রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩ , ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

সাহিত্য

হুমায়ুন আজাদ, এক ফোঁটা সৌন্দর্যের অন্বেষায়

মাঈনুদ্দীন দুলাল ২৮ এপ্রিল , ২০২৬, ১৭:০১:১৬

462
  • হুমায়ুন আজাদ, এক ফোঁটা সৌন্দর্যের অন্বেষায়

“প্রথা বিরোধী, স্বনির্মিত, স্বাধীনচেতা লেখক ও চিন্তক হুমায়ুন আজাদের আজ (২৮ এপ্রিল ) জন্মদিন। তার মুক্ত চিন্তাই ছিল আততায়ীদের ক্ষোভ। শ্রদ্ধা আমাদের বিবেকের এই সলতের জন্যে।”

তাকে বলা হয় ঠৌঁট কাটা লোক। বলা হয় প্রথা বিরোধী লেখক, বক্তা ও চিন্তক। বুদ্ধিজীবী শব্দটি ব্যবহার করলাম না। কারণ তিনি এই অভিধায় পরিচিত হতে রাজি ছিলেন না। বরং আমাদের দলকানা, সুবিধাবাদী, ক্ষমতার পদলেহনকারী কথিত বুদ্ধিজীবীদের তিনি ছিলেন কট্টর সমালোচক। এ কারণে তিনি বলতে গেলে একাই ছিলেন। ছিলেন আগাছা ভরা জঙ্গলে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো শাল-প্রাংশু। লেখক-শিক্ষক হুমায়ুন আজাদের কথাই বলছিলাম ।

বাংলা সাহিত্যের উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, সমালোচনা, ভাষা বিজ্ঞান, প্রবচন, কিশোর সাহিত্যসহ প্রায় সব বিষয়ে তার ছিল উজ্জ্বল ও দাগকাটা পদচারণা। এ সব বিষয়ে প্রায় ৬০টি গ্রন্থ তার ভাণ্ডারে জমা।

আল্লামা ইকবালের বিখ্যাত একটি উক্তি রয়েছে। ইকাবাল বলেন, “কবিত্ব নবুয়তির অংশ”। নবীরা আলোকবর্তিকা হাতে  ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা। বা জাতিশ্বর। হুমায়ুন আজাদের একটি কবিতার অংশ যদি উল্লেখ করি তবে ইকবালের এই কথাটা উপলব্ধি হবে।

“আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।

নষ্টদের দানবমুঠোতে ধরা পড়বে মানবিক

সব সংঘ-পরিষদ; চলে যাবে, অত্যন্ত উল্লাসে

চ’লে যাবে এই সমাজ-সভ্যতা-সমস্ত দলিল

নষ্টদের অধিকারে ধুয়েমুছে, যে-রকম রাষ্ট্র

আর রাষ্ট্রযন্ত্র দিকে দিকে চলে গেছে নষ্টদের অধিকারে।”

আজকে এই রাষ্ট্র ও মানুষের চরিত্রের দিকে তাকালে বুঝতে ও উপলব্ধি করতে পারি আজাদের দিব্য দৃষ্টি। তিনি বিতর্ক করতে বা তুলতে চাইতেন। যেমন দার্শনিক সক্রেটিস গ্রীসের হাটে-ঘাটে বিতর্ক উস্কে দিয়ে কায়েমী ক্ষমতাবান ও কথিত পণ্ডিতদের মুকুট নামিয়ে দিতেন। আজাদের গ্রন্থ ‘নারী’, ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’, ‘পাকসার জমিন সাদ বাদ’  আমাদের প্রতিষ্ঠিত যুক্তিহীন বিশ্বাস ও ভণ্ডামীকে উন্মোচন করে। এই বইগুলো জগদ্দল পাথরের বুকে হাতুড়ি পেটায়। শেষ পর্যন্ত এসব বই বাজেয়াপ্ত করা হয়। মৌলবাদ, ধর্মান্ধ, কায়েমী গোষ্ঠীর গায়ে ফুলকি ছিটায় তার বক্তব্য। আর এর মূল্যও দিতে হয় আজাদকে জীবন দিয়ে।

২০০৪ সালে অমর একুশে বইমেলায় হুমায়ুন আজাদের উপন্যাস ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ প্রকাশিত হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি রাত সোয়া ৯টার দিকে বইমেলা থেকে বের হয়ে বাংলা একাডেমি ও টিএসসির মাঝামাঝি পৌঁছালে জঙ্গিরা হুমায়ুন আজাদকে ঘেরাও করে। ব্যাগ থেকে চাপাতি-ছুরি বের করে হুমায়ুন আজাদের ঘাড়, মাথা, মুখ, গলা, হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে উপর্যুপরি আঘাত করে। এরপর হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে সাধারণ লোকজনের সঙ্গে মিশে যায়। সেই আঘাতের ফলেই জার্মানিতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

বহুমাত্রিক কাজ তার। ফলে আজাদ সম্পর্কে যেকোন বিষয়ে আলোচনা হবে দীর্ঘতর। আমরা তাকে শ্রদ্ধা জানাতে চেয়েছি তার জন্মদিনে। বিস্তৃত আলোচনার অবকাশ এই শ্রদ্ধার্ঘে নেই। আজাদকে যতটুকু পঠন বা উপলব্ধি আছে তাতে একথা খুব স্পষ্ট করে বলা যায় তিনি আলোর অন্বেষায় ব্যাপৃত ছিলেন আজীবন। বিক্রমপুরের জলজ-সবুজ ভুমিতে তার জন্ম বেড়ে ওঠা। এ মাটির সোঁদা গন্ধ, ফুলের সুবাস গায়ে মেখে তিনি ছিলেন এ মাটির এক স্বাপ্নিক প্রতিনিধি। দেশের শেকড়লগ্ন যুক্তিবাদী এক পরিব্রাজক।

তার এই স্বপ্নের সন্ধান তিনি এভাবেই দেন— “আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট  কিছুর জন্যে মারা যাবো

খুব ছোট একটি স্বপ্নের জন্যে

খুব ছোট দুঃখের জন্যে

আমি হয়তো মারা যাবো কারো ঘুমের ভেতরে

একটি ছোটো দীর্ঘশ্বাসের জন্যে

একফোঁটা সৌন্দর্যের জন্যে।”

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers