রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ২৪ সফর ১৪৪৮

সাহিত্য

হুমায়ূনের সৃষ্ট রহস্যময় চরিত্রগুলো

নিউজজি ডেস্ক ১৯ জুলাই , ২০২৬, ১৪:৪৭:৪৫

149
  • হুমায়ূন আহমেদ

ঢাকা: শিল্পের প্রতিটি শাখাতেই স্রষ্টারা তাদের কল্পনা ও ভাবনার মাধ্যমে কিছু অনন্য চরিত্র সৃষ্টি করেন। সময়ের সঙ্গে সেই চরিত্রগুলো মানুষের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে, তাদের প্রভাবিত করে এবং অনেক সময় সাধারণ মানুষ সেসব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য অনুসরণও করেন।

বিশ্ব সাহিত্যের মতো বাংলা সাহিত্য ও নাটকেও এমন কিছু কালজয়ী চরিত্র সৃষ্টি হয়েছে, যেগুলো পাঠক ও দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। জনপ্রিয়তার দিক থেকে এসব চরিত্র মানুষের হৃদয়ে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে।

বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তার গল্প, উপন্যাস ও নাটকের মাধ্যমে এমন অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। তার সৃষ্ট এসব চরিত্র আজও মানুষের ভাবনা, অনুভূতি ও স্মৃতিতে নানাভাবে জীবন্ত হয়ে আছে।

হিমু

প্রচণ্ড গরমের মধ্যে নিউ মার্কেট এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। চারদিকে হরতালের উত্তেজনা, আর সে অপেক্ষা করছে কখন কোনো বাসে আগুন জ্বলবে, সেই আগুনে সিগারেট ধরাবে। ‘হিমুর হাতে কয়েকটি নীল পদ্ম’ বইয়ে বর্ণিত এই অদ্ভুত ঘটনাটির কেন্দ্রীয় চরিত্রই হিমু।

হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট জনপ্রিয় চরিত্রগুলোর মধ্যে হিমু অন্যতম। খালি পায়ে, পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবি পরে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো এই চরিত্রটি প্রচলিত নিয়ম ও যুক্তির বাইরে চলতে ভালোবাসে। তার বিচিত্র আচরণ ও অদ্ভুত কর্মকাণ্ড প্রায়ই আশপাশের মানুষকে বিস্মিত করে তোলে।

মানুষকে চমকে দেওয়া যেন হিমুর স্বভাবেরই অংশ। অনেক সময় তার কর্মকাণ্ডে মানুষ বিরক্ত বা ক্ষুব্ধ হলেও শেষ পর্যন্ত তার সরলতা ও আলাদা ব্যক্তিত্বের কারণে সবাই তার প্রতি এক ধরনের ভালোবাসা অনুভব করে।

মিসির আলি

মোটা ফ্রেমের ভারী চশমা পরা মিসির আলি কোনো অতিপ্রাকৃত ঘটনায় বিশ্বাস করেন না। যত রহস্যময় ঘটনাই সামনে আসুক না কেন, তিনি সবকিছুর ব্যাখ্যা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন যুক্তি ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে। হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট এই যুক্তিবাদী চরিত্রটির নাম ‘মিসির আলি’।

হিমুর সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর চরিত্র মিসির আলি। হিমু যেখানে প্রচলিত যুক্তি ও নিয়মের বাইরে চলতে পছন্দ করে, সেখানে মিসির আলি প্রতিটি বিষয়কে যুক্তির ভিত্তিতে বিচার করেন। মানুষের মন, আচরণ, স্বপ্ন ও মানসিক সংকট বিশ্লেষণ করে তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুঁজে বের করাই তার মূল বৈশিষ্ট্য।

হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে মিসির আলি ছিল লেখকের অন্যতম প্রিয়। অগোছালো ও রহস্যময় হিমুর বিপরীতে মিসির আলি প্রতিনিধিত্ব করেন যুক্তি, বিশ্লেষণ ও বাস্তবতার।

শুভ্র

হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে ‘শুভ্র’ অন্যতম আলোচিত ও জনপ্রিয়। তার নামের মতোই এই চরিত্রটি পবিত্রতা, সরলতা ও শুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

শুভ্র নিজেকে জীবনের জটিলতা ও পার্থিব ঝামেলা থেকে দূরে রাখতে চায়। দৈনন্দিন সমস্যার হিসাব-নিকাশে না জড়িয়ে সে নিজের মতো করে থাকতে পছন্দ করে। মোটা ফ্রেমের চশমা পরে বইয়ের জগতে ডুবে থাকাই যেন তার স্বাভাবিক জীবনযাপন।

বাবার বিপুল সম্পদ বা বস্তুগত প্রাপ্তির প্রতি শুভ্রর কোনো আগ্রহ নেই। বরং সৌন্দর্য, সরলতা ও নির্মলতার মধ্যেই সে জীবনের সত্যিকারের আনন্দ খুঁজে পায়। এ কারণেই শুভ্র হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট এক ব্যতিক্রমী ও স্মরণীয় চরিত্র হয়ে উঠেছে।

বাকের ভাই

কোনো গল্প, উপন্যাস বা নাটকের কাল্পনিক চরিত্র বাস্তব জীবনে এভাবে মানুষের আবেগের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। হুমায়ূন আহমেদ তার সৃষ্টি ‘বাকের ভাই’ চরিত্রের মাধ্যমে বাংলা নাট্যজগতে এমনই এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিলেন।

হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় উপন্যাস ‘কোথাও কেউ নেই’ অবলম্বনে নির্মিত টেলিভিশন নাটকে ‘বাকের ভাই’ চরিত্রে অভিনয় করেন আসাদুজ্জামান নূর। নাটকে পাড়ার এক প্রভাবশালী যুবককে মিথ্যা মামলায় ফাঁসির সাজা দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসেন অসংখ্য দর্শক, শুরু হয় মিছিল, সমাবেশ ও বিক্ষোভ।

দর্শকদের আবেগ এতটাই তীব্র ছিল যে, অনেকেই ‘বাকের ভাই’র ফাঁসি বন্ধের দাবি জানান। নাটকের কাহিনি পরিবর্তনের অনুরোধও উঠেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত নাট্যকার গল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ফাঁসির দৃশ্যই বহাল রাখেন।

বাকের ভাইয়ের মৃত্যুর দৃশ্যে কেঁদেছিলেন অসংখ্য দর্শক। এমনকি প্রিয় চরিত্রের পরিণতিতে অনেকেই নাট্যকারের প্রতি ক্ষোভ ও অভিমান প্রকাশ করেছিলেন। বাংলা নাটকের ইতিহাসে ‘বাকের ভাই’ তাই আজও এক বিস্ময়কর ও স্মরণীয় চরিত্র হিসেবে জায়গা করে আছে।

রুপা

হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট আরেকটি স্মরণীয় চরিত্র ‘রুপা’। হিমুর মতো এক উদাসীন ও বাউন্ডুলে মানুষের প্রেমে পড়েছে এই রূপবতী তরুণী। হিমুর জন্য তার অপেক্ষার যেন কোনো শেষ নেই। সবসময় সে তাকিয়ে থাকে হিমুর ফিরে আসার পথের দিকে।

হিমু যখন ফোন করে বলে, ‘রুপা, আমি আসছি’, তখন তার অপেক্ষা আরও গভীর হয়ে ওঠে। হিমুর পছন্দের আকাশি রঙের শাড়ি পরে, চোখে কাজল দিয়ে ছাদ কিংবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে রুপা। কিন্তু প্রতিবারের মতো হিমু হয়তো আর আসে না।

রুপা জানে, হিমুর আসার সম্ভাবনা খুব কম, তবুও তার অপেক্ষা থামে না। অসম্ভব মায়া, ভালোবাসা আর না-পাওয়ার বেদনা নিয়ে সে দাঁড়িয়ে থাকে হিমুর পথ চেয়ে। অপূর্ণ এক প্রেমের প্রতীক হয়ে বাংলা সাহিত্যে রুপা আজও পাঠকের মনে জায়গা করে আছে।

 

 

নিউজজি/এস আর

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers