শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ২৭ চৈত্র ১৪৩২ , ২২ শাওয়াল ১৪৪৭

সাহিত্য
  >
প্রবন্ধ

পূর্ণেন্দু পত্রীঃশেকড় সন্ধানী চিরকলীন পথিক

বাহাউদ্দিন গোলাপ ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২৬, ১০:৫৪:১৮

328
  • পূর্ণেন্দু পত্রীঃশেকড় সন্ধানী চিরকলীন পথিক

গত দুই ফেব্রুয়ারি ছিল পূর্ণেন্দু পত্রীর জন্মদিন তাঁর জন্মদিনে নিউজজির পক্ষ থেকে অশেষ শ্রদ্ধা 

কালের অনিমেষ যাত্রায় যখন কোনো জনপদের সংস্কৃতি ও নন্দনতত্ত্ব জীর্ণতায় নুয়ে পড়ে, তখনই মহাকালের ইশারায় ধরণীতে আবির্ভাব ঘটে এমন এক ঋষিতুল্য আলোক-পথিকের, যাঁর আঙুলের ছোঁয়ায় নিষ্প্রাণ রেখারা কথা বলে ওঠে এবং প্রতিটি বর্ণমালা হয়ে ওঠে এক-একটি মরমী মহাকাব্য। পূর্ণেন্দু পত্রী ছিলেন সেই বিরল প্রতিভার নাম, যিনি কেবল একজন শিল্পী বা কবি হিসেবে নয়, বরং একাধারে দ্রষ্টা ও স্রষ্টা হিসেবে রেখা ও শব্দের সমান্তরাল এক মায়াবী ভূগোলে বাঙালির আধুনিকতাকে নতুন করে প্রাণদান করেছিলেন। ১৯৩১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হাওড়ার নাকড়দহ গ্রামের এক মধ্যবিত্ত শিকড় থেকে যখন তিনি অঙ্কুরিত হচ্ছেন, বিশ্ব তখন এক মহাপ্রলয়ের পদধ্বনি শুনছে। তাঁর শৈশব ও কৈশোর গড়ে উঠেছিল মহামন্দা আর সাম্রাজ্যবাদের থমথমে আবহে, যেখানে বেঁচে থাকাই ছিল এক চরম শিল্প।

​দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই লেলিহান শিখা আর পঞ্চাশের মন্বন্তরের হাহাকার তাঁর কিশোর মনে যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল, তারই ছায়া আমরা পরবর্তীকালে তাঁর রেখা ও ছন্দের বিষণ্ণতায় খুঁজে পাই। দেশভাগের সেই রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডি আর শিকড়হীন মানুষের দীর্ঘশ্বাস তাঁর চেতনার ক্যানভাসকে আমূল বদলে দিয়েছিল। ১৯৪৯-৫০ সালের সেই উত্তাল ছাত্রজীবন, যখন বামপন্থী সক্রিয়তার কারণে প্রেসিডেন্সি জেল আর বক্সা ক্যাম্পের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে তাঁকে দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়েছিল, সেই কারাবাসই মূলত তাঁর শিল্পের মেরুদণ্ড গড়ে দিয়েছিল। রাজনীতির প্রচারধর্মী দেয়াল থেকে বেরিয়ে তিনি যখন শিল্পের অবারিত স্বাধীনতাকে খুঁজছিলেন, তখনই ১৯৫১ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একুশ’ এক নতুনের ঘোষণা নিয়ে হাজির হয়। এই বইয়ের প্রচ্ছদটি ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম বিমূর্ত নন্দনতাত্ত্বিক ইশতেহার।

কারামুক্ত এই তরুণের প্রতিভার সেই তেজই সিগনেট প্রেসের কর্ণধার ডি. কে. গুপ্তকে মুগ্ধ করেছিল, যা ছিল আভিজাত্যের কেন্দ্রে পত্রীর প্রবেশের এক আশ্চর্য শৈল্পিক সেতুবন্ধন। তবে নন্দনতত্ত্বের এই পথচলা সবসময় মসৃণ ছিল না। ডি. কে. গুপ্তের ‘পাশ্চাত্য আভিজাত্য’ বনাম পত্রীর ‘দেশজ আধুনিকতা’র এক ঐতিহাসিক সংঘাত ১৯৫৮ সালে তাঁকে সিগনেট ত্যাগ করতে বাধ্য করে। পত্রী বিশ্বাস করতেন— "শিল্পের কাজ কেবল চোখকে তৃপ্ত করা নয়, বরং মনের গহীনে এক অশান্ত আলোড়ন তৈরি করা।" এরপর তাঁর জীবনে শুরু হয় এক কঠিন দহনকাল। ব্রিটিশ বিজ্ঞাপনী সংস্থা ‘ডিজে কিমার’ (DJ Keymer)-এ কাজের অভিজ্ঞতা এবং সেই সাথে ‘সত্যযুগ’ পত্রিকায় সাংবাদিকতা ও ‘আকাশবাণী’ রেডিওর অনিশ্চিত সংগ্রামী জীবনই তাঁকে পরবর্তীকালে ‘আনন্দ পাবলিশার্স’-এর বিশ্বমানের স্বতন্ত্র শৈলী তৈরিতে সাহায্য করেছিল।

প্রচ্ছদ নির্মাণে তিনি প্রথাগত পদ্ধতির ধার ধারতেন না। সার্জিক্যাল ব্লেড বা স্কার্পেল দিয়ে কালো বোর্ড আঁচড়ে ‘স্ক্র্যাচ-বোর্ড’ পদ্ধতিতে ছবি আঁকার যে অনবদ্য প্রয়োগ তিনি ঘটিয়েছিলেন, তা ছিল এক সাহসী কারিগরি বিদ্রোহ। এই জেদ এতটাই প্রবল ছিল যে, তীক্ষ্ণ ব্লেড দিয়ে বছরের পর বছর কালো বোর্ড আঁচড়ে ছবি আঁকতে আঁকতে তাঁর ডান হাতের আঙুলের ছাপ পর্যন্ত ক্ষয়ে গিয়েছিল। এটি নিছক শারীরিক ক্ষয় ছিল না, বরং শিল্পের প্রতি তাঁর আত্মিক নিবেদনের এক চরম দালিলিক সাক্ষ্য। তিনি বলতেন— “রেখা যখন হৃদয়ের রক্ত দিয়ে আঁকা হয়, তখন তা আর কেবল রেখা থাকে না, তা হয়ে ওঠে আত্মার মানচিত্র।” তাঁর এই সংগ্রাম বিশ্বসাহিত্যের উইলিয়াম ব্লেকের সেই স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্পীসত্তার কথা মনে করিয়ে দেয়, যিনি একইসাথে কলম আর তুলির জাদুকর ছিলেন।

কেবল বইয়ের প্রচ্ছদ নয়, বিজ্ঞাপনের লে-আউট এবং সিনেমার টাইটেল কার্ড ডিজাইনেও তিনি এক নতুন দৃশ্যভাষার জন্ম দিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক গ্রাফিক ডিজাইনের জনক শল ব্যাস যেভাবে ‘মিনিমালিস্ট গ্রাফিক’ ব্যবহার করতেন, পূর্ণেন্দু পত্রী সেখানে যুক্ত করেছিলেন দেশজ ক্যালিগ্রাফিক অলংকরণ। এটি তাঁর কাজকে বিশ্বজনীন আধুনিকতার মাঝেও বাংলার মাটি ও মানুষের ঘ্রাণে সিক্ত করেছিল। তাঁর এই শৈলী সমসাময়িক সত্যজিৎ রায়ের ধ্রুপদী 'রায়েমান' ফন্টের বিপরীতে এক স্বতন্ত্র লিরিক্যাল আধুনিকতার জন্ম দিয়েছিল। সাহিত্যিক হিসেবে ১৯৭৪ সালের যুগান্তকারী কাব্যগ্রন্থ ‘কথোপকথন’-এর মাধ্যমে তিনি কবিতায় এক মেদহীন ‘মিনিমালিস্ট’ সংলাপ-ধর্মী ভাষা তৈরি করেন, যা মানুষের চিরন্তন অস্তিত্বের সংকট ও একাকীত্বের বিরুদ্ধে এক শৈল্পিক প্রতিবাদ।

​চলচ্চিত্রকার হিসেবে তাঁর ‘স্ত্রী’ এবং ‘মালঞ্চ’ বাংলা চলচ্চিত্রে ‘কাব্যিক বাস্তববাদ’ ও এক ‘দৃশ্য-কবিতার’ (Visual Poetry) জন্ম দিয়েছিল। যদিও তাঁর চলচ্চিত্রের সংলাপে কিছুটা অতিরিক্ত কাব্যিক আতিশয্য ছিল, কিন্তু ক্যামেরার লেন্সকে তিনি ব্যবহার করতেন তুলির মতো, যেখানে ‘ফ্রিজ ফ্রেম’ হয়ে উঠত একেকটি অনন্য চিত্রপট। আশির দশকে যখন রক্ষণশীলরা তাঁকে আক্রমণ করেছিলেন, তিনি তাঁর আকর গ্রন্থ ‘রবীন্দ্র-চিত্রকলা’-র মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের পাণ্ডুলিপির সেই রহস্যময় ‘কাটাকুটি থেকে চিত্রকল্প’ বা ‘ডুডল টু আর্ট’ (Doodle to Art) তৈরির গূঢ় রহস্য উন্মোচন করেন। এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে তিনি বলেছিলেন— “রবীন্দ্রনাথের কাটাকুটি আসলে তাঁর অবচেতনের এক সুশৃঙ্খল বিদ্রোহ, যেখানে অন্ধকার থেকে আলো ফুটে বেরোচ্ছে।” এই গ্রন্থে তাঁর ‘অ্যান্ড্রোজিনি’ এবং ‘আদিম আঁধার’-এর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রথাগত রবীন্দ্র-নন্দনতত্ত্বকে আমূল নাড়িয়ে দিয়েছিল।

বিশ্বসাহিত্যের লোরকা বা নেরুদার মতো তিনিও ছিলেন শেকড় সন্ধানী এক চিরকালীন পথিক। লোরকা যেমন স্প্যানিশ মেঠো সুরকে আধুনিক কবিতায় রূপান্তর করেছিলেন, পত্রীও তেমনই বাংলার লোকজ নকশাকে বিশ্বমানের গ্রাফিক্সে উন্নীত করেছিলেন। বর্তমানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যান্ত্রিক যুগে যেখানে পিক্সেল আজ শিল্পকে শাসন করতে চাইছে, সেখানে পূর্ণেন্দু পত্রীর হাতের আঙুল ক্ষয়ে যাওয়ার সেই অ্যানালগ সংগ্রামই শিল্পের এক সুগভীর নৈতিক প্রতিবাদ। পূর্ণেন্দু পত্রী কেবল একটি নাম নন, বরং তিনি একটি সচল ও জীবন্ত নন্দনতাত্ত্বিক মহাকাব্য। তাঁর জীবনদর্শন ছিল স্পষ্ট— “শিল্পীর পরাজয় নেই, যদি সে নিজের শেকড়কে বিস্মৃত না হয়।”

আজ যখন আমরা তাঁর সৃজনবিশ্বের দিকে তাকাই, তখন বুঝতে পারি যে শিল্পী তাঁর কর্মে নয়, বরং শিল্পের প্রতি তাঁর ব্যাকুল আর্তিতেই বেঁচে থাকেন। ১৯৯৭ সালের ১৯ মার্চ কলকাতার এক নিভৃত দুপুরে তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটলেও, তিনি জানতেন—শেকড় যত গভীর হয়, শিল্পের আকাশ ততটাই অবারিত হয়ে ওঠে। পূর্ণেন্দু পত্রী সেই বিরল আলোকপথিক, যিনি মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরেও আমাদের চেতনার আকাশে এক অবিনাশী ধ্রুবতারার মতো ভাস্বর হয়ে আছেন; কারণ যতদিন মানুষের অন্তরে সুন্দরের জন্য পিপাসা আর স্বপ্নের জন্য হাহাকার থাকবে, ততদিন তিনি আমাদের প্রতিটি নিশ্বাসে এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা হয়ে নিভৃতে কথা বলে যাবেন।

লেখক: কলামিস্ট, সংস্কৃতি কর্মী।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers