বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৬ ফাল্গুন ১৪৩২ , ১ রমজান ১৪৪৭

সাহিত্য

সুকান্তের ‘জাগবার দিন আজ’: বৈশ্বিক সংকটের নন্দনতত্ত্ব ও সামষ্টিক মুক্তির ইশতেহার

বাহাউদ্দিন গোলাপ ২৯ জানুয়ারি , ২০২৬, ১৪:৪৪:৪২

418
  • সুকান্তের ‘জাগবার দিন আজ’: বৈশ্বিক সংকটের নন্দনতত্ত্ব ও সামষ্টিক মুক্তির ইশতেহার

নিচে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই কালজয়ী ইশতেহারটি পুনর্পাঠ করা হলো, যার অগ্নিগর্ভ পঙ্ক্তিমালাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে আমাদের এই তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ ও নান্দনিক অন্বেষণ:

 

জাগবার দিন আজ

সুকান্ত ভট্টাচার্য

জাগবার দিন আজ, দুর্দিন চুপি চুপি আসছে;

যাদের চোখেতে আজও স্বপ্নের ছায়া ছবি ভাসছে –

তাদেরই যে দুর্দিন পরিণামে আরো বেশী জানবে,

মৃত্যুর সঙ্গীন তাদেরই বুকেতে শেল হানবে।

 

আজকের দিন নয় কাব্যের –

আজকের সব কথা পরিণাম আর সম্ভাব্যর;

শরতের অবকাশে শোনা যায় আকাশের বাঁশরী,

কিন্তু বাঁশরী বৃথা, জমবে না আজ কোনো আসর-ই।

আকাশের প্রান্তে যে মৃত্যুর কালো পাখা বিস্তার –

মৃত্যু ঘরের কোণে, আজ আর নেই জেনো নিস্তার,

মৃত্যুর কথা আজ ভাবতেও পাও বুঝি কষ্ট

আজকের এই কথা জানি লাগবেই অস্পষ্ট।

তুবও তোমার চাই চেতনা,

চেতনার থাকলে আজ দুর্দিন আশ্রয় পেত না,

আজকে রঙিন খেলা নিষ্ঠুর হাতে করো বর্জন,

আজকে যে প্রয়োজন প্রকৃত দেশপ্রেম অর্জন;

তাই এসো চেয়ে দেখি পৃথিবী

কোনখানে ভাঙ্গে আর কোনখানে গড়ে তার ভিত্তি

কোনখানে লাঞ্ছিত মানুষের প্রিয় ব্যক্তিত্ব,

কোনখানে দানবের ‘মরণ-যজ্ঞ’ চলে নিত্য ;

পণ করো, দৈত্যের অঙ্গে

হানবো বজ্রাঘাত, মিলবো সবাই এক সঙ্গে;

সংগ্রাম শুরু করো মুক্তির,

দিন নেই তর্ক ও যুক্তির।

আজকে শপথ করো সকলে

বাঁচাব আমার দেশ, যাবে না তা শত্রুর দখলে;

তাই আজ ফেলে দিয়ে তুলি আর লেখনী,

একতাবদ্ধ হও এখনি।।

 

সুকান্ত ভট্টাচার্যের কাব্যসত্তা মানেই এক অবিনাশী আগ্নেয়গিরি, যার প্রতিটি স্ফূলিঙ্গ শৃঙ্খল ভাঙার স্পর্ধিত গান গায়। বাংলা সাহিত্যের আকাশে এই ক্ষণজন্মা কিশোর কবি কেবল একজন পদ্যকার নন, বরং তিনি ছিলেন এক দূরদর্শী ‘ক্রাইসিস-ম্যানেজার’, যিনি মার্ক্সীয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে কবিতার ছন্দে রূপান্তরিত করেছিলেন। উপরোক্ত পঙ্ক্তিগুলোর গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, সুকান্ত এখানে নিছক ছন্দ মেলাননি, বরং তিনি আমাদের শিল্প-ভাবনায় এক আমূল পরিবর্তন (Epistemological Break) ঘটিয়েছেন। কবি যখন ঘোষণা করেন যে আজকের দিনটি কাব্যের নয়, তখন তিনি শিল্পকে অস্বীকার করেন না; বরং তিনি ‘বুর্জোয়া রোমান্টিকতা’ বা কেবল অলস নন্দনতত্ত্বের বেড়াজাল ভেঙে এক নতুন ‘বৈপ্লবিক রোমান্টিকতার’ অবতারণা করেন। তাঁর কাছে শরতের নীল আকাশ আর বাঁশরীর সুর তখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়, যখন দিগন্তজুড়ে শোষণের কালো পাখা বিস্তারের ছায়া দৃশ্যমান হয়। এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী তাণ্ডব, ১৯৪৩-এর কৃত্রিম মন্বন্তরের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সেই মহাপ্রলয়-পরবর্তী (Post-Apocalyptic) এক নারকীয় বাস্তবতা, যেখানে নন্দনতত্ত্বের চেয়ে নগ্ন অস্তিত্ব রক্ষাই ছিল মহত্তম শিল্প।

বিশ্বসাহিত্যের দর্পণে সুকান্তের এই অবস্থান পাবলো নেরুদার সেই বিখ্যাত বিবর্তনের সমান্তরাল। নেরুদা তাঁর ‘Spain in Our Hearts’ (১৯৩৭) কাব্যগ্রন্থে যেভাবে বিশুদ্ধ সৌন্দর্যচর্চাকে বিসর্জন দিয়ে বলেছিলেন— “আসুন এবং দেখুন রাজপথে শিশুদের রক্ত”, সুকান্তও ঠিক একইভাবে আকাশ-মাটির রোমান্টিকতাকে বিসর্জন দিয়েছেন বাস্তবতার রূঢ় জমিনে দাঁড়িয়ে। তাঁর এই অবস্থানটি দার্শনিক থিওডোর অ্যাডর্নোর সেই বিখ্যাত সংশয়— “হলোকস্টের মতো নৃশংসতার পর কবিতা লেখা কি বর্বরতা নয়?”— এর এক অমোঘ ও প্রামাণ্য উত্তর। সুকান্ত বুঝিয়েছিলেন, সংকটকালে কবিতা কেবল বিলাসিতা নয়, বরং তা হতে পারে প্রতিরোধের সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। শিল্পতাত্ত্বিক ওয়াল্টার বেঞ্জামিন যেভাবে শিল্পকে নিছক ড্রয়িংরুমের শৌখিনতা থেকে বের করে রাজনীতির ময়দানে এনে দাঁড় করানোর কথা বলেছিলেন, সুকান্ত ঠিক সেভাবেই তাঁর শব্দচয়নে কোমল ‘বাঁশরী’র বিপরীতে কঠোর ‘বজ্র’ ও ‘মরণ-যজ্ঞ’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করে এক ধরণের শব্দগত প্রতিরোধ (Sonic Resistance) তৈরি করেছেন। অনেকে হয়তো একে নিছক রাজনৈতিক স্লোগান বা শিল্পের মৃত্যু বলতে পারেন; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল শিল্পের পুনর্জন্ম—যেখানে শব্দ কেবল কল্পনা নয়, বরং সক্রিয় ক্রিয়ায় (Action) রূপান্তরিত হয়। সংকটের সময় স্লোগানই যখন মানুষের শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে, তখন সেটিই হয়ে ওঠে শ্রেষ্ঠ নন্দনতত্ত্ব।

কবিতাটির প্রবহমান ধারায় সুকান্ত এক ভয়াবহ পরিণামের চিত্র এঁকেছেন অত্যন্ত সতর্কবাণীর সঙ্গে। তিনি জানতেন, যারা আসন্ন বিপর্যয়কে উপেক্ষা করে অবাস্তব স্বপ্নের ছায়ায় বিভোর থাকে, নিয়তির নির্মম আঘাত তাদের বুকেই প্রথম এসে বিঁধবে। এখানে কবির চেতনা এক গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক দর্শনে সিক্ত, যেখানে তিনি ‘নির্লিপ্ততা’ ও ‘ফলস কনশাসনেস’ বা ভ্রান্ত চেতনাকেই দুর্দিনের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সুকান্তের এই আহ্বান পাওলো ফ্রেইরের ‘কনসেন্টিজেশন’ (Pedagogy of the Oppressed, ১৯৭০) বা শোষিতের সচেতনতা অর্জনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে তুলনীয়; যেখানে তিনি জাতিকে এক জড় অবস্থা থেকে সক্রিয় হওয়ার তাগিদ দেন। কবির মতে, প্রকৃত দেশপ্রেম কেবল ভৌগোলিক মানচিত্রের বন্দনা নয়, বরং গায়ত্রী স্পিভাক বর্ণিত সেই ‘সাবঅল্টার্ন’ বা প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা। সুকান্তের এই দর্শন হানা আরেন্ডট-এর ‘ব্যানালিটি অব ইভিল’-এর বিরুদ্ধে এক বৌদ্ধিক ঢাল; যেখানে মানুষের নীরবতা আসলে অন্যায়েরই মৌন সমর্থনে পরিণত হয়। টি.এস. এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এ আমরা যে আধুনিক সভ্যতার শূন্যতা ও বিচ্ছিন্নতা দেখি, সুকান্ত সেই একই ‘বন্ধ্যা সময়’-কে প্রত্যক্ষ করেছেন; তবে এলিয়টের মতো তিনি কেবল হতাশায় থেমে থাকেননি। বরং তিনি কবি নাজিম হিকমতের মতো সামষ্টিক মুক্তির গান গেয়েছেন, যেখানে ব্যক্তিগত ‘আমি’ বৃহত্তর ‘আমরা’-তে লীন হয়ে যায়।

বর্তমান বিশ্বের ‘পলি-ক্রাইসিস’ বা বহুমুখী সংকটের যুগে সুকান্তের এই পঙ্ক্তিগুলো এক নতুন এবং সুগভীর প্রাসঙ্গিকতা লাভ করেছে। আজ যখন পৃথিবী গাজা থেকে ইউক্রেন—নিষ্পাপ রক্তে মাটি লাল হতে দেখছে, তখন কবির "মরণ-যজ্ঞের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বজ্রাঘাত" আজ এক অনিবার্য বৈশ্বিক সংহতির ডাক। আধুনিক মানুষ যখন অ্যালগরিদমিক আইসোলেশন (Algorithmic Isolation) বা ডিজিটাল প্যানোপটিকনের চাকচিক্যময় ‘স্বপ্নের ছায়া ছবিতে’ বুঁদ হয়ে জলবায়ু বিপর্যয় বা নব্য-ফ্যাসিবাদী শোষণকে আড়াল করতে চায়, তখন ‘জাগবার দিন আজ’ আমাদের মেরুদণ্ডে বিদ্যুৎ সঞ্চার করে। এটি জঁ-পল সার্ত্রের ‘বিয়িং অ্যান্ড নাথিংনেস’ (১৯৪৩) দর্শনের মতোই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সংকটের সময়ে নিরপেক্ষ থাকা মানেই প্রকারান্তরে শোষকের পক্ষ অবলম্বন করা। সুকান্ত এখানে সময়কে কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় দেখেননি, বরং সময়কে দেখেছেন মার্টিন হাইডেগারের ‘বিয়িং অ্যান্ড টাইম’ দর্শনের মতো এমন এক অস্তিত্ববাদী সন্ধিক্ষণ হিসেবে, যেখানে মানুষের সার্থকতা তার নিষ্ক্রিয়তায় নয়, বরং সক্রিয় জাগরণ ও ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে। সুকান্তের মার্ক্সবাদী শিকড় এখানে অস্তিত্ববাদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক একাকীত্বকে ছাপিয়ে সামষ্টিক শ্রেণির জাগরণকে এক পরম সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

এটি স্পষ্ট যে, সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁর এই ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে এক শাশ্বত ধ্রুব সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যা কাল থেকে কালান্তরে বিস্তৃত। এই কবিতাটি আমাদের শেখায় যে মুক্তি কেবল কোনো একক অতিমানবের বীরত্বে আসে না, বরং তা আসে সাধারণ মানুষের সম্মিলিত ও সচেতন জাগরণে। অনেকে হয়তো মনে করতে পারেন বর্তমানের এই অতি-ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভোগবাদী সমাজে সুকান্তের ‘যৌথ জাগরণ’ এক রোমান্টিক ইউটোপিয়া; কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায় এই গণমুখী সচেতনতাই ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

সুকান্তের কাব্যিক হুঙ্কার আমাদের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর সাহস জোগায় এবং মনে করিয়ে দেয়—যতক্ষণ মানুষ নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ আর অলস স্বপ্নবিলাস ত্যাগ করে কাঁধে কাঁধ মেলাতে না শিখছে, ততক্ষণ স্বাধীনতার প্রকৃত সূর্য কেবল কুয়াশাবৃত এক বিভ্রম হয়েই থেকে যাবে। আজকের এই জটিল বিশ্বব্যবস্থায় মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সুকান্তীয় ‘জাগরণ’-ই হলো একমাত্র ধ্রুব ও চূড়ান্ত পথ।

লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী।   

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন