শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ , ১৪ জুমাদাউস সানি ১৪৪৭

সাহিত্য
  >
প্রবন্ধ

শিল্পের আলোয় জাতিসত্তার বিবেক: শামসুর রাহমানের মহাকাব্যিক পথচলা

বাহাউদ্দিন গোলাপ অক্টোবর ২৩, ২০২৫, ১৯:৩৭:৫১

631
  • শিল্পের আলোয় জাতিসত্তার বিবেক: শামসুর রাহমানের মহাকাব্যিক পথচলা

মহাকালের প্রেক্ষাপটে কবিতা কেবল কালির আঁচড় নয়—তা এক শাশ্বত জিজ্ঞাসা, যা মানব-অস্তিত্বের গভীরতম সঙ্কট ও আশাকে ধারণ করে। সেই অর্থে, শামসুর রাহমান (২৩ অক্টোবর ১৯২৯ – ১৭ আগস্ট ২০০৬) ছিলেন বাংলা সাহিত্যে কালের কণ্ঠস্বর ও বিবেকের প্রহরীর এক বিরল সমন্বয়। তিনি শুধু কবিতা লেখেননি, বরং নাগরিক জীবনের কোলাহলে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের অবিচল আত্মাকে তাঁর কাব্যে মুক্তি দিয়েছিলেন। তাঁর এই কাব্যিক দর্শনের মূল ভিত্তিটি ছিল এক দৃঢ় নৈতিক অবস্থান: “মানুষের প্রতি আস্থা হারানো পাপ, সে পাপে আজও পৃথিবী দগ্ধ।” এটি নিছক একটি উক্তি নয়; এটি তাঁর শিল্পের কেন্দ্রীয় আলো, যা সকল হতাশার মধ্যেও মানুষের সম্ভাবনাকে উদ্‌যাপন করে।

​ঢাকার মাহুতটুলির এক পুরোনো পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই কবি ক্রমশ নিজেকে রাজধানী ঢাকার জীবনীকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। পঞ্চাশের দশকে যখন বুদ্ধদেব বসু-পরবর্তী আধুনিকতার প্রবল ঢেউয়ে বাংলা কবিতা ছিল পশ্চিমের অস্তিত্ববাদী বিচ্ছিন্নতা ও নান্দনিক জটিলতা দ্বারা প্রভাবিত, তখন শামসুর রাহমানের আবির্ভাব ছিল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ (১৯৬০)-এ যেসকল ব্যক্তিগত বিষাদ ও আত্ম-অনুসন্ধান ছিল, তা সেই সময়েরই ছাপ বহন করে। তাঁর কাব্যে একদিকে যেমন নগরজীবনের ক্লান্তি ও একাকিত্ব ধরা পড়েছে, অন্যদিকে তেমনি তিনি এর মধ্যেই খুঁজেছেন মানবিক সম্পর্কের উষ্ণতা। এই ব্যক্তিগত বিষাদ, এক অর্থে তিরিশের দশকের প্রভাব বহন করলেও, খুব দ্রুত তিনি সেই নিসর্গ-নির্ভর রোমান্টিকতার মায়াজাল ত্যাগ করে নৈর্ব্যক্তিক নাগরিক বাস্তবতার দিকে যাত্রা করেন। এই কাব্যগ্রন্থটির নামই ছিল নতুন চেতনার এক সূক্ষ্ম বিকিরণ। কিন্তু এখানেই তাঁর স্বাতন্ত্র্য, কারণ এই বিচ্ছিন্নতা তিনি কেবল ব্যক্তিগত যন্ত্রণা হিসেবে ধারণ না করে, তা ক্রমশ দেশভাগের যন্ত্রণা ও নাগরিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা হিসেবে অনুভব করতে শুরু করেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের মহাজাগতিক অনুভূতি বা নজরুলের বিদ্রোহী আবেগকে সরাসরি অনুসরণ করেননি। তাঁর সমসাময়িক অন্য প্রধান কবি, যেমন আল মাহমুদ যখন লোকজ জীবনের চিত্রকল্প এবং ছান্দসিক দৃঢ়তার দিকে ঝুঁকছিলেন, তখন রাহমান ছিলেন নগরজীবনের অস্থিরতা ও রাজনীতির সরাসরি ভাষ্যকার। শহীদ কাদরী যখন তাঁর কবিতায় কঠিন আন্তর্জাতিকতাবাদের ছাপ ফেলছিলেন, রাহমান তখন তাঁর কবিতাকে নিয়ে এলেন এখানকার মানুষের মুখের ভাষার কাছাকাছি। দেশভাগের পর আত্মপরিচয়ের সংকটই তাঁর ভাষাকে ‘উপরের তলার’ কাঠিন্য থেকে মুক্তি দিতে উৎসাহিত করে। তাঁর কাছে কবি হওয়া গৌণ ছিল, আসল ছিল মানুষের দায়িত্ব পালন করা। তাই তিনি সরলভাবেই বলেছিলেন: “আমি মানুষ হতে চাই, কবি নই।” এই কথাটি প্রমাণ করে, তাঁর কাছে শিল্প ছিল মানুষের প্রতি এক পবিত্র অঙ্গীকার।

​শামসুর রাহমানের সবচেয়ে বড় অবদান হলো, তিনি কবিতাকে সহজ গদ্যের ভঙ্গিতে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। ছন্দের কঠিন বাঁধন না মেনেও তাঁর লেখায় এক ধরনের স্বাভাবিক ছন্দ তৈরি হয়েছে, যা মূলত বাঙালির কথ্য ভাষার সহজ গতি এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সংলাপের তীক্ষ্ণতা থেকে উৎসারিত। এই কৌশল তাঁর কবিতাকে ক্ষণস্থায়ী স্লোগান থেকে চিরকালীন শিল্পে পরিণত করেছে। তাঁর প্রতীকগুলোও এসেছে সাধারণ জীবন থেকে: ‘শার্ট’, ‘মিছিল’, ‘কফিন’, ‘অন্ধকার’—এগুলো তাঁর হাতে প্রতিবাদ ও জাগরণের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তাঁর বিশেষায়িত চিত্রকল্পের কারুকাজে, ‘আসাদের শার্ট’ কেবল একটি পোশাক না থেকে তাই ‘মুক্তির পতাকা’ হয়ে উঠল। ষাটের দশকের রাজনৈতিক উত্তালতায়, যখন আইয়ুব খানের সামরিক শাসন দেশের মানুষের কণ্ঠরোধ করতে চাইছিল, তখন ১৯৫৮ সালে লেখা তাঁর ‘হাতির শুঁড়’-এর মতো প্রতীকী কবিতা এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় রচিত ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি ছিল সাধারণ মানুষের সাহসের এক অমর দলিল।

​বস্তুত, এই কবি শুধু স্বাধীনতার জয়গান করেননি, তিনি ছিলেন স্বাধীনতার মূল্যবোধের শিল্পী। ১৯৭১ সালে অবরুদ্ধ থাকার সময় তিনি ‘মজলুম আদিব’ ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন। এই সময়েই ‘বন্দী শিবির থেকে’ কাব্যগ্রন্থের জন্ম, যা কেবল ঢাকা শহরের অবরুদ্ধ জীবনেরই কথা বলেনি, বরং পরাধীনতার এক নিদারুণ মানসিক বন্দিত্বকেও প্রকাশ করেছে। তিনি লেখেন: “স্বাধীনতা শব্দটি কেমন যেন বাজে কানে—/ কত রক্ত, কত চোখের জল মিশে আছে এতে।” এই লাইনগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতা কেবল পাওয়া নয়, এর পেছনে রয়েছে জাতিসত্তার এক বিরাট আত্মত্যাগ। তাঁর কবিতায় স্বাধীনতা শব্দটি তাই নানা মাত্রায় উপস্থাপিত হয়েছে, যা সাহিত্য আলোচনায় এক গভীর নান্দনিকতার সৃষ্টি করে। একদিকে তিনি স্বাধীনতাকে বাঙালির শাশ্বত আকাঙ্ক্ষা ও চিরন্তন সৌন্দর্যের প্রতীক রূপে দেখেছেন, যেখানে মুক্তি মানে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়া, শিল্প-সংস্কৃতির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ। এই নান্দনিক রূপটি স্পষ্ট হয়েছে তাঁর কালজয়ী পঙক্তিমালায়—“স্বাধীনতা তুমি / রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান। / স্বাধীনতা তুমি / ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি।” অন্যদিকে, এই স্বাধীনতা অর্জনের পথ যে রক্তে রাঙানো, সেই নির্মম বাস্তবতাও তিনি তুলে ধরেছেন তীব্র বেদনার সঙ্গে। স্বাধীনতা তার কাছে সহজে লভ্য কোনো বস্তু ছিল না; ছিল লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে কেনা এক পবিত্র অধিকার, যার জন্য দিতে হয়েছে চরম মূল্য, যা প্রকাশ পেয়েছে নিম্নোক্ত মর্মস্পর্শী পঙক্তিমালায়—“তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা, / তোমাকে পাওয়ার জন্যে / আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়? / আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন? /.../ তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা, / অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতা-মাতার লাশের উপর।”

মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ কাব্যগ্রন্থের মতো লেখায় তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ছিল আরও স্পষ্ট, যা তাঁর বিবেককে জাতির শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই কারণেই তাঁর মানবিক দায়বদ্ধতা তাঁর প্রতিবাদী এবং প্রেম-বিষয়ক উভয় কবিতায়ই দৃঢ়ভাবে প্রতিফলিত। তিনি সর্বদা ন্যায়ের পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে দাঁড়িয়েছেন।

​তাঁর কবিতায় প্রেম বা ভালোবাসা ছিল মানুষের প্রতি মানুষের আত্মিক মুক্তি ও সাহসের আহ্বান। এই গভীর মানবতাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকেই তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটি তুলে ধরেছেন। হতাশা বা ধ্বংস যাই আসুক, কবি বিশ্বাস করতেন মানুষ হার মানবে না; কারণ মানুষই একমাত্র প্রজাতি, যে স্বপ্ন দেখে এবং নিজেকে পুনর্নির্মাণ করে। তাই তিনি আশাবাদী কণ্ঠে বলেন: “পৃথিবী যতবার ধ্বংস হবে, ততবার নতুন মানুষ জন্ম নেবে।”

কবি শামসুর রাহমান ছিলেন আমাদের জাতীয় বিবেকের আয়না, যিনি অন্ধকারের ভিতরেও সাহসের আলো জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর কবিতা আমাদের শেখায়, জীবনের সবচেয়ে বড় শিল্পকর্মটি লুকিয়ে থাকে মানুষের প্রতি অটুট বিশ্বাসে। মহাকালের পথে যখন মানুষ প্রযুক্তি বা অন্য কোনো প্রপঞ্চের মোহে তার আসল পরিচয় ভুলতে বসে, তখনও এই কবির কণ্ঠস্বর আমাদের কানে বাজতে থাকে—মনে করিয়ে দেয় সেই চিরকালীন মানবিক দায়। তাঁর কাছে মানুষই কবিতার শেষ কথা, আর এই বিশ্বাসে অবিচল থাকাই শিল্পের চূড়ান্ত সার্থকতা। তাঁর কাব্য তাই আগুনে পোড়া সময়ের শান্ত প্রতিধ্বনি এবং নগরের বিষাদ ও বিপ্লবের যৌথ দস্তাবেজ, যা তাঁর অবিস্মরণীয় উত্তরাধিকার হিসেবে আগামী প্রজন্মকেও নিরন্তর অনুপ্রেরণা দিয়ে যাবে।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন