বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৭ ফাল্গুন ১৪৩২ , ২ রমজান ১৪৪৭

সাহিত্য
  >
প্রবন্ধ

শূন্যের রাজত্ব ও অস্তিত্বের মহাকাব্য: হাচন রাজার মরমি দর্শনের এক মহাজাগতিক ব্যবচ্ছেদ

বাহাউদ্দিন গোলাপ ডিসেম্বর ২১, ২০২৫, ২০:১০:২৭

378
  • শূন্যের রাজত্ব ও অস্তিত্বের মহাকাব্য: হাচন রাজার মরমি দর্শনের এক মহাজাগতিক ব্যবচ্ছেদ

সুরমা বিধৌত পলিমাটি আর দিগন্তবিস্তৃত হাওরের জলরাশি যেখানে অসীম আকাশের সাথে একাকার হয়ে যায় সেখানেই একদিন জন্ম নিয়েছিল এক মহাজাগতিক হাহাকার, যার নাম দেওয়ান হাচন রাজা। উনিশ শতকের মধ্যভাগে যখন বঙ্গীয় সমাজ-মানস ঔপনিবেশিক আধুনিকতার চাকচিক্য আর প্রাচীন প্রথার অচলায়তনের দ্বন্দ্বে বিদীর্ণ, ঠিক তখন সুনামগঞ্জের লক্ষ্মণশ্রীর হাওর-বাঁওড় ছাপিয়ে এক মরমি কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়েছিল। সেই সুর রাজকীয় আভিজাত্যের মোহিনী আবরণ ছিন্ন করে উন্মোচন করেছিল আত্মার আদিম ও অনাদি রূপ। হাচন রাজা কেবল একজন জমিদার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাধারে নশ্বরতার নিপুণ রূপকার এবং অবিনশ্বরতার অতন্দ্র সাধক। তাঁর জীবন ছিল এক বিচিত্র রূপান্তরের মহাকাব্য—এক প্রবল প্রতাপশালী সামন্তপ্রভুর দর্পিত পদক্ষেপ থেকে শুরু করে এক নিঃস্ব বৈরাগী ফকিরের শূন্যে মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত এই যে বিবর্তন, তা বিশ্বের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।

১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জের এক প্রতাপশালী জমিদার পরিবারে জন্ম নেওয়া হাচন রাজার প্রথম জীবন ছিল বৈষয়িক জৌলুসে মত্ত। পিতা দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী এবং মাতা হুরমত জাহান বিবির বিশাল ভূ-সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে তরুণ হাচন ছিলেন শৌখিনতার মূর্ত প্রতীক। কথিত আছে, তাঁর আস্তাবলে থাকত সেরা জাতের ঘোড়া, শিকারে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং কুস্তি ও শৌখিনতায় তাঁর খ্যাতি ছিল কিংবদন্তিতুল্য। কিন্তু এই ভোগবাদী আতিশয্যের আড়ালেই সুপ্ত ছিল এক আধ্যাত্মিক দহন। জীবনের মধ্যগগনে এক আকস্মিক অস্তিত্ববাদী সংকটের মুখে পড়ে তিনি তাঁর রাজকীয় ঐশ্বর্যকে 'মায়ার খেলা' হিসেবে বর্জন করেন। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এই পরিবর্তনটি ছিল এক যুগান্তকারী বিবর্তন—যেখানে একজন শাসক শ্রেণির প্রতিনিধি নিজের সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি বিসর্জন দিয়ে সাধারণ মানুষের কাতারে এসে বিশ্বজনীন মানবিক সত্তায় লীন হন। হাচন রাজার দর্শনের গহীনে উপনিষদীয় অদ্বৈতবাদ আর পারস্যের সুফিবাদ এক আশ্চর্য মোহনায় মিলিত হয়েছে। তিনি যখন গেয়ে ওঠেন—

​“লোকে বলে বলে রে ঘরবাড়ি ভালা নায় আমার

কি ঘর বানাইমু আমি শূন্যের মাঝার”

তখন সেই ঘর কেবল ইটের পাঁজরের কোনো স্থাপনা থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে মানুষের নশ্বর এই শরীর। তাঁর এই দর্শনে মানুষের দেহই মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম সংস্করণ—যা স্পিনোজার সর্বেশ্বরবাদের সাথে একীভূত হয়ে যায়। সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের জলমগ্ন ভূ-প্রকৃতি, যেখানে মাইলের পর মাইল কেবল জল আর শূন্যতা, তাঁর এই 'শূন্যের মাঝার' দর্শনের এক শক্তিশালী প্রাকৃতিক ও নৃ-তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করেছিল। বাংলার আধ্যাত্মিক মানচিত্রে হাচন রাজার সমান্তরালে উচ্চারিত হয় ফকির লালন শাহের নাম। লালন তাঁর 'খাঁচার ভিতর অচিন পাখি'র মাধ্যমে যে পরমাত্মার সন্ধান করেছেন, হাচন রাজা তাঁর রাজকীয় ঐশ্বর্য বিসর্জন দিয়ে সেই একই অচিন পাখির ডানা ঝাপটানো শব্দ শুনেছেন নিজের হৃদপিণ্ডের নিভৃত প্রকোষ্ঠে। হাচন ছিলেন আভিজাত্যের শিখর থেকে স্বেচ্ছায় নিচে নেমে আসা এক বৈরাগী, আর লালন ছিলেন সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে উঠে আসা এক সাধক যিনি আধ্যাত্মিকতার শীর্ষে উঠেছেন। এই দুই মহাজীবনের মিলনই আসলে বাংলার শাশ্বত সংস্কৃতির মূল ভিত্তি।

​সাহিত্যিক কীর্তি হিসেবে ১৯০৬ সালে প্রকাশিত 'হাচন উদাস' কেবল গান বা কবিতার সংকলন নয়, বরং তা একজন মানুষের ভেতর থেকে বদলে যাওয়ার এক জীবন্ত দলিল। এছাড়াও তাঁর দর্শনের গভীরতা ছড়িয়ে আছে 'শৌখিন বাহার' এবং 'হাচন বাহার'-এর মতো অনন্য গ্রন্থে। তাঁর গানের পঙক্তিতে মিশে আছে জীবনের রূঢ় সত্য ও স্রষ্টার প্রতি ব্যাকুলতা। তিনি যখন গেয়ে ওঠেন—

​“নেশা লাগিল রে, বাঁকা দুই নয়নে নেশা লাগিল রে

হাসন রাজা পেয়ারির প্রেমে মজিল রে”

 

তখন সেই প্রেম আর জাগতিক থাকে না, তা হয়ে ওঠে সৃষ্টির সাথে স্রষ্টার এক আধ্যাত্মিক মিলনগাথা। আবার যখন তিনি গেয়ে উঠেন—

​“সোহাগিয়া চান্দে আমারে পাগল করিল রে

আর কিছু না চায় হাসন রাজা কেবল চান্দে চায় রে”

 

তখন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে সেই সত্য যে, মহাজাগতিক প্রেম মানুষকে জগতের সকল নিয়মের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়। তাঁর সেই আর্তি—

​“আগুন লাগাইয়া দিল কনে

হাছন রাজার মনে রে বন্ধু আগুন লাগাইয়া দিল কনে”

​মনে করিয়ে দেয় যে, ভেতরের দহন ছাড়া সত্যের আলো পাওয়া সম্ভব নয়। জীবনের এই বিচিত্র রূপান্তর ও পার্থিব মোহ ত্যাগের সেই বিস্ময় ফুটে ওঠে তাঁর অন্য এক কালজয়ী পঙক্তিতে—

​“বাউলা কে বানাইল রে, হাছন রাজারে বাউলা কে বানাইল রে

ঘরবাড়ি ছাড়াইল আমারে বাউলা কে বানাইল রে ”

বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে হাচন রাজার অবস্থান বিশ্লেষণ করলে পারস্যের মহাকবি জালালুদ্দিন রুমির সাথে তাঁর এক নিগুঢ় আত্মীয়তা খুঁজে পাওয়া যায়। রুমি যেমন প্রেমের অনলে পুড়ে নিজেকে ছাই করে পরম সত্যকে খুঁজেছিলেন, হাচন রাজাও তেমনি তাঁর যৌবনের ভোগবিলাস বিসর্জন দিয়ে 'হাচন উদাস' হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত সেই ঘোষণা—'আমিই আমি, আমিই আমি'—আসলে সত্যের সেই স্তরে পৌঁছানো যেখানে মানুষের আমিত্ব বিলীন হয়ে পরম সত্তার সাথে এক হয়ে যায়। পাশ্চাত্য কবি উইলিয়াম ব্লেক যেমন একটি বালুকণার ভেতর স্বর্গকে প্রত্যক্ষ করতেন, হাচন রাজাও তেমনি তাঁর অন্তরের আয়নায় আসমান-জমিনের প্রতিচ্ছবি দেখতেন। গবেষণার দৃষ্টিতে দেখলে, হাচনের এই 'নিজেকেই বিশ্বরূপে দেখা'র প্রবণতা আসলে আধুনিক বিজ্ঞানের 'অ্যানথ্রোপিক প্রিন্সিপল' বা মানবকেন্দ্রিক মহাবিশ্ব তত্ত্বের এক মরমি পূর্বাভাস।

​রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৫ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ফিলসফিক্যাল কংগ্রেস-এ এবং ১৯৩০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ঐতিহাসিক 'হিবার্ট লেকচার'-এ হাচন রাজার গানের ইংরেজি অনুবাদ পাঠ করে বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়েছিলেন। বিশেষ করে হাচনের পঙক্তি—

​“মম আঁখি হইতে পয়দা হইয়াছে আসমান জমিন

শরীল করিলে তালাশ দেখিবে সকলই বর্তমান”

রবীন্দ্রনাথের কাছে এটি প্রতিভাত হয়েছিল এই হিসেবে যে, মানুষের নিজের দেখার ওপরই জগতের অস্তিত্ব নির্ভর করে। আধুনিক কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের 'অবজারভার ইফেক্ট' যেমন বলে যে পর্যবেক্ষকের উপস্থিতিতেই বাস্তবের রূপ নির্ধারিত হয়, হাচন রাজা দেড়শ বছর আগেই সেই বৈজ্ঞানিক ধ্রুবসত্য গেয়েছিলেন লোকজ ভাষায়। এটি কেবল কাব্য নয়, বরং এটি একটি গভীর 'ফেনোমেনোলজিক্যাল' বা প্রপঞ্চতাত্ত্বিক অবস্থান, যা জঁ-পল সার্ত্রে বা মার্টিন হাইডেগারের অস্তিত্ববাদী দর্শনের সাথে তুলনীয়।

আজকের অতি-আধুনিক একবিংশ শতাব্দীতে, যেখানে যান্ত্রিকতা ও ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতা মানুষের আত্মাকে গ্রাস করে নিচ্ছে, সেখানে হাচন রাজার জীবনদর্শন এক নতুন পথের দিশারি। আজ মানুষ যখন তথ্যের মহাসমুদ্রে ডুবেও একাকীত্বের মরুভূমিতে তৃষ্ণার্ত, তখন হাচনের সেই ‘বাউলা’ হওয়া বা নিজেকে খোঁজার আর্তি এক চরম সত্য হিসেবে সামনে আসে। আমাদের এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর অ্যালগরিদমের যুগে মানুষের মৌলিক মানবিক সত্তা যখন পণ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে, হাচন রাজার দর্শন তখন শেখায় যে প্রকৃত মুক্তি বাইরের প্রাপ্তিতে নয়, বরং অন্তরের নিভৃত কোলাহলহীনতায়। তিনি শিখিয়েছিলেন যে, বাইরের অঢেল সম্পদ আসলে এক অন্তহীন তৃষ্ণা মাত্র, প্রকৃত শান্তি নিহিত রয়েছে নিজের ভেতরে ডুবে থাকার সাহসে। হাচনের সেই অমর পঙক্তি—

​“আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে

আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে, রূপের বিচার কর অন্তরে”

আসলে এক গভীর আমন্ত্রণ, যা আমাদের বাইরের কোলাহল থামিয়ে নিজের মনের গভীর স্তব্ধতাকে শোনার আহ্বান জানায়। আধুনিক মানুষের অবসাদ আর মানসিক অস্থিরতার মহৌষধ হতে পারে তাঁর এই ‘অন্তরের বিচার’। প্রকৃতিকে নিছক সম্পদ হিসেবে দেখার পরিবর্তে তার সাথে আত্মার সংযোগ স্থাপনের যে ইকো-ফিলোসফি হাচনের সুরমা তীরের গানে ছিল, তা জলবায়ু সংকটের এই যুগে এক পরম শিক্ষা।

হাচন রাজা কোনো বিশেষ ধর্ম বা ভূগোলের সীমানায় আবদ্ধ কবি নন; তিনি এক অনন্তের পরিব্রাজক। ১৯২২ সালের ৬ ডিসেম্বর এই মরমি সাধকের মহাপ্রয়াণ ঘটে। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তিনি যেন তাঁর সেই কাঙ্ক্ষিত 'শূন্যের মাঝার' ঘরেই স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে নেন। তিনি রাজা হয়েও ফকির সেজেছেন কারণ তিনি বুঝেছিলেন, প্রকৃত রাজত্ব রাজপ্রাসাদে নয়, বরং হৃদয়ের প্রশান্তিতে। সুরমা নদীর ঢেউয়ের দোলায় আজও হাচন রাজার সেই চিরন্তন সুর প্রতিধ্বনিত হয়—ব্যস্ত পৃথিবীর কোলাহল ছাপিয়ে যা আমাদের আহ্বান জানায় এক প্রশান্ত মুক্তির দিকে। হাচন রাজা ছিলেন সেই বিরল আলোকবর্তিকা, যিনি মাটির পৃথিবী আর আকাশী প্রেমের মাঝে এক অভিন্ন সেতু নির্মাণ করে দিয়ে গিয়েছেন। জীবনের এই নশ্বর পাড়ে দাঁড়িয়ে তিনি আমাদের শোনান সেই অবিনশ্বর সত্যের বাণী, যা মহাকালের গর্ভে চিরকাল অমলিন থাকবে এবং বর্তমান যুগের মানুষের মানসিক ও আত্মিক সংকটে ধ্রুবতারার মতো পথ দেখাবে।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন