মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ , ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৮

সাহিত্য

সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক : বহুমাত্রিক এক স্রষ্টা

সাজিদুল হক ২৭ সেপ্টেম্বর , ২০২৫, ১৫:০৬:৪০

475
  • সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক : বহুমাত্রিক এক স্রষ্টা

আমৃত্যু শিল্প ও সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত থাকা খুব সহজ ব্যাপার নয়। তাও আবার নিবিষ্টতার সাথে। কেবল একটি মাধ্যমে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন এমন নয়। সৃজনশীলতা ও মননশীলতার সবগুলো বিভাগে সাফল্যের সাথে অনন্য ভূমিকা রেখে নিজেকে সব্যসাচী লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন তিনি।

তিনি কালের যাত্রার ধ্বনি নিজে শুনেছেন এবং আমাদেরকেও শুনিয়েছেন।

আমি সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের কথা বলছি। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, গান, নাটক, কাব্যনাট্য, অনুবাদ কর্ম, চিত্রকলা, চলচ্চিত্র - এই যে বহুমাত্রিক সৃজন কর্মে নিজেকে যুক্ত করতে পারা, বাংলা সাহিত্যে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।

যে মাধ্যমেই তিনি হাত দিয়েছেন, সেক্ষেত্রে সাফল্য দেখিয়েছেন।

পঞ্চাশের দশক বাঙালির শিল্প ও সাহিত্যে কবি-লেখকদের জন্য ছিলো অগ্নিগর্ভ সময়। ইংরেজ উপনিবেশ থেকে নতুন দুটো রাষ্ট্র হলো সবে। ভারত এবং পাকিস্তান। অনেক রক্তপাত, মাতৃভূমি ছেড়ে চলে আসা এবং নতুন এক পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, আত্মবিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করার মতো ব্যাপার। সাধারণ মানুষতো বটে, লেখক-শিল্পীদের ক্ষেত্রেও তা ছিলো ভীষণ কঠিন এক কাজ। অভ্যন্তরীণ বহুমুখী বিবাদ, সামাজিক ও সংস্কৃতির সংকট এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পালাবদলে লেখকদের পরিচয় কি হবে, সমঝোতা নাকি লড়াই, এসব  নানাবিধ প্রশ্ন হাজির হয় লেখকদের সামনে। যার জবাব দিতে গিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশের পটভূমিও তৈরি হয়। বস্তুত তাকে কেন্দ্রে রেখেই সদ্য ভাগ হওয়া পাকিস্তানের একটি অংশ, পূর্ব পাকিস্তানের লেখকগণ নিজেদের আলাদা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়।

বিশ্বরাজনীতিতেও ঘটে তখন বড়ো একটা ঘটনা অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। কলোনীয়াল রাষ্ট্রগুলোতে বিকাশ হতে শুরু করে জাতীয়তাবাদের মতো প্রপঞ্চ। সবাই বেরিয়ে আসতে চায় উপনিবেশ ভেঙে। এই জাতীয়তাবোধ পূর্ব পাকিস্তানি বাঙালির মধ্যেও জাগ্রত হয় ধীরে ধীরে। সৈয়দ শামসুল হক সেই চিন্তামানসের অগ্রগামীদের  একজন। পশ্চিমবঙ্গের রেঁনেসা নিয়ন্ত্রিত, বাঙালি বাবুদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি তাড়িত বোধ থেকে আলাদা হয়ে সম্পূর্ণভাবে নিজের পরিচয় তুলে ধরতে চাওয়া বাঙালি মুসলমানদের একজন সৈয়দ শামসুল হক। কিন্তু এই মুসলমান লেখক সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানের স্পিরিট ধারণ করতে পারলো না। কেন পারেনি, তা-ও জরুরি।

ভারত উপমহাদেশের দ্বিধা বিভক্তির পরে পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষীদের অঞ্চল শাসিত হয়েছে উপনিবেশ হিসেবে। একই ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে একটি সাংস্কৃতিক উপনিবেশ করার মতলব আঁটে আটচল্লিশ সালেই। ভাষা হয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের উপায়। উদারচিন্তার বিপরীতে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান সরকারের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে হটকারিতা স্বাধীন তরুণ লেখকদের স্বপ্নকে বাধাগ্রস্ত করে। লেখালেখির শুরু পর্বে প্রতিবাদী মানস সন্তান সৈয়দ শামসুল হকের চিন্তায় পশ্চিমা আধুনিকতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রভাব ফেলে। এলিয়ট, বোদলেয়ারের সাহিত্যিক জীবন ও কর্ম তার লেখক হিসেবে দাঁড় করাতে প্রেরণা জোগায়। সুদীর্ঘ একাশি বছরের বেঁচে থাকার জীবনে, সব্যসাচীর সমস্ত সৃজনকর্মে "মানুষ" ছিলো মুখ্য বিবেচনা এবং প্রাসঙ্গিক। এদিক থেকে তার সমসাময়িক কবি-সাহিত্যিকদের যে চিন্তার আলোকে নতুন ভাবনার অন্বেষণ, তিনিও তাদের সঙ্গে সমান তালে পা ফেলে চলেন চিন্তার অভিন্নতায়।

সৈয়দ শামসুল হক যেভাবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের উত্তরাধিকারী হতে অস্বীকৃতি জানাননি, তেমনি শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরীদের কমরেড ভাবতে দ্বিধাবোধ করেননি কখনো। সেই বিউটিবোর্ডের আড্ডার সারথিদের একজন হিসেবে যে সম্পর্ক, তাকেই সম্পর্কোন্নয়নের মাধ্যমে বারবার পুনরুজ্জীবিত রেখেছেন। এই যে বহুমাত্রিক ভাবনায় তিনি আজ পর্যন্ত বেঁচে আছেন, তার শিকড় অনেক গভীরে। আগেই বলেছি, বহুপ্রজ জীবন-দর্শক এই লেখক বছরের পর বছর, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চিন্তাকে কাগজে মুদ্রিত করে রেখে গেছেন।

সৈয়দ শামসুল হক ষাটের দশকে বাংলা চলচ্চিত্রে উদ্ধারকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হোন। চলচ্চিত্রের কাহিনি লেখক হিসেবে চিত্রনাট্য লিখিয়ে এবং গীতিকবি শামসুল হক সিনেমার একটি অনিবার্য নাম হয়ে উঠে। তার এই ভূমিকা সিনেমার দুর্দিনে লাইটহাউজের পথ দেখিয়েছে।

একইভাবে কাব্য নাটকে তার শক্তিমান উপস্থিতি স্মার্ট এবং ঈর্ষনীয়। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, নুরুলদীনের সারা জীবনের মতো দিকনির্দেশনামূলক কাব্যনাটক লিখেছেন জাতীয়বোধ থেকে।

আমরা যদি কবিতার কথা বলি, বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে তিনি প্রতিভাবান কবি হিসেবে প্রতিধ্বনিত হবেন।

কবিতায় অনেক নিরীক্ষাপ্রবণ, উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। যার কবিতা বহুস্তরীয় ভাবনায় বিস্তার ঘটিয়ে বাংলা কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছে।

একদা এক রাজ্যে, বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা, বিরতিহীন উৎসব, পরানের গহীন ভিতর, নুন-পূর্ণিমার মতো কাব্য উপহার দিয়েছেন।

নাগরিক সমাজের অসঙ্গতি, অন্ত:ক্ষরণ কবিতায় তুলে এনেছেন, গ্রামীণ জনপদের আখ্যান, মিথ নির্ভর জীবনের লক্ষ্মণ ফুটিয়ে তুলেছেন সহজ সাবলীলভাবে। প্রতিটি কাব্যের অন্তর্গত অভিঘাত পরিস্ফুট হয়েছে স্বতন্ত্র অবলোকন থেকে। একই স্রষ্টা, কিন্তু অন্য দিগন্তে দাঁড়িয়ে ভিন্ন বয়ান যেন পাঠকের পরানের গহীন ভিতরে ভাঙচুর করে সবকিছু। জীবনাভিজ্ঞতায় নির্মাণ করে ইতিহাসের অন্ত:পুর। যেখানে বিবদমান মানুষের অদ্ভুত সম্পর্কের রসায়নের ফলে শত্রুর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। হত্যাকারীও ক্ষমা পায়। সৈয়দ হকের কবিতায় ধারাবাহিক জিজ্ঞাসায় পাওয়া যায় জবাব। রাজনীতি যখন সাম্প্রদায়িক বিভাজনের খেলায় হাতিয়ার হয়, হক তখন লিখেছেন বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা। দুর্বৃত্তায়নের চিত্রকল্প এসেছে রাষ্ট্রের অন্তর্গত নেতৃত্বের চেতনালোক থেকে।

কবিতার ভাববলয় এবং নতুন জগৎ অল্পসময়ে তৈরি সম্ভব নয়। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সমাজ পরম্পরায় রক্ষণশীলতাকে হটিয়ে নতুন কাব্য দর্শন রচনা করে। সৈয়দ শামসুল হকের সৃষ্টিবিশ্ব সেই ভাবাদর্শ থেকে উৎসারিত।

বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা এবং পরানের গহীন ভিতর এই দুই কাব্যজগৎ পরিভ্রমণ করে আমরা ভাষা ও সময় নির্মাণে পাই স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা যেমন ব্যক্তিগত, তেমনি দু:খের অববাহিকায় জন্ম নেয়া একটি রাষ্ট্রের প্রসব বেদনাও।

তার কবিতার শিল্প ও সৌন্দর্য মুগ্ধতার চিত্রভাষ্য। কল্পনা এবং সৃজনের বারিধারায় নির্মিত হয় জাদুবস্তবতা। যে শিকড় দৃশ্যের অন্তরালে, তাকে অন্বেষণই হকের কবিতার মৌলিক সত্য।

 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
 নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers