রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ২৪ সফর ১৪৪৮

সাহিত্য

রবীন্দ্র স্মরণ, রবীন্দ্র শরণ

বাহাউদ্দিন গোলাপ ৬ আগস্ট , ২০২৬, ১৬:৩৫:৫৫

369
  • রবীন্দ্র স্মরণ, রবীন্দ্র শরণ

"আমাদের মনন জগৎ নির্মাণে প্রধানতম কারিগর রবীন্দ্রনাথ। সকল অনুভব ও উপলব্ধির নিখুঁত কথক এবং সুত্রধর। আজ তার প্রয়াণ দিবস। শ্রদ্ধাঞ্জলি।"

২২ শ্রাবণের পঞ্জিকাতে কেবল এক বৃষ্টিভেজা বিষাদের রূপরেখা খোঁজা একধরনের রবীন্দ্র-বিচ্ছিন্নতা। ১৯৪১ সালের এই দিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শারীরিক তিরোধান ঘটেছিল সত্য, কিন্তু বঙ্গীয় জনমানসে তা কোনো রাজনৈতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা তৈরি করেনি। বরং তিনি বাংলা ভাষাকে দিয়ে গেছেন এমন এক প্রজ্ঞাময় ও দার্শনিক ভিত্তি, যা আমাদের প্রাত্যহিক সামাজিক ও বৈচারিক ভাঙাগড়াতেও অবিকল থাকে। আজকের নাগরিক আচ্ছন্নতা ও মননশীলতার স্থবিরতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের বারবার রবীন্দ্রনাথের শরণাপন্ন হতে হয়—কোনো ভাবালু অতীতমুখিতার টানে নয়, বরং নিজের অস্তিত্ব ও নৈতিক অবস্থানকে মেপে নেওয়ার প্রয়োজনে।

জোড়াসাঁকোর মুক্তচিন্তার আবহ থেকে বেড়ে উঠলেও রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিজীবন ছিল নিরন্তর স্বজন হারানোর এক করুণ ইতিহাস। একের পর এক প্রিয়জনের আকস্মিক প্রস্থান তাঁর আত্মিক জীবনকে ক্ষতবিক্ষত করেছিল। তবে এই গভীর যন্ত্রণা তাঁকে নিরাশায় বিলীন করেনি; বেদনার গাঢ় অন্ধকারকে তিনি রূপান্তরিত করেছিলেন সাহিত্যের নিবিড় প্রশান্তিতে। মৃত্যুকে তিনি ক্ষয়ের ট্র্যাজেডি হিসেবে না দেখে বিবেচনা করেছিলেন জীবনেরই এক নবতর রূপান্তর হিসেবে। ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার অর্জনের ঘটনাটি কেবল এক কবির ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল না, তা ছিল বিশ্বমঞ্চে বাংলা ভাষার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞান।

কলকাতা শহরের সীমানা পেরিয়ে শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরে জমিদারি তদারকির সূত্রে কাটানো দিনগুলো তাঁর শিল্পদৃষ্টিকে মূলগতভাবে বদলে দিয়েছিল। ‘পদ্মা’ বোটে ভেসে চলা নদী-জীবন এবং পূর্ববঙ্গের প্রকৃতির মাঝে তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন সাধারণ মেহনতি মানুষের প্রাত্যহিক রূপ। ইউরোপীয় ছোটগল্পের অনুকরণ না করে বাংলা মাটির নিজস্ব ঘ্রাণ ও জীবনের অনিশ্চয়তাকে সম্বল করে তিনি গড়ে তুলেছিলেন বাংলা ছোটগল্পের স্বতন্ত্র নন্দনতত্ত্ব। শিলাইদহে অবস্থানকালেই বাউল দর্শনের সাথে তাঁর নিবিড় পরিচয় ঘটে, যা তাঁর অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী ভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। অন্যদিকে প্রথাগত সাধুভাষার দেয়াল ভেঙে চলিত ভাষাকে সাহিত্যের প্রধান বাহন করার নেপথ্যে তাঁর অবদান ছিল ঐতিহাসিক।

‘স্ত্রী-র পত্র’-এর মৃণাল যখন গৃহকোণের সীমানা পেরিয়ে নিজের স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা করে, তখন মূলত আধুনিক বঙ্গীয় নারীমনস্তত্ত্বের এক অচেনা দিগন্ত উন্মোচিত হয়। ইউরোপে সিগমন্ড ফ্রয়েড যখন মানব মনস্তত্ত্বের অবচেতন পরত উন্মোচন করছেন, রবীন্দ্রনাথ প্রায় সমকালেই উপন্যাসে মানুষের অবচেতন আকাঙ্ক্ষা ও আত্মিক দ্বন্দ্বকে সমান গভীরতায় রূপ দিয়েছিলেন। সাহিত্য ছাড়িয়ে শিল্পকলার অন্যান্য মাধ্যমেও তিনি ছিলেন সমান প্রথাবিরোধী। ‘রক্তকরবী’ নাটকে যান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে মানবিক প্রাণের জয়গান কিংবা জীবনের শেষ দশকে আঁকা তাঁর আড়াই হাজার চিত্রকর্ম ছিল মানুষেরই অবচেতন মনস্তত্ত্বের নান্দনিক প্রকাশ। একই সাথে তাঁর সংগীতচেতনা সুর ও শব্দের সমন্বয়ে মানবীয় অনুভূতির এক অনবদ্য দিগন্ত খুলে দিয়েছিল।

"যত্র বিশ্বং ভবত্যেক নীড়ম্"(যেখানে সমগ্র বিশ্ব এসে এক নীড়ে পরিণত হয়)—এই মহাজাগতিক বাণী কেবল এক প্রতিষ্ঠানের মূলমন্ত্র ছিল না, ছিল রবীন্দ্রনাথের আন্তর্জাতিকতাবাদী দর্শনের নির্যাস। একাধিক বার ইউরোপ সফরে তিনি পশ্চিমের প্রযুক্তিভিত্তিক বৈজ্ঞানিক বিকাশকে শ্রদ্ধা জানালেও তাদের আত্মাহীন যান্ত্রিকতার স্পষ্ট বিরোধিতা করেন। প্রাচ্যের আত্মিক মানবিকতার সাথে পাশ্চাত্যের বস্তুভিত্তিক বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটাতেই শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বিশ্বভারতী’। আবার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইটের খাঁচাসম বন্দীত্ব থেকে শিশুদের মুক্ত করতে তিনি রূপ দিয়েছিলেন এক বিকল্প ভাবনার; ‘সহজ পাঠ’ ও প্রকৃতিঘেরা মুক্ত শিক্ষার মাধ্যমে উপহার দিয়েছিলেন আধুনিক শিশুমনস্তত্ত্বের অনন্য রূপরেখা।

বিজ্ঞান ও দর্শনের মেলবন্ধনেও তিনি ছিলেন সমকালের চেয়ে অগ্রগামী। ১৯৩০ সালে আলবার্ট আইনস্টাইনের সাথে ঐতিহাসিক সংলাপে পদার্থবিদ্যার নিরপেক্ষ সত্যের বিপরীতে রবীন্দ্রনাথ তুলে ধরেছিলেন 'Human Universe' বা মনুষ্যকেন্দ্রিক সত্যের ধারণা। প্রকৃতিকে এক জীবন্ত সত্তা হিসেবে বরণ করে নিতে ১৯২৮ সালে সূচিত ‘বৃক্ষরোপণ’ ও ‘হলকর্ষণ’ উৎসব ছিল সেই দর্শনেরই ব্যবহারিক প্রকাশ।

রাজনৈতিক সংঘাত বা সাময়িক উন্মাদনায় রবীন্দ্রনাথ কখনোই অন্ধ উগ্রতার পক্ষে যাননি। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংসতার প্রতিবাদে ‘নাইটহুড’ উপাধি ত্যাগ করার নেপথ্যে ছিল এক অটল নৈতিক অবস্থান। জীবনের শেষ প্রহরে লেখা ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে সাম্রাজ্যবাদের পতন প্রত্যক্ষ করেও তিনি উচ্চারণ করেছিলেন—“মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ।” অন্যদিকে পতিসরে কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ও শ্রীনিকেতনে পল্লী পুনর্গঠনের প্রয়োগ প্রমাণ করে, তিনি কেবল ভাবুক ছিলেন না, ছিলেন স্বাবলম্বী গ্রামীণ অর্থনীতির দূরদর্শী কারিগর।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের তৈরি কোনো উত্তর সরবরাহ করেন না; বরং বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতার মুহূর্তে কীভাবে সঠিক প্রশ্ন তুলে দাঁড়াতে হয়, সেই প্রজ্ঞা শেখান। বাইশে শ্রাবণে তাঁর শরণাপন্ন হওয়া তাই কোনো প্রথাগত স্মৃতিতর্পণ নয়, নিজের অস্তিত্বকে নতুন করে চেনার এক প্রাত্যহিক সামাজিক দায়।

 

(লেখক: সংগঠক, গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী।  সভাপতি, ৭১'র চেতনা)

 

 

নিউজজি/এস আর

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers