বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৭ ফাল্গুন ১৪৩২ , ২ রমজান ১৪৪৭

সাহিত্য
  >
প্রবন্ধ

জোছনার জাদুকর: বাঙালির মনস্তত্ত্বের শিল্পী হুমায়ূন আহমেদ

বাহাউদ্দিন গোলাপ নভেম্বর ১৩, ২০২৫, ১৭:৪৪:৫২

665
  • জোছনার জাদুকর: বাঙালির মনস্তত্ত্বের শিল্পী হুমায়ূন আহমেদ

​মহাকালের ক্যানভাসে মানুষ আসে নক্ষত্রের মতো এক ঝলক নিয়ে—কখনো নীরব দার্শনিক হয়ে, কখনোবা সহজ কথার জাদুকর সেজে। কিন্তু এমন বিরল শিল্পী কজনই বা আছেন, যিনি গদ্যকে জ্যোৎস্নার মতো কোমল আর গভীরতাকে শিশিরের বিন্দুর মতো স্বচ্ছ করে তুলতে পারেন? ১৩ নভেম্বর (১৯৪৮) তারিখটি আমাদের সাহিত্য জীবনে নিয়ে এসেছিল সেই শিল্পী-দার্শনিককে, যিনি তাঁর ২০০ এর অধিক সংখ্যক  সৃষ্টির পরশ পাথরে একটি গোটা জাতির আত্মার জমিন তৈরি করেছিলেন। তিনি, হুমায়ূন আহমেদ। তাঁর গদ্য যেন ছিল এক অলৌকিক পরশ—একদিকে বিজ্ঞানের ধ্রুব সত্যের মতো স্পষ্টতা অন্যদিকে আকাশের সমস্ত মেঘ আর জ্যোৎস্নার মায়াবী রঙ মেশানো। তিনি শুধু লেখক ছিলেন না, ছিলেন  নিরবচ্ছিন্ন কথক, যিনি আমাদের ভেতরের গভীরতম সত্যগুলো হাসির ছলে বলে যান।

​হুমায়ূন আহমেদের জন্মকালটি কেবল একটি তারিখ ছিল না, এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। তাঁর জন্ম হয়েছিল ভারত বিভাজন (১৯৪৭)-এর মাত্র এক বছর পর, যখন নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তান তার নিজস্ব পরিচয় এবং সাংস্কৃতিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম শুরু করেছিল। রাজনৈতিকভাবে, এটি ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক প্রস্তুতি এবং ক্রমবর্ধমান স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষার সময় সামাজিকভাবে, গ্রাম ও শহর, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে এক ভাঙাগড়ার খেলা চলছিল এবং একটি নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান হচ্ছিল। সাহিত্যিক প্রেক্ষাপটে, এই সময়ে বাংলা সাহিত্যে কলকাতার প্রভাব প্রবল ছিল; বাংলাদেশের লেখকরা তখনও নিজেদের একটি শক্তিশালী এবং স্বতন্ত্র 'ভয়েস' খুঁজে ফিরছিলেন। এই বিশাল সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যে বেড়ে ওঠেন হুমায়ূন আহমেদ, যা তাঁর সাহিত্যিক মননে অনায়াসে দুঃখ ও হাস্যরসের মিশ্রণ ঘটিয়েছিল।

হুমায়ূন আহমেদের লেখালেখির সূচনা ছিল প্রথাগত জীবনের প্রতি এক কোমল বিদ্রোহ। যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার মতো যুক্তিনির্ভর জগৎ থেকে বেরিয়ে এলেন, তখন ১৯৭২ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস “নন্দিত নরকে” প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সাহিত্যের পুরনো মানচিত্রটি যেন বদলে গেল। সমালোচকেরা একে স্বাগত জানালেন। ​তাঁর লেখনী ছিল ভাষার সঙ্গে এক আত্মিক কথোপকথন। তিনি কঠিন ভাষার ভার নামিয়ে চলতি জীবনের সহজ সুরটি ধরলেন এবং তাতে মিশিয়ে দিলেন গ্রামীণ মায়া ও রসবোধের মাদকতা। তাঁর এই সরলতা কোনো দুর্বলতা ছিল না, বরং ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় দার্শনিক অস্ত্র। তিনি দেখিয়ে দিলেন—কাব্য শুধু ছন্দে নয়, জীবনের ছোট ছোট দৃশ্যেও লুকিয়ে থাকে। তাঁর শৈলী ছিল সমসাময়িক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কাঠিন্য বা সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যিক ভাষা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন—হুমায়ূন ছিলেন জনমুখী বাস্তবতার শিল্পী, যিনি গোপন ট্র্যাজেডি এবং দৈনন্দিন জীবনের কৌতুককে মিশিয়ে এক নতুন সাহিত্যিক ফর্ম তৈরি করেছিলেন। তবে, তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক তুলনা আসে ভারতীয় বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (যেমনটি তাঁর একাধিক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন) তাঁকে “শরৎচন্দ্রের চেয়েও বেশি জনপ্রিয়” বলে অভিহিত করে তাঁর সহজ গদ্যের ব্যাপক সামাজিক প্রভাবকে তুলে ধরেন। তাঁর গদ্যের এই সহজগম্যতা তাকে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো লেখকের লোকজীবনভিত্তিক লেখার কাছাকাছি নিয়ে আসে, কিন্তু আধুনিক শহুরে জীবনের জটিলতা যোগ করে তিনি একটি নতুন ধারা তৈরি করেন।

আজকের এই যান্ত্রিক সময়ে, হলুদ পাঞ্জাবি পরা হিমুর উদ্দেশ্যহীন পদচারণা আমাদের অস্তিত্বের কাছে এক প্রশ্নচিহ্ন ছুঁড়ে দেয়। হিমু বলে: জীবনের পথে সফলতার ভিড় নয়, বরং পথ হারানোর অহেতুক আনন্দই আসল মুক্তি। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র হিমু, মিসির আলি ও শুভ্র—এঁরা বাঙালির আত্মার তিন দিক। হিমু হলো আমাদের ভেতরের সেই বোহেমিয়ান সত্তা, যে যুক্তি ও বাস্তবতাকে পায়ের নিচে ফেলে হেঁটে যায় আলোর খোঁজে। সাহিত্যের অধ্যাপক ও গবেষকদের মতে, তাঁর এই শৈলীকে পোস্টমডার্ন লোকজ বাস্তবতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই ধারাটির সঙ্গে ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ বা ইসাবেল আলেন্দে -এর শৈলীর এক দার্শনিক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে কঠিন বাস্তবতাকে অলৌকিকতার মোড়কে উপস্থাপন করা হয়। তাঁর সাহিত্যকে যারা "Escapism" (পলায়নবাদ) বলে সমালোচনা করতেন, তারা ভুলে যান যে এই পলায়নবাদই ছিল মধ্যবিত্তের জন্য এক সাময়িক দার্শনিক মুক্তি—জীবনের হতাশা ও অস্তিত্বের যন্ত্রণা থেকে বাঁচার এক কৌশল। তাঁর লেখার মূল দর্শন, যা তাঁর বহু গল্পে বারবার ফিরে আসে: "জীবনে কিছু কিছু শূন্যতা থাকা ভালো, তা পূর্ণ করার চেষ্টা থাকে"। তাঁর সংলাপে ব্যবহৃত 'অ্যাবসার্ড কৌতুক' (Absurd Humour) ছিল মূলত মধ্যবিত্তের শূন্যতা ও অস্থিরতাকে আঘাত করার এক সূক্ষ্ম হাতিয়ার। তাঁর এই তীক্ষ্ণ ও নিপুণ সংলাপের ব্যবহারই বাংলা কথাসাহিত্যে এক নতুন শৈলী তৈরি করে, যা দৈনন্দিন জীবনের কথা বলার ভঙ্গিকেও প্রভাবিত করেছিল।

হুমায়ূন আহমেদ শুধু গল্পের জাদুকর নন, তিনি ছিলেন আমাদের সাংস্কৃতিক স্রোতের নিয়ন্ত্রক ও সফল চলচ্চিত্রকার। তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল, তিনি কলকাতার সাহিত্যিক আধিপত্য থেকে বাংলাদেশের গদ্যকে মুক্ত করে একটি স্বকীয় ‘বাংলাদেশি কণ্ঠস্বর’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা স্বাধীনতার পরের প্রজন্মের জন্য এক সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব এনে দেয়। তবে, তাঁর প্রভাব কেবল সাহিত্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’ ও ‘কোথাও কেউ নেই’-এর মতো টেলিভিশন সিরিয়ালগুলো বিটিভির সোনালী যুগে এতটাই জনপ্রিয়তা পায় যে এগুলো প্রদর্শনের সময় শহর-গ্রামের রাস্তাঘাট জনশূন্য হয়ে যেত। এটি ছিল গণ-সংস্কৃতির ওপর তাঁর অবিসংবাদিত কর্তৃত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮১), একুশে পদক (১৯৯৪) সহ বহু জাতীয় সম্মাননার অধিকারী। তাঁর চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’ (যা আটটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছিল) দেখায়, তাঁর শিল্প শুধু জনপ্রিয় নয়, বরং শিল্পের সর্বোচ্চ মানদণ্ডও স্পর্শ করেছিল। বাকের ভাইয়ের মতো চরিত্র তৈরি করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন—তাঁর কলম সমাজের গভীরে থাকা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেমন তীব্র আলো ফেলতে পারে। তবে সমালোচকরা মনে করেন, পরবর্তী জীবনে তাঁর রচনায় একই ধরনের চরিত্র ও পটভূমির ‘ফমূর্লা নির্ভরতা’ এবং শিক্ষকতা ছেড়ে জনপ্রিয়তার দিকে ঝুঁকে পড়া তাঁকে ‘জনপ্রিয়তার শিল্পী’ হিসেবে সমালোচিত করেছে। এছাড়া, তাঁর ‘দেবী’ উপন্যাসের রানু বা অন্যান্য নারী চরিত্রগুলো তৎকালীন সামাজিক ও লিঙ্গীয় (Gender) প্রেক্ষাপটে নারীর মনোস্তাত্ত্বিক জটিলতা এবং সংবেদনশীলতাকে তুলে ধরে। তিনি গানের ক্ষেত্রেও ছিলেন এক বিরল সুরকার; তাঁর লেখা গানগুলো ছিল সহজ কথার আড়ালে লুকানো গভীরতম বিষাদ ও ভালোবাসার জলছবি।

​জীবনের নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও মানুষের প্রতি নিঃশর্ত বিশ্বাস ছিল তাঁর শিল্পের মূলমন্ত্র। তিনি একটি প্রজন্মকে শিখিয়েছিলেন—নিঃসঙ্গতা, কৌতুক এবং জোছনা—এই তিনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনের এক গভীরতম অর্থ। তাঁর আত্মজীবনীমূলক কাজগুলো প্রমাণ করে, ফিকশন এবং ব্যক্তিজীবন কীভাবে একে অপরের পরিপূরক ছিল। তাই, আজকের এই দিনে যখন আমরা তাঁর সৃষ্টিকে পুনরায় দেখি, তখন বুঝতে পারি: তিনি কেবল লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন সময়ের সীমানা পেরিয়ে যাওয়া এক অলৌকিক বাতিঘর। তাঁর গদ্যের এই বিজয় আপামর জনসাধারণের জন্য ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির এক নান্দনিক পথ। এটিই প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল সাহিত্যের একজন নির্মাতাই নন, তিনি বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির  সংরক্ষকও, যিনি জীবনের নশ্বরতার মুখে দাঁড়িয়ে অমরত্বের বাস্তব-জাগতিক দর্শন নির্মাণ করে গিয়েছেন।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন