যার লেখার মধ্যে একই সঙ্গে স্থান করে নিয়েছে উপনিবেশিক মধ্যবিত্ত-মন, উপনিবেশ-উত্তর মধ্যবিত্ত ও বিশ্বায়ন পরবর্তী মধ্যবিত্ত বাঙালির কাল-পর্ব।

বাংলা ছোটগল্পের ধারায় প্রবাদপ্রতিম কারিগর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলেও রবীন্দ্র বলয় থেকে উত্তরণের জন্য কল্লোলীয় ভাবনায় যুক্ত হয়েছিলেন একঝাঁক তারুণ্যদীপ্ত মেধাবী। রুশ বিপ্লবের প্রভাবে সেই ভাবনায় যুক্ত হয়েছিল মার্কসবাদী ধারণা। বিশ্ব পরিমণ্ডলের সাহিত্য বিষয় ও প্রকরণসহ বাংলা সাহিত্যে আলোচিত হতে থাকে তখন থেকেই। এরই সঙ্গে যুক্ত হয় ফ্রয়েডিয় ধারণা, প্রথম মহাসমর পরবর্তী ক্ষত-বিক্ষত সময়। বাংলা সাহিত্য যখন এসব কিছুকে ধারণ করে একটি পরিণত পথ বিনির্মাণের চেষ্টায় রত ঠিক সে সময়ের বুকে সৃষ্টি হয় আর একটি বড় ক্ষত, দ্বিতীয় মহাসমর। আর্থ-সামাজিক জীবন পতিত হয় বিপর্যের মুখে। মানুষের প্রতি মানুষের চরম অবিশ্বাস-ক্ষোভ-হতাশা এক ভিন্নতর জীবনবাস্তবতা রচনা করে।

ছোটগল্পের বড় লেখক নরন্দ্রেনাথ মিত্রের জন্ম ৩০ জানুয়ারি ১৯১৬ (১৬ মাঘ, ১৩২৩ বঙ্গাব্দ) ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার সদরদী গ্রামে। পিতা মহেন্দ্রনাথ মুন্সেফ কোর্টের নকলনবীশ, মাতা বিরাজ বালা ছিলেন গৃহিণী। বাংলাসাহিত্যের অনালোচিত-অনালোকিত এই লেখক পৃথিবী ছাড়েন ১৯৭৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর।

শৈশবে সদরদী এম, ই স্কুল শেষ করে ভাঙ্গা হাইস্কুলে ভর্তি হন। ১৯৩৩ সালে ভাঙ্গা হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় কয়েকজন সহপাঠীর সঙ্গে মিলে প্রকাশ করেন হাতে লেখা দু’টি পত্রিকা ‘আহ্বান’ ও ‘মুকুল’। ১৯৩৫-এ ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএ পাশ করেন। এই কলেজের আর এক কৃতি ছাত্র নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রকাশ করেন হাতে লেখা মাসিক পত্রিকা ‘জয়যাত্রা’।

উত্তাল চল্লিশের দশকে কুড়ি বছরের যুবক নন্দ্রেনাথ মিত্র ফরিদপুর ছেড়ে বিএ পড়তে চলে যান সিটি অব জয়-খ্যাত কলকাতাতে। পেশাগত জীবনে অনিশ্চয়তা, মেস থেকে ভাড়া বাড়ি-স্থায়ী ঠিকানার খোঁজে বার বার স্থান বদল, অন্যদিকে কলকাতা-বাংলাদেশ-ভারত, সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের পট পরিবর্তন-দেশভাগ, স্বাধীনতা, উদ্বাস্তু সমস্যা—এর সবই নরেন্দ্রনাথ মিত্রের কলকাতায় আসার প্রথম দেড় দশকের মধ্যকার ঘটনা। এ কারণে দাঙ্গা-দুর্ভিক্ষ-মন্বন্তর-মহামারি-মিছিল-শ্লোগান-কবিতা-প্রতিবাদে তার সাহিত্য হয়ে উঠেছে কালোত্তীর্ণ। সেখানে যেমন বিধৃত হয়েছে ইতিহাস, তেমনি স্পষ্ট হয়েছে এর শ্রেণি-বৈচিত্র্য। আর একই ধারাবাহিকতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পরিবর্তন এসেছে শহরটি মেট্রোপলিটন চাউনিতে। এর কোনোকিছুই বাদ যায়নি তার কথাসাহিত্য থেকে।

নরেন্দ্রনাথ মিত্রের বিপুল সাহিত্য অনেকখানিই রস নিয়েছে পূর্ব বাংলার ভূগোল থেকে। তার চেয়েও বড় কথা প্রাদেশিক একটি জনপদের লৌকিক বাংলার কাহিনি বয়ান করলেও বুনোটের নান্দনিক সৌকর্যে তা চিরায়ত ও মহান হয়ে উঠেছে। এখানেই তার গৌরব। ফরিদপুর এমন প্রতিভাবান সাহিত্যিকে জন্ম দিতে পেরে সঙ্গতভাবেই এই গৌরবের অংশীদার। তাই জন্মশতবর্ষে এই আনন্দময় সময়ে আমরা লেখকের শৈশব ও তার শিল্পী-মানস গড়ে উঠার রসায়নটি খুঁজে দেখতে পারি। তিনি জন্মে ছিলেন আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী একান্নবর্তী পরিবারে। এক চালার নিচে সেখানে আদরে-স্নেহে পল্লবিত হতো নানা রঙের সম্পর্ক জাল। বাবা-মা-ভাই-বোন ছাড়াও পরিবারে ছিল পিসি ঠাকুরমা, ঠাকুরদা-কাকা-কাকি-কাকাতো-জ্যাঠাতো ভাই-বোনেরা। এরা প্রত্যেকেই ছিল এক-একটি জীবন্ত চরিত্র।

সব লেখকই কমবেশি নিজের চেনা-জানা গণ্ডির ভেতর থেকে গল্পের উপাদান খুঁজে নেন। এর ভেতরেই খুঁজে পাওয়া যায় স্বয়ং লেখকের অস্তিত্বের নানা দিক। এর ভেতরেই নিপূণভাবে যুক্ত হয় নানা বোধ-চিন্তা আর গল্পের নানান ফোড়ন। নরেন্দ্রনাথ মিত্রও কথাসৃজনের বিস্তৃত ক্ষেত্রে আশার প্রদীপশিখা প্রজ্জ্বলন করেছেন তার ছোটগল্পে। তার ‘চাঁদমিঞা’, ‘কাঠগোলাপ’, ‘চোর’, ‘রস’, ‘হেডমাস্টার’, ‘পালঙ্ক’, ‘ভুবনডাক্তার’, ‘সোহাগিনী’, ‘আবরণ’, ‘সুহাসিনী’, ‘তরল আলতা’ প্রভৃতি উল্লেযোগ্য গল্পে অর্থনৈতিক-সামাজিক-মানসিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে ইতিবাচক জীবনের আলেখ্য।

পাঠককে নিমগ্নচিত্তে গল্পপাঠে মুগ্ধতার সঙ্গে ধরে রাখার এক অসামান্য শিল্পশক্তির আধার তার গল্পমালা। ৫১টি গল্পগ্রন্থ এবং ৩৮টি উপন্যাসের সার্থক কারিগর তিনি। শুধু সংখ্যার বিচারে পাঁচ শতাধিক গল্পের শিল্প-স্রষ্টা মাত্র তিনি নন; মানের কষ্টিপাথরেও তা ঝকমক করে। তার সাহিত্যকর্ম অবলম্বন করে বিশ্বখ্যাত চিত্রনির্মাতারা চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন। এই তালিকায় আছে সত্যজিত্ রায়ের ‘মহানগর’, অগ্রগামীর ‘হেডমাস্টার’, ‘বিলম্বিতলয়’, রাজেন তরফদারের ‘পালঙ্ক’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। অমিতাভ বচ্চন অভিনীত ‘রস’ গল্প অবলম্বনে নির্মিত হিন্দি চলচ্চিত্রের নাম ‘সওদাগর’। তার অনেক গল্পই হিন্দি, মারাঠি, রুশ, ইংরেজি, ইতালীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে। কর্মজীবনে অনেক ঘাত-অভিঘাত শেষে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকায় যোগদান করেন এবং আমৃত্যু সেখানে কর্মরত ছিলেন। 

দেশভাগের পর তিনি কলকাতায় স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন। আর তার বাংলাদেশে আসা হয়নি। বাংলাসাহিত্যে মানিক, বিভূতি, তারাশঙ্কর-এই ত্রি-বন্দ্যোপাধ্যায়সহ নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র কিংবা সুবোধ ঘোষ যতটা আলোচিত, তার চেয়ে নরেন্দ্রনাথ মিত্র কম আলোচনার দাবি রাখেন না।

নরেন্দ্রনাথ মিত্র আমাদের এমন বিপুলভাবে ঋণী করে রেখেছেন যে, আজ উত্তরসূরিদের এ কথা সহজভাবেই স্বীকার করা প্রয়োজন, তাঁর ঋণ শোধ করার মতো যোগ্যতা আমরা এখনো খুব বেশি অর্জন করতে পারিনি। কারণ, তিনি বাংলা ছোটগল্পের এমন এক আশ্চর্য শিক্ষক বা পাঠশালা ছিলেন, যার কাছ থেকে ব্যক্তিগত বা সম্মিলিত শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজন আমাদের খুব সহজে ফুরোবে না। যদিও বাংলা ছোটগল্পের পরিমণ্ডলে তিনি অনেকটাই অনালোচিত-অনালোকিত। অথচ তার গল্পের বিষয় ও কাঠামোগত বিন্যাস বাংলা ছোটগল্পে তো বটেই, বিশ্বসাহিত্যেও মর্যাদার সঙ্গে উল্লেখের দাবি রাখে। ১৯৬২ সালে তিনি আনন্দ পুরস্কার পান।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
        
copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers