মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ , ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৮

সাহিত্য

জহির রায়হান : লেট দেয়ার বি লাইট

সাজিদুল হক ২০ আগস্ট , ২০২৫, ১৭:২১:০২

595
  • জহির রায়হান : লেট দেয়ার বি লাইট

"জহির রায়হানকে বলা যাবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক সব্যসাচী প্রতিভা। তিনি একাধারে পরিচালক,প্রযোজক,চিত্রনাট্যকার, গল্পকার, সিনেমায় সঙ্গীতের ব্যবহারেও রয়েছে অবদান। বেহুলা, সঙ্গম,জীবন থেকে নেয়ার মত চলচ্চিত্র তার সৃষ্টি।

তিনি গল্প লেখার পাশাপাশি শেষ বিকেলের মেয়ে,হাজার বছর ধরে, আরেক ফাল্গুন এর মত কালজয়ী উপন্যাসেরও জনক। স্টপ জোনেসাইড প্রামাণ্য চিত্রে তিনি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন। এই সব্যসাচী প্রতিভা মরণোত্তর বাংলা একাডেমি, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন। ১৯ আগষ্ট ছিল তার জন্মদিন। জহির রায়হানের  জন্যে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি। "

সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, সৃজনশীলতার সব মাধ্যমকে অতিক্রম করে বাঙালির চিন্তার মানসে তিনি একজন মানবিক মানুষ হিসেবে প্রবহমান। যদিও এই মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হোন মুক্ত স্বদেশে। কিন্তু বিহারি অধ্যুষিত মিরপুর তখনো অরক্ষিত ছিলো। জীবন নাশের হুমকি বিদ্যমান। অকুতোভয় সংগ্রামী অন্য কেউ নন। তিনি শহিদ জহির রায়হান।

ভাষা সংগ্রামের মধ্যদিয়ে উপনিবেশ ভেঙে নতুন একটি জাতিরাষ্ট্র গঠন করতে হবে, তেমন ধারণা রাজনৈতিক এবং সংস্কৃতিকর্মীদের চিন্তায় জায়গা করে নিলেও, কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে বোধকরি অক্ষরের শক্তিতে প্রথম জহির রায়হান কাজটি করেছিলেন। 'আরেক ফাল্গুন' উপন্যাসের মাধ্যমে। ভাষা আন্দোলনের অনন্য আক্ষরিক দলিল। তারুণ্যের রক্তক্ষরণে ফোটা রক্তজবা। যে রক্তজবা থেকে জন্মে অমূল্য কথা।

আসছে ফাল্গুন আমরা দ্বিগুণ হবো।

ষাটের দশকে লেখা উপন্যাসে নতুন এক মানচিত্রের ইঙ্গিত আমরা পাচ্ছি।বাঙালির জন্য স্বাধীন পাকিস্তান পরিণত হলো উপনিবেশে। জহির রায়হানের উপলব্ধি, আজকের সাংস্কৃতিক লড়াই শেষপর্যন্ত স্বাধীকার আন্দোলনের দিকে যাবে।

একজন কথাসাহিত্যিক, রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক কর্মী, চলচ্চিত্র পরিচালক, এইযে বহুপ্রজ দূরসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গির ব্যক্তিত্ব, যিনি প্রতিটি ক্ষেত্রে বাঙালির মুক্তি, সাম্য আর অধিকারের কথা বলতে চাইতেন। তারতো প্লাটফর্মের অভাব ছিলো না। মধ্যবিত্ত সমাজের একজন মানুষ হিসেবে তার বেড়ে ওঠা। কিন্তু গভীর অভিনিবেশ শ্রমিক শ্রেণির অভাব অভিযোগ যেমন তার নজর এড়াতো না, একইভাবে নিজের শ্রেণিদ্বন্দ্বের ক্রিয়াশীল বাস্তবতার পাশাপাশি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উত্থান পতনের প্রতিটি মুহূর্ত চিন্তার সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দী করে রেখেছেন। জহিরের কথাসাহিত্যের মনোযোগী পাঠকমাত্রই জানেন, চলচ্চিত্রের নিজের যেমন ভাষা আছে। তদ্রূপ গল্প-উপন্যাসের আছে স্বতন্ত্র অবলোকন, সে আলোকে নির্মিত হয় ভাষাশৈলী।

জহির রায়হান যেহেতু সিনেমা বানাতেন, একই ব্যক্তি শব্দের বুননে পৃষ্ঠার পরে পৃষ্ঠা লিখে দাঁড় করাতেন কাহিনি। সমাজ ও রাষ্ট্রের দেখা চরিত্রের মুখে সংলাপ আর ঘটনার বিবরণে লিখতেন উপন্যাস।

সে উপন্যাসের ভাষা বৈশিষ্ট্য কেমন?

চলচ্চিত্রের যাদুকর মানুষটির হাতে কথারা যখন প্রাণ পায় কাহিনীতে, তাতে জহির রায়হানের নিজস্ব মেজাজের প্রতিফলন ঘটবে, এটাই অনিবার্য হওয়া উচিৎ। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে জহিরের ভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, দীর্ঘ বাক্যের পরিবর্তে চিত্রনাট্যের আদলে বাক্যগঠন এবং স্বল্প বাক্যব্যয়ে সংলাপ ধরিয়ে দেন চরিত্রের মুখে। চলচ্চিত্রের ফরম্যাটে কাট টু কাট।

১৯৬১ সনে প্রথম চলচ্চিত্র কখনো আসেনি ছবিতে ব্যক্তিপ্রেম এবং সময়ের ব্যবচ্ছেদে যুবক যুবতীর শ্রেণি দ্বন্দ্বকে তুলে আনা হয়েছে। প্রচ্ছন্ন রাজনীতি থেকে জহির রায়হান বারুদের স্বভাবে নির্মাণ করলেন, 'জীবন থেকে নেয়া'। এখানে একটি পরিবারের কাহিনি বিন্যস্ত হলেও, আসলে প্রতীকী রূপে এসেছে মাতৃভূমির আকাঙ্ক্ষা। স্বৈরতন্ত্রের হাতে বন্দি রাষ্ট্রকে তিনি প্রতিকায়িত করলেন পরিবারের কয়েকটি চরিত্রের স্বভাবে। প্রধান চরিত্র কুক্ষিগত করে আছেন সকল ক্ষমতা।

নির্যাতিত একটি চরিত্রের মুখে আমরা প্রতিনিয়ত বলতে শুনি, এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে।

কি অসাধারণ প্রফেসি জহির রায়হানের। উনসত্তর থেকে একাত্তর। মাত্র দুটো বছরের ব্যবধানে খাঁচা ভাঙা হলো।

মুক্তির এই চেতনায় তিনি লিখেছেন 'আর কতদিন' উপন্যাস। পরবর্তীতে এই উপন্যাসের চলচ্চিত্র রূপ দিতে চাইলেন। ববিতাকে প্রধান নায়িকা চরিত্রে রেখে 'লেট দেয়ার বি লাইট' সিনেমার কাজও শুরু করেছিলেন। কিন্তু ১ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধুর ডাকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু এবং ২৫ মার্চ গণহত্যার মধ্যদিয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জহির রায়হান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। বন্ধ হয়ে যায় সিনেমার স্যুটিং। ১৬ ডিসেম্বর বাঙালিরা নতুন একটি দেশ পেল। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে স্বদেশে ফিরলেন জহির রায়হান। কিন্তু ৩০ জানুয়ারি বড়ো ভাই শহীদুল্লাহ্ কায়সারের নিখোঁজ সংবাদ পেয়ে বিহারি নিয়ন্ত্রিত মিরপুরে যাওয়ার পর থেকেই তিনি নিখোঁজ হন। এভাবেই নিভে যায় লেট দেয়ার বি লাইট।

 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
 নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers