বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩ , ১ মুহররম ১৪৪৮

সাহিত্য
  >
প্রবন্ধ

সীমানার অতীত এক পথিক: যান্ত্রিক যুগে রবীন্দ্র-চেতনা ও পঁচিশে বৈশাখ

বাহাউদ্দিন গোলাপ মে ৮, ২০২৬, ১৭:৪৮:৩০

506
  • সীমানার অতীত এক পথিক: যান্ত্রিক যুগে রবীন্দ্র-চেতনা ও পঁচিশে বৈশাখ

পঁচিশে বৈশাখ কেবল পঞ্জিকার পাতায় ঘেরা কোনো শুষ্ক তারিখ নয়, বরং এটি বাঙালির আত্মিক মানচিত্রের সেই অমোঘ মুহূর্ত—যখন মহাকালের ললাটে এক চন্দনের তিলক এঁকে দিয়েছিল এক জ্যোতির্ময় প্রাণ। ১৮৬১ সালের ৭ মে (১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে যে স্পন্দনের সূচনা হয়েছিল, তা আজ দেড়শ বছর পেরিয়েও এক নিরন্তর বহমান ব্রহ্মপুত্রের মতো বিশ্ব-সংস্কৃতির তটে আছড়ে পড়ছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল একজন কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক 'বিশ্বপথিক'। আজকের এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতা আর যান্ত্রিক একাকীত্বের যুগে রবীন্দ্রনাথ কেবল এক নস্টালজিয়া নন; বরং তিনি আমাদের ‘অ্যালগরিদম-নির্ভর’জীবনবোধের বিরুদ্ধে এক সশব্দ কুঠারাঘাত। পঁচিশে বৈশাখ আমাদের সেই ঋতুহীন বসন্তের ডাক দেয়, যা জরাগ্রস্ত পৃথিবীর ধূলিকণায় অমৃতের ছিটে দেয়।

রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা কোনো নিরাপদ শান্তিবাদ ছিল না, বরং তা ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক সাহসী বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। ১৯১৬ সালে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের উন্মত্ততায় বিশ্ব কাঁপছে, তখন জাপান ও আমেরিকায় প্রদত্ত তাঁর ‘ন্যাশনালিজম’ বিষয়ক বক্তৃতাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি জাতীয়তাবাদকে ‘এক ভৌগোলিক স্বার্থপরতা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তাঁর এই অবস্থান আজ আবারও প্রাসঙ্গিক, যখন বিশ্বজুড়ে উগ্র জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থান ঘটছে। ১৯১৯ সালের মে মাসে জালিয়ানওয়ালাবাগের নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডকে লেখা তাঁর 'নাইটহুড' বর্জনের পত্রটি আজও বিশ্ব নাগরিক সমাজের সর্বোচ্চ নৈতিক প্রতিরোধের দালিলিক স্মারক। মহাত্মা গান্ধীর সাথে তাঁর যে আদর্শিক দ্বৈরথ—চরকা বনাম যান্ত্রিক প্রগতি—তা আসলে ছিল আধুনিকতাকে দেখার দুই ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত, যেখানে রবীন্দ্রনাথ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তিকেই যান্ত্রিকতার উপরে স্থান দিয়েছিলেন।

গবেষণার এক বিস্ময়কর অথচ নিভৃত দিক হলো তাঁর গ্রামীণ উন্নয়ন ও সমাজতাত্ত্বিক অবদান। পতিসর ও শিলাইদহে জমিদারি পরিচালনার সময় তিনি যে কৃষি ব্যাংক ও সমবায় ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন, তা ছিল আধুনিক ‘মাইক্রো-ক্রেডিট’ বা ক্ষুদ্রঋণ ধারণার এক সার্থক পূর্বসূরি। ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কারের পুরো অর্থ তিনি পতিসরের সেই কৃষি ব্যাংকেই বিনিয়োগ করেছিলেন—এই ঐতিহাসিক তথ্যটি প্রমাণ করে যে তিনি কেবল ভাববাদী কবি ছিলেন না, ছিলেন এক দূরদর্শী সমাজসংস্কারক। ১৯৩০ সালের সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণেও তাঁর এই দ্বান্দ্বিক সত্তা প্রখর ছিল; ‘রাশিয়ার চিঠি’তে তিনি সেখানকার গণশিক্ষার প্রশংসা করলেও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যহীনতার বিষয়ে যে অমোঘ হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, তা আজ উত্তর-সত্যের (Post-truth) যুগে ব্যক্তি-স্বাধীনতার এক অনন্য দলিল।

তাঁর সাহিত্য, সংগীত ও চিত্রকলা আসলে তাঁর জীবনদর্শনেরই ভিন্ন ভিন্ন রূপ। রবীন্দ্রনাথের গান কেবল সুর নয়, বরং তা এক স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনদর্শন—যা মানুষের বিষাদকে প্রার্থনায় রূপান্তর করে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে প্রথাগত ভারতীয় শিল্পের ধারা বদলে দিয়ে তিনি যে রহস্যময় বিমূর্তায়নের জন্ম দিয়েছিলেন, তা আজ বিশ্বশিল্পের ইতিহাসে ‘হাই-মডার্নিজম’-এর অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি বিজ্ঞানের সাথে তাঁর সখ্য ছিল পরম বিস্ময়কর। ১৯৩০ সালের জুলাই মাসে জার্মানির ক্যাপুথে আলবার্ট আইনস্টাইনের সাথে তাঁর সেই ঐতিহাসিক সংলাপটি আজও দর্শন ও পদার্থবিদ্যার এক অমীমাংসিত রোমাঞ্চ; যেখানে তিনি বাস্তবের আপেক্ষিকতা ও মানুষের চেতনার সংযোগ নিয়ে আধুনিক কোয়ান্টাম ফিজিক্সের সমান্তরাল যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত ‘বিশ্বপরিচয়’ গ্রন্থে তিনি যেভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও আণবিক বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্বকে ব্যাখ্যা করেছিলেন, তা তাঁর গভীর বিজ্ঞানমনস্কতার পরিচয় দেয়।

​রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা-দর্শন ছিল গতানুগতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক নান্দনিক বিদ্রোহ। ১৯২১ সালে শান্তিনিকেতনে 'বিশ্বভারতী' প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি ‘যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্’ দর্শনের অবতারণা করেছিলেন। এই বৈদিক মন্ত্রটির সহজ মর্মার্থ হলো—“যেখানে পুরো পৃথিবীটাই একটি পাখির বাসার মতো নিরাপদ নীড়ে পরিণত হয়”। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন এক শিক্ষা-আঙিনার, যেখানে মানচিত্রের কাঁটাতার মুছে যাবে এবং সারা বিশ্বের জ্ঞান ও সংস্কৃতি এসে মিলবে এক অখণ্ড মোহনায়। নারী জাগরণের ক্ষেত্রেও তাঁর কলমে ফুটে ওঠা প্রতিটি নারী চরিত্র ছিল সাহসী ও স্বতন্ত্র। ‘রক্তকরবী’বা ‘মুক্তধারা’র মতো নাটকে তিনি যন্ত্রের দাপটে মানুষের বন্দিত্ব ও প্রকৃতির প্রতিশোধকে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা বর্তমান জলবায়ু সংকটের যুগে ‘ইকো-ক্রিটিসিজম’ গবেষণায় এক বিস্ময়কর পূর্বানুমান।

পঁচিশে বৈশাখ আমাদের সেই মোহনায় নিয়ে দাঁড় করায়, যেখানে সময় ও অনন্ত একে অপরের হাত ধরে। তিনি ছিলেন সেই মহীরুহ, যাঁর শিকড় মাটির গভীরে প্রোথিত থাকলেও শাখাগুলো স্পর্শ করেছিল নক্ষত্রবীথিকে। ১৯৪১ সালে মহাপ্রয়াণের ঠিক আগে ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে তিনি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের জীর্ণতাকে ধিক্কার দিয়ে যে মানবিক আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন, তা আজও অন্ধকার সময়ে আমাদের প্রধান পাথেয়। আজকের এই পঁচিশে বৈশাখে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি রবীন্দ্রনাথকে কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় বন্দি করছি, নাকি তাঁর সেই ‘বিশ্বনাগরিক’ হওয়ার দুঃসাহস আমাদের এখনো আছে? রবীন্দ্রনাথ কোনো শেষ নয়, বরং এক চিরন্তন প্রারম্ভ—যিনি প্রতিদিন আমাদের হৃদয়ে নতুন করে জন্ম নেন।

লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers