শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ২৭ চৈত্র ১৪৩২ , ২২ শাওয়াল ১৪৪৭

সাহিত্য
  >
প্রবন্ধ

মহাশ্বেতা দেবী, জন্ম শতবর্ষে অতল শ্রদ্ধা

বাহাউদ্দিন গোলাপ জানুয়ারি ২১, ২০২৬, ১৬:৩০:৪৭

527
  • মহাশ্বেতা দেবী, জন্ম শতবর্ষে অতল শ্রদ্ধা

ইতিহাসের ক্যানভাসে এমন কিছু নক্ষত্রের উদয় হয়, যাঁরা কেবল সময়ের সাক্ষী নন, বরং নিজেরাই এক একটি কালখণ্ডকে ধারণ করেন। ১৯২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ঢাকার ঋষিকেশ দাস লেনে যাঁর জন্ম, আজ তাঁর জন্মশতবর্ষের শুভলগ্নে দাঁড়িয়ে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে বলতে হয়—মহাশ্বেতা দেবী কেবল একজন কথাসাহিত্যিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন বিস্মৃত ইতিহাসের এক নির্ভীক রূপকার। তাঁর লেখনী কেবল অক্ষর সাজায়নি, বরং শতাব্দীর জমে থাকা ধুলো ঝেড়ে বের করে এনেছে শোষিতের আর্তনাদ। ঢাকার আলো-বাতাসে শৈশব শুরু হলেও, কিশোরী বয়সেই তিনি পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় থিতু হন। দেশভাগের যন্ত্রণাময় স্মৃতি আর বাস্তুহারা মানুষের হাহাকারকে সাক্ষী রেখে তাঁর পরিবার পশ্চিমবঙ্গে স্থায়ী হয়, যা তাঁর জীবন ও সাহিত্যে উত্তর-ঔপনিবেশিক এক গভীর সংকটের ছাপ ফেলেছিল। পিতা মণীশ ঘটক ও মা ধরিত্রী দেবীর বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার আর কাকা ঋত্বিক ঘটকের ছিন্নমূল মানুষের প্রতি আর্তি সাথে নিয়ে—তিনি শেষ পর্যন্ত নিজেকে বিলীন করেছিলেন প্রান্তিক মানুষের ধুলোবালি মাখা মেঠোপথে।

মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যিক নন্দনতত্ত্ব ছিল মূলত এক ‘রাজনৈতিক শরীর’ (Political Body)। তাঁর কাছে আদিবাসী নারী কেবল নিপীড়নের বিষয় নয়, বরং শ্রেণি, জাতি ও লিঙ্গ—এই ত্রিবিধ শোষণের বিরুদ্ধে এক জীবন্ত ইশতেহার। তাঁর কালজয়ী গল্প ‘দ্রৌপদী’-তে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে নারীর দেহ রাষ্ট্র ও পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার যুদ্ধের ময়দান হয়ে ওঠে। ১৯৭১-এর নকশাল আন্দোলনের পটভূমিতে গল্পের নামচরিত্র সাঁওতাল রমণী ‘দোপদী মেঝেন’ ও তাঁর স্বামী দুলাল মাঝি ‘অপারেশন বাকুলি’ থেকে বাঁচতে ‘উপী মেঝেন ও মাতং মাঝি’ছদ্মনাম নিয়ে আত্মগোপন করেন। কিন্তু সোমাই আর বধুনা হারামির মতো সহযোদ্ধাদের বিশ্বাসঘাতকতায় দোপদী গ্রেপ্তার হওয়ার পর গল্পটি রাষ্ট্রীয় শোষণের এক নগ্ন দলিল হয়ে ওঠে। সেনানায়কের নির্দেশে তাঁর ওপর চালানো হয় নির্মম রাষ্ট্রীয় যৌন সহিংসতা। মহাশ্বেতা এখানে ‘বানিয়ে নেওয়া’-র মতো একটি আপাত-নরম শব্দবন্ধের আড়ালে রাষ্ট্রীয় ধর্ষণের বীভৎসতাকে উন্মোচিত করেছেন। এই শব্দের মাধ্যমে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ রাষ্ট্র যখন কোনো প্রতিরোধের কণ্ঠস্বরকে দমন করতে পারে না, তখন সে নারীর শরীরকে রক্তাক্ত করাকেও একটি সাধারণ ‘প্রশাসনিক কাজ’বা সাজগোজের মতো তুচ্ছ বিষয়ে নামিয়ে আনে। এখানে ধর্ষণ কেবল লালসা নয়, বরং তা অবাধ্যতাকে স্তব্ধ করার এক পরিকল্পিত রাজনৈতিক অস্ত্র।

​এখানেই মহাশ্বেতা দেবীর দার্শনিক শ্রেষ্ঠত্ব। পুরাণের দ্রৌপদীকে রক্ষার জন্য দেবতা ছিলেন, কিন্তু মহাশ্বেতার দোপদী একা ও অনন্যা। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘Can the Subaltern Speak?’-এ দেখিয়েছেন যে সাবঅল্টার্ন বা নিম্নবর্গীয় নারী প্রায়শই প্রতিনিধিত্বের বাইরে থেকে যায়। কিন্তু মহাশ্বেতার দোপদী সেই নীরব সত্তা নয়; সে তার ভাষাহীন শরীরকেই ভাষায় রূপান্তরিত করে। নির্যাতনের পর যখন তাকে পোশাক পরতে বলা হয়, তখন সে নগ্ন শরীর নিয়েই সেনানায়কের চোখে চোখ রেখে দাঁড়ায় এবং প্রশ্ন করে— “তুমি আমাকে খুলে ফেলতে পারো, কিন্তু আবার কীভাবে পোশাক পরাবে?” দোপদীর এই উলঙ্গতা লজ্জার নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের তথাকথিত ‘সভ্যতা’ ও ‘শাসনতন্ত্রের’ ভণ্ডামিকেই উল্টো নগ্ন করে দেয়ার এক প্রতি-সহিংসতা (Counter-violence)।

​এই বৌদ্ধিক লড়াইয়ের সমান্তরালে মহাশ্বেতা দেবী বাংলা গদ্যে এক আমূল ‘ভাষার বিপ্লব’ ঘটিয়েছিলেন। তিনি তথাকথিত অভিজাত ও মসৃণ ভাষার বেড়াজাল ভেঙে লোধা, শবর ও মুণ্ডাদের কর্কশ কিন্তু প্রাণবন্ত কথ্য ভাষাকে সাহিত্যের প্রধান বয়ানে নিয়ে আসেন। তাঁর গদ্যে অরণ্যের রুক্ষতা আছে, আছে শোষিতের ঘামের গন্ধ। তিনি গেজেটিয়ার, পুলিশি নথি এবং লোকগাথাকে যেভাবে ফিকশনের শরীরে আর্কাইভাল দলিল হিসেবে গেঁথেছেন, তা বিশ্বসাহিত্যে বিরল। তাঁর 'ঝাঁসীর রাণী' রচনার মধ্য দিয়ে প্রথাগত ইতিহাসকে চ্যালেঞ্জ জানানো থেকে শুরু করে 'অরণ্যের অধিকার'-এ বিরসা মুণ্ডার লড়াইকে লোকগাথায় সাজানো—সবই ছিল বঞ্চনার ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ। আজ যখন বিশ্বজুড়ে ‘ক্লাইমেট জাস্টিস’ বা জলবায়ু বিচারের দাবি জোরালো হচ্ছে, তখন তাঁর অরণ্য-কেন্দ্রিক দর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ— প্রতিটি জাতীয় সংকটে তাঁর কলম ছিল সক্রিয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াকু মানুষদের প্রতি তাঁর অদম্য সমর্থন বিশ্বমঞ্চে সেই সংগ্রামের এক অসামান্য দলিল।

তবে মহাশ্বেতা দেবীর জীবনের শ্রেষ্ঠতম সার্থকতা ছিল লোধা-শবরদের ‘মা’ হয়ে ওঠে। এটি কোনো আলঙ্কারিক সম্বোধন ছিল না, ছিল এক আজন্ম লালিত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি তাঁর আয়ের একটি বড় অংশ ব্যয় করেছেন এই ব্রাত্যজনদের আইনি লড়াই ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে। পুরুলিয়ার রুক্ষ মাটিতে তিনি তাঁদের জন্য ‘খেড়িয়া শবর কল্যাণ সমিতি’ গড়ে তোলেন। জ্ঞানপীঠ, ম্যাগসেসে কিংবা পদ্মবিভূষণের উজ্জ্বল স্বর্ণপদকের চেয়েও তাঁর কাছে অনেক বেশি মূল্যবান ছিল ক্ষুধার্ত এক শবর শিশুর অকৃত্রিম হাসি।

বিশ্বসাহিত্যের আঙ্গিনায় টনি মরিসন কিংবা গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের পাশে মহাশ্বেতা দেবী আজ এক অনন্য স্বর। চিনুয়া আচেবে যেমন আদিবাসী সংস্কৃতির বিনাশকে তুলে ধরেছিলেন, মহাশ্বেতা দেবী তেমনি দেখিয়েছেন যে, উন্নয়ন যদি অন্তিম সারির মানুষকে স্পর্শ না করে, তবে তা উন্নয়ন নয়, বরং শোষণ। বর্তমানের এই করপোরেট আগ্রাসন আর ভূমি উচ্ছেদের ফলে বিশ্বজুড়ে যখন আমাজন থেকে ফিলিস্তিন পর্যন্ত প্রান্তিক মানুষ বিপন্ন, তখন মহাশ্বেতা দেবী কেবল প্রাসঙ্গিক নন, বরং অপরিহার্য। এমনকি আজকের বাংলাদেশের মানবাধিকার ও পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়েও তাঁর আদর্শ এক অবিনাশী ধ্রুবতারা।

মহাশ্বেতা দেবী কোনো স্থির ইতিহাস নন, বরং তিনি এক প্রবহমান চেতনা। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে, প্রকৃত বিদ্রোহ কেবল অস্ত্রের আস্ফালন নয়, বরং তা এক অপরাজেয় মানবিক বোধ। তাঁর জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়ে আমাদের অঙ্গীকার হোক—যতদিন পৃথিবীতে বঞ্চনা থাকবে, যতদিন প্রান্তিক মানুষের নিঃশব্দ হাহাকার আকাশ ছুঁতে চাইবে, ততদিন মহাশ্বেতা দেবীর শাণিত লেখনীই হবে আমাদের প্রতিরোধের ভাষা। তিনি সেই প্রজ্জ্বলিত মশাল, যা নিভে গিয়েও অন্ধকার চিরে এগোবার চিরন্তন সাহস দিয়ে যায় আমাদের উত্তরকালকে। কালরাত্রির শেষে তিনি সেই শুকতারা, যা ভোরের সূর্যকে নিয়ে আসার এক অবিনাশী বারতা।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজজি/নাসি  

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers