বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৭ ফাল্গুন ১৪৩২ , ২ রমজান ১৪৪৭

সাহিত্য
  >
প্রবন্ধ

অন্ধকারে আলোকবর্তিকা: সত্যেন সেনের অবিনাশী অন্তর্দৃষ্টি ও সাম্যের মহাকাব্য

​ বাহাউদ্দিন গোলাপ জানুয়ারি ৫, ২০২৬, ১৯:২৪:২৬

423
  • অন্ধকারে আলোকবর্তিকা: সত্যেন সেনের অবিনাশী অন্তর্দৃষ্টি ও সাম্যের মহাকাব্য

ইতিহাসের কিছু মানুষ থাকেন যারা সময়ের স্রোতে কেবল ভাসেন না, বরং নিজেরাই হয়ে ওঠেন ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারক। বিংশ শতাব্দীর বাংলায় যখন ঔপনিবেশিক শাসনের সূর্য অস্তমিত হচ্ছে এবং দেশভাগের ক্ষত নিয়ে নতুন এক মানচিত্রের জন্ম হচ্ছে, সেই সন্ধিক্ষণে সত্যেন সেন আবির্ভূত হয়েছিলেন মেহনতি মানুষের এক চিরন্তন কণ্ঠস্বর হিসেবে। বিক্রমপুরের সোনারং গ্রামে জন্ম নেওয়া সত্যেন্দ্রমোহন সেনের বেড়ে ওঠা ছিল বৈপ্লবিক আদর্শের এক উর্বর চারণভূমি। যুগান্তর দলের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হওয়া থেকে শুরু করে জীবনের দীর্ঘ সময় অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠে কাটানো—সবই ছিল এক মহৎ দর্শনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইতালীয় তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামশি যেমন কারাগারে বসে তাঁর ‘প্রিজন নোটবুকস’ লিখেছিলেন, সত্যেন সেনও তেমনি ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের দীর্ঘ কারাবাসকে রূপান্তর করেছিলেন জ্ঞানচর্চার তপোবনে। কারাগার তাঁর কাছে কেবল দণ্ড ছিল না, ছিল সমাজ ও দর্শনকে ব্যবচ্ছেদ করার এক অনন্য ল্যাবরেটরি। সেখান থেকেই তিনি শুষে নিয়েছিলেন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দর্শনের সেই নির্যাস, যা তাঁকে আজীবন শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার লড়াইয়ে অকুতোভয় করে রেখেছিল।

সত্যেন সেনের জীবনের অন্যতম হৃদয়বিদারক অথচ শৌর্যমণ্ডিত অধ্যায় হলো তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারানোর মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি। রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে বছরের পর বছর স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটানো এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অমানবিক চিকিৎসা-অবহেলায় তাঁর কর্নিয়া মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৬৮ সালে যখন তিনি মুক্তি পান, ততক্ষণে তাঁর চোখের জাগতিক আলো প্রায় নিভে এসেছে। কিন্তু এই অন্ধত্ব ছিল এক প্রখর রাজনৈতিক ও দার্শনিক রূপক—শাসকগোষ্ঠী তাঁর চাক্ষুষ দেখার ক্ষমতা কেড়ে নিতে পেরেছিল ঠিকই, কিন্তু তাঁর বৈপ্লবিক অন্তর্দৃষ্টি বা আদর্শিক লক্ষ্য কেড়ে নিতে পারেনি। এটি যেন মহাকবি জন মিলটনের সেই ‘প্যারাডাইস লস্ট’ -এর স্রষ্টার মতোই, যিনি অন্ধকারের অতলে দাঁড়িয়েও স্বর্গীয় আলোর মহিমা গেয়েছেন। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে যখন তিনি রণাঙ্গন থেকে রণাঙ্গনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তখন তাঁর দৃষ্টি ছিল ঝাপসা, কিন্তু গন্তব্য ছিল সূর্যের মতো স্বচ্ছ। মস্কোর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় যখন তিনি স্বদেশের বিজয়ের সংবাদ পান, তখন তাঁর সেই অশ্রুসিক্ত অন্ধ চোখ দুটোই হয়ে উঠেছিল এক স্বাধীন ভূখণ্ডের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ সাক্ষী। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, প্রকৃত বিপ্লবীর চোখ কেবল মুখমণ্ডলে থাকে না, থাকে তাঁর আদর্শের গভীরতায়।

​এই মহান বিপ্লবীর সংগ্রামের সবচেয়ে নান্দনিক প্রকাশ ঘটেছিল তাঁর রচিত গণসংগীতে, যেখানে তিনি জটিল রাজনৈতিক দর্শনকে সাধারণ মানুষের হৃদস্পন্দনে রূপান্তর করেছিলেন। তিনি শিল্পকে কেবল নন্দনতত্ত্বের অনুষঙ্গ মনে করতেন না; তাঁর কাছে শিল্প ছিল বার্টোল্ট ব্রেখটের সেই উক্তির মতো—‘শিল্প আয়না নয় যে তাতে বাস্তব দেখা যাবে, বরং শিল্প হলো হাতুড়ি যা দিয়ে বাস্তবতাকে নতুন রূপ দিতে হয়’। ১৯৫৬ সালে বিক্রমপুরের ষোলঘরে কৃষক সম্মেলনে তিনি যখন গেয়ে ওঠেন, “চাষি দে তোর লাল সেলাম / তোর লাল নিশানারে / ঐ নিশানার জোরে আমরা / জয় করব দুনিয়ারে”, তখন তা আর কেবল একটি গান থাকে না, হয়ে ওঠে শোষিত শ্রেণির আন্তর্জাতিক সংহতির এক দালিলিক ইশতেহার। ল্যাটিন আমেরিকার ভিক্টর জারা বা পাবলো নেরুদা যেমন কলম ও সুরকে অস্ত্রের মতো ব্যবহার করেছিলেন, সত্যেন সেনও তাঁর গানে ‘লাল নিশান’ শব্দবন্ধকে সাম্যের এক বৈশ্বিক প্রতীকে পরিণত করেছিলেন। শ্রমিকদের বঞ্চনা নিয়ে তাঁর সেই কালজয়ী হাহাকার— “আমরা গড়ি আকাশচুম্বী অট্টালিকা / আমরা মরি অন্ধকূপে অন্ধকার রাত্রে”, আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজের নিষ্ঠুর শ্রেণিবৈষম্যকে এক অমোঘ সত্য হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। তাঁর গানগুলো ছিল মূলত মার্কসীয় তত্ত্বের এক সুললিত অনুবাদ, যা প্রান্তিক মানুষের কানে পৌঁছে দিয়েছিল মুক্তির বারতা।

বর্তমান সময়ে যখন বিশ্বজুড়ে উগ্র জাতীয়তাবাদ, দক্ষিণপন্থি পপুলিজম এবং আকাশচুম্বী অর্থনৈতিক বৈষম্য নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তখন সত্যেন সেনের প্রাসঙ্গিকতা কোনো কালখণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। যখন মানুষের শ্রম সস্তায় বিকিয়ে যায় এবং যান্ত্রিকতার ভিড়ে মানবতা কোণঠাসা, তখন সত্যেন সেনের প্রগতিশীল চেতনা ও তাঁর গণমুখী সংস্কৃতিই হতে পারে আমাদের চেতনার রক্ষাকবচ। চল্লিশের দশকে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের মাধ্যমে তিনি যে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই শুরু করেছিলেন এবং ১৯৬৯ সালের ২৯ অক্টোবর তাঁর হাতে গড়া ‘বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’ আজ কেবল একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন নয়, বরং তা প্রগতিশীল চেতনার এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। সত্যেন সেন জানতেন, সাংস্কৃতিক মুক্তি ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা কোনোদিনই পূর্ণতা পায় না। তাই মস্কোর উন্নত চিকিৎসা ছেড়ে তিনি আবার ফিরে এসেছিলেন ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা স্বাধীন বাংলাদেশে, নতুন করে মানুষকে জাগানোর মন্ত্র নিয়ে।

আজকের এই চরম আত্মকেন্দ্রিক ও ভোগবাদী সমাজে সত্যেন সেনের জীবন এক পরম প্রতিষেধক। তাঁর মৃত্যু কোনো প্রস্থান নয়, বরং এক অবিনাশী উপস্থিতির নাম। তিনি আমাদের শিখিয়ে গিয়েছেন—শরীরের শক্তি ফুরিয়ে গেলেও আত্মার তেজ দিয়ে কীভাবে অনাগত ভবিষ্যতের পথ চেনা যায়। তিনি যেন সেই ধ্রুবতারা, যা রাতের অন্ধকার পথ হারানো পথিককে দিগন্তের ঠিকানা বলে দেয়। মহাকালের বিশাল ক্যানভাসে সত্যেন সেন কেবল একটি নাম নন, বরং শোষিত মানুষের হৃদপিণ্ড থেকে নিঃসৃত এক নিরবচ্ছিন্ন সুর। ১৯৮১ সালের ৫ জানুয়ারি শান্তিনিকেতনে তাঁর পার্থিব অস্তিত্বের অবসান ঘটলেও, তাঁর স্বপ্নগুলো আজও কোটি মানুষের রক্তকণিকায় মিশে আছে। বিক্রমপুরের সোঁদামাটি থেকে শুরু হওয়া সেই সাম্যের মিছিল আজও থামেনি, বরং তা ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে মুক্তির এক অনন্ত মহাসমুদ্রে। সত্যেন সেনের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদন তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা তাঁর সেই আজন্ম লালিত সাম্যবাদী স্বপ্নের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে একটি শোষণমুক্ত পৃথিবী নির্মাণ করতে পারব। তাঁর সৃষ্টি ও আদর্শের মশাল আমাদের উত্তরপ্রজন্মের হাতে এক অক্ষয় উত্তরাধিকার; যা যুগ যুগ ধরে অন্ধকারের বুক চিরে গেয়ে যাবে আলোর জয়গান। বিক্রমপুরের মাটি থেকে বিশ্ব-চেতনার মানচিত্রে তাঁর স্থান অমোঘ, অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং চির অমলিন।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন