মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ , ২ রবিউস সানি ১৪৪৮

সাহিত্য
  >
গল্প

সেই মেয়েটি (৪র্থ পর্ব)

পি. আর. প্ল্যাসিড সেপ্টেম্বর ২, ২০২১, ১৭:২৫:৫৪

3K
  • সেই মেয়েটি (৪র্থ পর্ব)

মনি উঠে গিয়ে একটা প্লাস্টিকের সাদা জগ নিয়ে এসে সামনে রাখে। সাথে বড় বাটিতে কিছু মাংস ভুনা। গারোদের নিজস্ব পদ্ধতিতে রান্না করা আরো কিছু খাবার।জগের ভিতর পানি মনে করে খালি গ্লাসে ঢালে ভাস্কর। মনি প্রশ্ন করে, এই তুমি যে এতটা ঢেলেসো, তুমি কি পুরোটা খাইতে পারবা?

  আমার গলা শুকিয়ে আছে। মনে হয় সুগার বেড়েছে। আগে একটু পানি খাওয়া দরকার।

  তোমার কি সোগারের সমস্যা আসে?

  আছে বলতে খুব বেশি সমস্যা আছে। স্বাস্থ্য তো আমার অর্ধেকের বেশি ভেঙ্গে গেছে, দেখছোনা? আমি এমনটা ছিলাম নাতো। গত একবছরে চেহারা ভেঙ্গে যা হয়েছে, নিজের কাছেই নিজের চেহারা দেখে খারাপ লাগে এখন।

  তুমি যে এটা নিছো এটা পানি নাতো, চ্যু। তুমি কি পানি খাইবা?

  আগে একটু পানি খেয়ে নেই।

  বসো একটু, আমি পানি নিয়া আসি।

  বলেই মনি উঠে যায় আবার ভিতরে পাশের ঘরে। পাশের ঘরে বিছানার পাশে ছোট টেবিলের উপর রাখা পানির জগ থেকে একটা কাঁচের গ্লাসে পানি ঢেলে নিয়ে আসে। আসার সময় বলে, ওরা ঘুমিয়ে গেছে। না ঘুমালে বসতেই পারতা না তুমি এখন।

  ওদের মার কথা তখন বলছিলে যে, ওদের মা কি বাড়িতে থাকে না? নাকি আবার বিয়ে হয়ে চলে গেছে অন্যের ঘরে? ভাস্কর প্রশ্ন করে।

সে অনেক কথা। আসছো যেহেতু, সবই জানতে পারবা। তুমি তো আমার জীবন সম্পর্কেও কোনো কিছু জানো না। বলবো সবই আস্তে আস্তে। বলে টেবিলের উপর পানির গ্লাস রেখে ঘুরে গিয়ে পাশে খালি জায়গায় বসে বলতে থাকে, ওদের মা ওদের আরো অনেক ছোট সময় রেখে চলে গেছে।

  চলে গেছে বলতে কি, আবার বিয়ে হয়েছে?

  ওর বাবার সাথে কোনো কারণে হয়তো

   মনি কথা আর শেষ করে না।  ভাস্কর বলে, তোমার স্বামী সম্পর্কেও তো আমি জানি না। বলে ডগ ডগ করে পানি খেয়ে ভাস্কর খালি গ্লাস টেবিলের উপর রাখে।

  আমার তিন ছেলে মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলেও বিয়ে করেছিল। ওরা যখন খুব ছোট তখন ওদের বাবা বাড়িতে খুব একটা আসতো না। ছেলেমেয়েরাও ওদের বাবাকে খুব বেশি মনে করতো না। মাঝে মধ্যে মন চাইলে ওদের দেখতে আসতো। পরে আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। আমি তখন একটা এনজিওতে চাকরি করতাম। সেই চাকরি করে এই ঘরটা করেছি। এটাই আমার সম্পদ। বড় মেয়েটা বিয়ের পর বিদেশ গিয়েছিল চাকরি করতে। তখন বড় মেয়েই কিছুটা সংসার দেখেছে।

  মনির কথা অগোছালো হলেও তার ভিতর যে অশান্তি কাজ করছে তার কথাতেই বোঝা যায়। ভাস্কর জানার জন্য আবার প্রশ্ন করে, তোমার স্বামীও কি এরপর আরেকটা বিয়ে করেছে?

  বিয়েতো কবেই করেছে।

  তোমার যেন কোথায় বিয়ে হয়েছিলো?

  বান্দরবন।

  তোমার স্বামী গারো ছিলো না?

  না, মার্মা।

ওরা খ্রিষ্টান না, বৌদ্ধ।

  বৌদ্ধ।

  তাহলে তোমাদের বিয়ে হয়েছিল কোন ধর্মমতে?

  আমাদের বিয়ে তো গির্জাতে হয় নাই।

  মনি বলার পর ভাস্কর তার নিজের বিয়ের কথা মনে করে। তার কাছে বিয়ে হলো মনের মিল। গির্জা মন্দির মসজিদের বিষয়টা তার কাছে প্রধান নয়। কথায় কথায় মনির ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে অনেক কিছুই শোনা হয়ে যায় ভাস্করের।

  ভাস্কর ভেবেছিল বাড়িতে আসলে সবাইকে হয়তো একসাথে পাবে। রাতভর স্বামী এবং ছেলেমেয়েদের নিয়ে গল্প করবে আর চ্যু খাবে কিন্তু মনির কথা শুনে অনেকটা চুপসে যায় সে। তার ধারনা, গারোরা খুব ফুর্তিবাজ হয়। ছোট সময় তার এতটা জ্ঞান না হলেও সে সময়ের অনেক কথাই ভাস্করের এখনও মনে আছে। ভালুকাপাড়া মিশনের ঠিক পশ্চিম পাশে মাঠের অপর প্রান্তে রাফায়েল মিস্ত্রীদের বাড়ি। প্রায় প্রতিদিন তাদের বাড়িতে গিয়ে সময় কাটাতো সে। তখনই সে দেখেছে, সন্ধ্যার পর গারোরা প্রায় সব বাড়িতে পরিবারের সবাই মিলে প্রার্থণা করে। প্রার্থণা শেষে নিজেদের মধ্যে তাদের নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র নিয়ে ধর্মীয় গান করে। কোনো কোনো পরিবারে আবার শনিবার রাতে সবাই মিলে চ্যু খায়।

  আসলে বিষয়টি ছিল এমন যে, আশি সালে যেহেতু গানের কোর্স করেছে মনি তাই সেই গানের চর্চা বোধ হয় এখনও কিছুটা হলেও করছে বাড়িতে। এই মনে করে ভাস্করের সেই প্রত্যাশা জাগে মনে। ভাস্কর বিদেশি মদ খেয়ে অভ্যস্ত, যে কারণে তার কাছে চ্যু খেতে তেমন সমস্যা হয় না। চ্যু খায় আর থেকে থেকে মাংস আর খারি মুখে দেয় ভাস্কর।

  ভাস্কর প্রশ্ন করে, তোমার মেয়েরা বাড়িতে আসে না?

আসে তো। এতদিন ওরা বাড়িতেই ছিল। আজই চলে গেলো বড় মেয়েটা।

দেখা হলো না। ওরা না থাকলে তুমি বাড়িতে একাই থাকো নাকি?

  হ, আমি একাইতো থাকি আর এই যে আমার দুই নাতি। ওরা থাকলে আমার আর কারো লাগে না। এমনিতেই সময় কাইটা যায়।

একসময় ভাস্করের চোখ বন্ধ হয়ে আসে ঘুমে। সে বুঝতে পারে এ তার সাধারণ ক্লান্তির কারণে ঘুম না। তাই উঠে গিয়ে ব্যাগ থেকে তার সুগার মাপার যন্ত্র নিয়ে এসে শরীরে লাগানো মেশিনে স্ক্রেন করে দেখে অনেক হাই হয়ে গেছে তার সুগারের পরিমান।

  মনি ভাস্করকে তার শরীরে ছোট একটা মেশিন টাচ লাগিয়ে সুগারের পরিমান বলার কথা শুনে আগ্রহ সহ প্রশ্ন করে, কি এটা? কি করেছো? শরীরে এইটা লাগাইয়া কেমনে কইলা তোমার সুগার যে বেশি?

  ভাস্কর বলল, এটা সুগার মাপার যন্ত্র। আমি এমনিতেই এখন বুঝতে পারছি আমার এখন সুগার বেড়ে গেছে, তাই অনেকটা ঘুম ঘুম লাগছে।

  তোমার কি সুগারের অনেক সমস্যা? আবারো মনির প্রশ্ন।

  অনেকইতো সমস্যা। এতটাই সমস্যা যে চব্বিশ ঘন্টা সুগার মাপতে হয়। বারবার রক্ত নিয়ে পরীক্ষা করার চেয়ে এটা শরীরের সাথে পাঞ্চ করে লাগিয়ে রাখা হয়েছে। এটার মাধ্যমে সহজে স্কেন করে বোঝা যায় সুগারের কন্ডিশন বা উঠা নামা করার পরিমান। 

তুমি যে এটা শরীরের সাথে লাগাইয়া রাখছো এতে কইরা তোমার কোনো সমস্যা হয় না?

  শরীরের সাথে লাগানো থাকলেও তেমন কোনো সমস্যা হয় না।

  বিষয়টি মনি আরো পরিষ্কার হবার জন্য প্রশ্ন করে, এটা দিয়ে তুমি কেমতে কইরা বুঝলা, দেখাও দেহি?

  আমার শরীরের সাথে ছোট একটা যন্ত্র পাঞ্চ করে লাগানো রয়েছে। সেটার উপর এই মেশিনটা ধরলে সাথে সাথে সুগারের পরিমান কত তা এখানে শো করায়।

  তুমি যে এসব খাচ্ছো ওগুলাতো আরো বেশি সমস্যা করবে তাহলে। তুমি আগে বলবা না, আমি তাহলে তোমার জন্য রুটির ব্যবস্থা করতাম। তারপরেও তুমি যদি বলো, তোমাকে রুটি বানিয়ে দেই এখন।

  না থাক, রাতটুকু চলে যাবে এমনিভাবে। ঘুমালে সব ঠিক হয়ে যাবে। ইনস্যুলিন নিবো এখন।

  তুমি ইনস্যুলিনও নেও?

  হ্যাঁ, দিনে চার পাঁচবারও নিতে হয়।

  ও যীশু উ উ উ উ।

  যিশু বলেই মনি লম্বা টান দেয়।

  আমাদের ওদের বাবারও ডায়বেটিস আছে, তবে ইনস্যুলিন নিতে হয় না। বলেই আবার পরামর্শদাতার মতো করে বলে, তুমি হাঁটা চলা করো না? মনি অনেকটা অস্থির হয়ে উঠে ভাস্করের অসুস্থতা নিয়ে। বলছে, তুমি তাহলে এই চ্যু-টা এত খাইও না। পরে শেষে সমস্যা হইতে পারে। এখন রেখে দেও আর খাইও না। ক্ষুধা লাগলে বলো, খাবার দেই এখনই।

  এতকিছু খাবার পর আবার কি খাবার দিবা তুমি? বলো কি? আমার আর কিছু খাওয়া সম্ভব না। তুমি আমাকে মারবে দেখছি

  মনি এবার সামনে থেকে চ্যু এর পাত্র সরিয়ে নিয়ে বলে, আমি ভাত নিয়ে আসি অল্প কয়টা খেয়ে না ঘুমাইলে রাতে ক্ষুধা লাগতে পারে আবার।

  বলেই মনি উঠে দাঁড়ায়। এমনভাবে নড়াচড়া করতে শুরু করে যে, শীত যেন তাকে জাপটে ধরেছে। ভাস্কর তখন পর্যন্ত একটা শার্ট গায়ে দিয়ে বসে ছিল। তার কাছে এই শীত কোনো শীতই মনে হচ্ছিল না। একটু পর তাকে হামানি দিতে দেখে মনি টেবিল থেকে সবকিছু সরিয়ে নিয়ে খাবার রেডি করতে থাকে। ভাস্কর বলল, দেখো, আমার জন্য এখনকার খাবারটা কিন্তু জুলুম হয়ে যাবে। আমি চাই না এখন আর কিছু খেতে। তোমার ক্ষুধা পেলে তুমি খেয়ে নিতে পারো। আমাকে আর খেতে জোর করো না। একটু থেমে আবার বলল, আমি দেশে আসলে একারণেই কারো বাসায় দাওয়াত করলেও দাওয়াত রাখি না। তুমি এত খাবার আইটেম রান্না করেছো যে, সবকিছু অল্প অল্প করে খেতে গেলেও পুরো এক প্লেট ভাত আমাকে খেতে হবে। দেশের মানুষদের তো দেখি খেতে বসে এক প্লেট ভাত শেষ করে আবার ভাত নেয়। তাদের ভাত খাওয়া দেখে আমার অস্থিরই লাগে।

  তুমি ওখানে কি খাও? ওখানে কি তুমি ভাত খাও না?

  ভাত তো অবশ্যই খাই। ভাতই জাপানিদের প্রধান খাদ্য। তবে আমাদের দেশের মতো প্লেটে ভাত নিয়ে তরকারি দিয়ে মেখে এতো ভাত খাই না।

  আমি শুনেছি চাইনিজরা কিসের সাপ ব্যাঙ সবই নাকি খায়?

  চাইনিজ, কোরিয়ান, জাপানিজ আর গারো, সাঁওতাল সব তো একই। গারোরা তো ছোটো সময়ই দেখেছি শামুক ঝিনুক খায়। আমি গারো বাড়িতে শিয়ালের মাংসও তো খেয়েছি।

  হুম খায় তো। ওখানে তোমার এসব ওদের মতো খাইতে খারাপ লাগে না?

  খারাপ লাগবে কেনো? সব অভ্যাস হয়ে গেছে।

 আচ্ছা আগে খাবার নিয়ে আসি। পরে তোমার সব গল্প শুনবো। বলেই মনি বারান্দার সামনে গ্রীলের গেইট খুলে উঠোনের উপর ছেয়ে থাকা কালো অন্ধকার ভেদ করে রান্না ঘরের দিকে যায়। ভাস্কর সুযোগ পেয়ে উঠে গিয়ে সুগার মাপার যন্ত্র ব্যাগের ভিতর রেখে ইনস্যুলিন নিয়ে এসে পেটের উপর থেকে কাপড় সরিয়ে পেটে নাভির কাছে ইনস্যুলিন পুশ করে। ইনস্যুলিন ব্যাগের ভিতর রেখে এসে মনি আসার আগেই আবার ফিরে এসে তার আগের জায়গায় বসে। রান্না ঘরে মনির হাড়ি পাতিলের ঘুটুরঘাটুর শব্দ করতে শুনে ভাস্কর উঠে বারান্দায় যায়। ঘুটঘুটে অন্ধকার ভেদ করে উঠোনের দিকে দূরে তাকালেও ভাস্কর কোনো কিছু দেখতে পায় না।

 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers