শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ২৭ চৈত্র ১৪৩২ , ২২ শাওয়াল ১৪৪৭

সাহিত্য
  >
প্রবন্ধ

জীবনানন্দ ও আমাদের বিপন্ন অস্তিত্বের হাহাকার

বাহাউদ্দিন গোলাপ ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬, ১৯:৫০:০৮

392
  • জীবনানন্দ ও আমাদের বিপন্ন অস্তিত্বের হাহাকার

১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর তীরের সেই ভিজে ঘাসের ঘ্রাণ মাখা জনপদে জন্ম নিয়েছিলেন বাংলা কবিতার নির্জনতম স্থপতি—জীবনানন্দ দাশ। আজ তাঁর ১২৭তম জন্মতিথি। মা কুসুমকুমারী দাশের কাব্যিক সান্নিধ্যে যাঁর শৈশব কেটেছিল, সেই জীবনানন্দই পরবর্তীতে রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা কবিতার আকাশে এক ধূসর নক্ষত্র হয়ে উদিত হন। তিনি কেবল কলম ধরেননি, বরং শব্দের শরীরে বুনে দিয়েছিলেন কুয়াশার কারুকাজ, মরা শালিখের ডানা আর কার্তিকের নবান্ন-হাহাকার। যে সময়ে রবীন্দ্র-প্রভাবের আভিজাত্যময় বলয় থেকে বেরিয়ে আসা ছিল প্রায় অসম্ভব, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে জীবনানন্দ আমাদের শুনিয়েছিলেন এক সম্পূর্ণ নতুন ও অতিপ্রাকৃত গান। সমকালীন সমালোচকদের ‘দুর্বোধ্য’ কিংবা ‘অশ্লীলতার’ তকমা উপেক্ষা করে তিনি একাই নির্মাণ করেছিলেন আধুনিকতার নিজস্ব এক ব্যাকরণ। তাঁর সেই মায়াবী আবহে আজও আমরা খুঁজে পাই ধানসিঁড়ি নদীর ম্লান বিষাদ, যা আজ হয়তো মৃতপ্রায় কোনো জলধারার মতো আমাদের জাতীয় স্মৃতির পাতায় ধুঁকছে।

জীবনানন্দের কবিতা আমাদের অভ্যস্ত চোখের সামনে এক মায়াবী কুয়াশার পর্দা টেনে দেয়, যেখানে চেনা জগতটাই হয়ে ওঠে অচেনা এক বিস্ময়। তাঁর কাছে প্রকৃতি কেবল সুন্দরের আধার নয়, বরং তা এক আদিম ও অমোঘ নিয়তি। তিনি যখন ‘রূপসী বাংলা’র কথা বলেন, তখন তা কেবল মানচিত্রের সীমানায় আবদ্ধ থাকে না; শঙ্খচিল, বুনো হাঁস কিংবা কলমি লতার ভেতরে তিনি খুঁজে পান এক অবিনশ্বর কামনার আখ্যান। তাঁর বর্ণনায় অন্ধকারেরও এক রূপ আছে—বিদিশার নিশার মতো গভীর সেই অন্ধকার আমাদের ক্লান্ত আত্মাকে শীতলপাটির মতো জড়িয়ে ধরে। আধুনিক জীবনের সমস্ত কোলাহল আর কৃত্রিমতাকে ছাপিয়ে তিনি মানুষের হৃদয়ে এক ‘বিপন্ন বিস্ময়’কে আবিষ্কার করেছিলেন। সেই বিস্ময় আমাদের শেখায় যে— প্রেম, নারী, শিশু কিংবা গৃহের নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের বাইরেও মানুষের ভেতরে এক অসীম শূন্যতা খেলা করে। তাঁর মৃত্যুর পর সেই বিখ্যাত 'ট্রাঙ্ক' থেকে আবিষ্কৃত হওয়া রাশি রাশি পাণ্ডুলিপি আমাদের বিস্মিত করে; যেখানে ‘মাল্যবান’ বা ‘সুতীর্থ’-র মতো উপন্যাসগুলো মানুষের অবদমিত মনস্তত্ত্ব আর নাগরিক জীবনের হাহাকারকে এক অমোঘ নির্লিপ্ততায় চিত্রিত করেছে।

হাজার বছরের ক্লান্ত এক পথিকের মতো জীবনানন্দ হেঁটে গেছেন ইতিহাসের ধুলোমাখা পথে। আসিরিয়া, ব্যাবিলন কিংবা মিশরের মৃত সভ্যতার পাণ্ডুলিপি থেকে তিনি তুলে এনেছেন সময়ের হাড়-কঙ্কাল। তিনি বাংলা কবিতায় সূক্ষ্মভাবে বুনে দিয়েছিলেন পরাবাস্তববাদের (Surrealism) সেই মায়াজাল, যেখানে স্বপ্ন ও বাস্তবতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তাঁর উপমা আর চিত্রকল্পের বুনন ছিল এতটাই শক্তিশালী যে, তা কেবল পাঠ করা যায় না, বরং ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করা যায়। ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ’ কিংবা ‘শিশিরের শব্দের মতো সন্ধ্যা’-র মতো শব্দবন্ধগুলো বাংলা ভাষার আভিজাত্যকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা সমকালীন বিশ্বসাহিত্যের মননশীলতাকে স্পর্শ করে। বুদ্ধদেব বসুর ভাষায় তিনি ছিলেন সেই ‘শুদ্ধতম কবি’, যিনি শব্দকে রক্তমাংসের অতীত এক অলৌকিকতা দান করেছিলেন। জীবনানন্দের মৃত্যুচেতনা ছিল অত্যন্ত গভীর; তাঁর কাছে মৃত্যু বিনাশ নয়, বরং এক শান্ত নীলিমায় বিলীন হওয়া, যা আধুনিক মানুষের অস্তিত্ববাদী সংকটকে উন্মোচিত করে। ক্লিনটন বি সিলির মতো গবেষকদের নিরলস প্রচেষ্টায় তাঁর এই মহাজাগতিক একাকীত্ব আজ বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ।

কবির ব্যক্তিগত জীবন ছিল তীব্র দারিদ্র্য আর অভিমানে মোড়ানো, যা মৃত্যুর পরেও তাঁকে ছায়ার মতো অনুসরণ করছে। বরিশালের বগুড়া রোডের সেই পৈতৃক ভিটে আজ কবির স্মৃতির চেয়েও বেশি দখলদারিত্বের ভারে নুয়ে পড়া এক বিমর্ষ কঙ্কাল। যে উঠোনে কবি প্রথম শিশিরভেজা ঘাস দেখেছিলেন, সেখানে আজ নেই কোনো সুস্মিত সংরক্ষণের চিহ্ন; বরং এক অদ্ভুত বিস্মৃতির অন্ধকারে তলিয়ে গেছে তাঁর ফেলে আসা ভিটেবাড়ির শেষ চিহ্নটুকুও। ধানসিঁড়ি নদীর ম্লান স্রোতের মতোই আমাদের অবহেলায় ধুঁকছে কবির শৈশবের সেই আঙিনা, যা আজ কেবল নামফলক আর মৌখিক শ্রদ্ধায় সীমাবদ্ধ। কবির স্মৃতি সংরক্ষণের এই সমষ্টিগত ব্যর্থতা আমাদের জাতীয় চেতনার সেই দীনতাকেই ফুটিয়ে তোলে, যেখানে আমরা নক্ষত্রকে ভালোবাসি ঠিকই, কিন্তু তাঁর মাটির শিকড়কে আগলে রাখতে ভুলে যাই। তাঁর পৈত্রিক ভিটেটির ভগ্নদশা আর দখল হয়ে যাওয়া ভূমি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা জীবনানন্দকে পাঠ করি কিন্তু ধারণ করি না। কবির স্মৃতি আগলে রাখার এই দীর্ঘশ্বাস যেন তাঁর সেই ‘বিপন্ন বিস্ময়’ কবিতাটির এক করুণ বাস্তব সংস্করণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

জীবনানন্দের ব্যক্তিজীবন ছিল এক সংক্ষুব্ধ সমুদ্রের মতো, যেখানে বারবার আছড়ে পড়েছে বেকারত্ব, একাকীত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ঢেউ। তিনি যখন কলকাতার ফুটপাত ধরে ট্রামের শব্দ শুনতে শুনতে উদ্দেশ্যহীন হেঁটে বেড়াতেন, তখন আসলে তিনি নিজের ভেতরেই এক আদিম অরণ্যকে খুঁজতেন। তাঁর কাব্যসত্তায় কেবল নিসর্গ ছিল না, ছিল সমকালীন ইতিহাস ও বিশ্বযুদ্ধোত্তর সংকটের প্রখর ছাপ। ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার বালিগঞ্জে সেই রহস্যময় ট্রাম দুর্ঘটনা—যা আট দিন পর ২২ অক্টোবর তাঁর জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দেয়—তা আজও সাহিত্যিক মহলে এক অমীমাংসিত প্রশ্ন। আজ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জৌলুস আর প্রযুক্তির রুক্ষ গতির চাপে মানুষের সংবেদনশীলতা চরম সংকটে, যখন সোশ্যাল মিডিয়ার অজস্র কৃত্রিম ভিড়েও মানুষ আজ চূড়ান্তভাবে একা, তখন জীবনানন্দের সেই ‘নির্জনতম’ কণ্ঠস্বর আমাদের পরম সান্ত্বনা হয়ে দাঁড়ায়। ডিজিটাল নিঃসঙ্গতার এই যুগে, যখন জলবায়ুর বিপন্নতায় আমাদের চেনা প্রকৃতি হারিয়ে ফেলছে তার শাশ্বত ঘ্রাণ, তখন কবির ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ আমাদের প্রাণের নিগূঢ় মায়া শেখায়।

তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে অগ্রগামী এক দ্রষ্টা, যিনি আমাদের অস্তিত্বের গূঢ়তম মহাকাব্যটি লিখে গেছেন কুয়াশার হরফে। তাঁর সৃষ্টিতে মৃত্যু বিনাশ নয়, বরং এক অনন্ত নক্ষত্রবীথিতে বিলীন হওয়ার আনন্দ। জীবনানন্দ দাশ কোনো এক অতীতকালের কবি নন, বরং তিনি আমাদের প্রতিদিনের হাহাকার আর নিভৃত প্রার্থনার নাম। যতদিন ঘাসের ওপর ভোরের শিশির ঝরবে, যতদিন হেমন্তের মাঠে কুয়াশার মায়াজাল বিছানো থাকবে, ততদিন এই রূপসী বাংলার প্রতিটি ধূলিকণায় তিনি বেঁচে থাকবেন এক অবিনশ্বর ঘ্রাণ হয়ে। জীবনানন্দ কোনো নাম নয়; তিনি আমাদের চেতনার সেই নীল কুয়াশা, যা ভোরের আলো আসার আগেই হৃদয়ের আঙিনায় মায়া বিছিয়ে দেয়। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন—আমাদের বুকের ভেতর বয়ে চলা এক নিভৃত ধানসিঁড়ি হয়ে।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers