বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৭ ফাল্গুন ১৪৩২ , ২ রমজান ১৪৪৭

সাহিত্য
  >
প্রবন্ধ

বিরহের অগ্নিশুদ্ধি: হেলাল হাফিজের হেলেন এবং অপ্রাপ্তির মহাকাব্য

বাহাউদ্দিন গোলাপ ডিসেম্বর ১৯, ২০২৫, ১৬:৪৬:২০

367
  • বিরহের অগ্নিশুদ্ধি: হেলাল হাফিজের হেলেন এবং অপ্রাপ্তির মহাকাব্য

নেত্রকোণার শান্ত মগড়া নদীর তীরে একটি কিশোর প্রেমকাহিনি শুরু হয়েছিল। মেঘময় আকাশের নিচে ১২-১৩ বছরের কবি হেলাল হাফিজ ভালোবেসেছিলেন এক কিশোরী হেলেনকে। গ্রামের মাঠে, নদীর ধারে, কচুরিপানায় গাঁথা খোপায়—তাদের শৈশব-কৈশোর কেটেছিল যেন প্রকৃতির কোলে এক নিষ্পাপ কাব্যের মতো। দীর্ঘদিনের সেই মায়াবী বন্ধন ছিল গ্রামীণ সজীবতার প্রতিচ্ছবি, যে সজীবতা কেবল প্রথম প্রেমের ক্ষেত্রেই সম্ভব। কিন্তু পরিবার ও সমাজের কঠিন দেওয়াল সেই সুন্দর উপন্যাসে আচমকা বাঁধ সাধলো। তাদের প্রেমকে কেউ মেনে নিল না। অভিমানী কবি গেলেন ঢাকা শহরে, কিন্তু হেলেন তখনও তার হৃদয়ে ধ্রুবতারা। দূরত্ব বাড়লো, তবুও কবির মনে ছিল প্রত্যাশার এক ক্ষীণ আলোকরেখা। কিন্তু নিয়তি লিখলো ভিন্ন চিত্রনাট্য। কবির কাছে এলো হেলেনের চিঠি—এক নিমন্ত্রণপত্র, তার বিবাহলগ্নের। সেই চিঠি ছিল কবির জীবনে এক নিঃশব্দ বিস্ফোরণ। সেই চিঠির দিকে চেয়ে কবি লিখলেন তার সেই ধ্রুপদী চরণ, যা অমরতার পথে তার প্রথম স্বাক্ষর: "হয়তো তোমাকে হারিয়ে দিয়েছি নয়তো গিয়েছি হেরে,/ থাক না ধ্রুপদী অস্পষ্টতা কে কাকে গেলাম ছেড়ে।" এই অস্পষ্টতা যেন জীবনেরই এক চূড়ান্ত দার্শনিক সত্য, যেখানে জয়-পরাজয় কেবলই আপেক্ষিক।

ধুমধাম করে হেলেনের বিয়ে হলো ঢাকার বিখ্যাত এক সিনেমা হলের (মুন সিনেমা হল) মালিকের সাথে। কবির ঠিকানা থেকে আর কোনোদিন ফিরতি পত্র এলো না। বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও সেই নীরবতা কবির হৃদয়ে জমিয়ে দিলো এক বুক ভরা বিষণ্ণতা। এই নীরবতাই জন্ম দিলো সৃষ্টির। বিরহের অগ্নিদাহ নিয়ে জন্ম নিলো তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ, “যে জলে আগুন জ্বলে।” সেখানে তিনি লিখলেন ভালোবাসার এক নিগূঢ় তত্ত্ব: “শুনেছি সুখেই বেশ আছো, / কিছু ভাঙচুর আর তোলপাড় নিয়ে আজ আমিও সচ্ছল.../ মূলতই ভালোবাসা মিলনে মলিন হয়, বিরহে উজ্জ্বল।” এই উপলব্ধি কেবল কবির ব্যক্তিগত নয়, বরং এটি মানব মনের এক গভীর সত্য। ভালোবাসা যখন অপ্রাপ্ত থাকে, তখন তা এক অগ্নিশুদ্ধির মধ্য দিয়ে যায়, যা কবিকে শিল্পী করে তোলে। ​ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, হেলেনের স্বামী সেই বইমেলা থেকে আরও অনেক বইয়ের সঙ্গে কবির বিরহগাথাও কিনে আনলেন। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টে যখন হেলেন দেখলেন প্রতিটি কবিতা যেন তাকে নিয়েই কবির আর্তচিৎকার, হাহাকার—সেই না-পাওয়ার বেদনা হেলেনের মনোজগতে হাতুড়ির মতো আঘাত হানতে থাকলো। হেলেনের জীবন তখন এক বিলাসবহুল খাঁচা, কিন্তু ভেতরের মন পুড়তে থাকলো পুরোনো স্মৃতি আর কবির অমর পঙক্তিমালায়। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না হেলেন। জীবন তাকে দিলো মানসিক বিকৃতি, শিকলে বাঁধা এক বদ্ধ উন্মাদ জীবন। উচ্চতর চিকিৎসা, দেশভ্রমণ ব্যর্থ হলো, অবশেষে স্বামী কর্তৃক তালাকপ্রাপ্তা হয়ে হেলেনের স্থান হলো নেত্রকোণায় তার নিজের বাড়িতে, শেকলে বাঁধা অবস্থায়। প্রেম এখানে কেবল ব্যর্থ হলো না, এটি যেন ধ্বংস করে দিলো দু’টি জীবনকে—একটি শারীরিক উন্মাদনায়, অন্যটি মানসিক নিঃসঙ্গতায়।

​এদিকে, হেলাল হাফিজ তখন শাহবাগের এক মেসে নিঃসঙ্গতার কঠিন বেড়াজালে বন্দী, যিনি 'জনতার কবি' হয়েও ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন সম্পূর্ণ একা। দু'জন দু'জনকে ভালোবেসেও কেউ কাউকে পেলেন না। ভালোবাসা তাদের জীবনে মিলন না এনে উপহার দিলো এক অদ্ভুত নির্জনতা, যার ভার নিয়ে কাটে তাদের শেষ দিনগুলো। এই নির্জনতা, এই না-পাওয়ার বেদনা, বিশ্বজুড়ে কত কবি-সাহিত্যিকের জীবনকেই না গ্রাস করেছে! এই অপ্রাপ্তিই শিল্পকে জন্ম দিয়েছে। কাফকা পাননি তার মিলেনাকে, মিলেনার উদ্দেশ্যে তার লেখা শত শত চিঠি হয়ে উঠেছে বিরহের দলিল। এডগার অ্যালান পো এর জীবনে তার সারাহ কখনো অ্যানাবেল লী হয়ে আসেননি, জন কীটস তার অসুস্থতার কারণে পাননি ফ্যানিকে ব্রাউনিকে। লর্ড বায়রন মেরি চওয়ার্থকে না পেয়ে লিখেছিলেন তার বিখ্যাত কবিতা The Dreamers। দান্তে বিয়াট্রেসকে না পেয়ে তার সব ক্ষোভ, রাগ, ভক্তি উগরে দিয়েছিলেন দ্য ডিভাইন কমেডিতে, বিয়াট্রেসকে স্বর্গের প্রতীক করে। আমাদের জীবনানন্দও তার শোভনাকে না পাওয়ার বেদনা ভুলতে লিখলেন বনলতা সেন। তারা প্রত্যেকেই তাদের অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা উগরে দিয়েছিলেন কালজয়ী সৃষ্টিতে। হেলাল হাফিজের জীবনও এই ট্র্যাজেডিরই অংশ। এক হেলেনকে না-পাওয়ার দুঃখ ভুলতে তার এক জীবন কেটে গেলো।

জীবনের এই “চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক”-এর কঠিন সমীকরণ মেলাতে গিয়েই হয়ত শিল্পীরা বেছে নেন মেলানকোলিয়াকে। এই ফারাকের ব্যবধানের হিসাব কষতে কষতেই মানুষের এক জীবন পার হয়ে যায়, তবুও মানুষের অঙ্ক শেষ হয় না। এই কঠিন সমীকরণ মিলাতে যেয়ে মানুষ ভয়াবহ নিঃসঙ্গতায় ডুবে যায়। নিঃসঙ্গতায় ডুবে যেমন ভ্যান গঘ নির্জন এক রাতে ছবি আঁকতে আঁকতে নিজের বুকে গুলি করে পড়েছিলেন তার স্টুডিওতে, অথবা সারাজীবন মেলানকোলিয়ায় ডুবে থেকে এক শীতের সকালে সূর্য ওঠার আগেই মৃত অবস্থায় পার্কের বেঞ্চে পাওয়া গেলো এডগার অ্যালান পোর মৃতদেহ। নিঃসঙ্গতায় ভর্তি এক জীবন কাটিয়ে জীবনানন্দ পা বাড়ালেন ট্রামলাইনে। আমাদের হেলাল হাফিজকেও তেমনি পাওয়া গেলো শাহবাগের এক মেসে। নিঃসঙ্গতায় ভরা এক জীবন কাটিয়ে অবশেষে ঘুচলো তার নিঃসঙ্গতা। আর অন্যদিকে, লোকচক্ষুর আড়ালে নেত্রকোণার সেই গ্রামেই, শিকলে বাঁধা অবস্থায় কাটানো তার দুর্বিষহ জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল হেলেনের। ভালোবাসার এই ট্র্যাজিক পরিণতির খবরটুকুও জনসম্মুখে আসেনি সেভাবে; শুধু জানা যায়, কবির চিরবিদায়ের কিছুকাল আগেই হেলেন তার সেই উন্মাদ জীবনের বন্দিদশা থেকে চিরতরে মুক্তি লাভ করেন। সম্ভবত, সেই আদিকাল থেকে কবি-সাহিত্যিকেরা নিঃসঙ্গতার যে সমাধান খুঁজে পান, তা কেবল একটাই—মৃত্যু। এই মৃত্যু, এই চিরকালীন ঘুমই হয়তো সেই তীব্র নির্জনতা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ, যা প্রেমের বিরহ তাদের উপহার দিয়েছিল।

(ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)

নিউজজি/নাসি  

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন