শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ২৬ জিলহজ ১৪৪৭

সাহিত্য
  >
গল্প

দহন... (পর্ব -১)

নাবিলা শারমিন এপ্রিল ২১, ২০২৫, ১৪:৫০:১৪

3K
  • নাবিলা শারমিন

এশার আযান পড়ছে, এত রাতে ছাদে থাকা ঠিক না। রাতে খোলা চুলে ছাদে থাকলে নাকি বদ জিনের আছর হয়। কিন্তু আমার এভাবে খোলা চুলে দাঁড়িয়ে থাকতে খুব ভাল লাগছে। ঠান্ডা বাতাসে শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে, চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। ইচ্ছে করছে হালকা শরীরটা নিয়ে বাতাসে ভেসে বেড়াই। অনেকক্ষণ থেকেই আমাকে নিচ থেকে ডাকছে,  শুনেছি আমি উত্তর দেই নি। গিয়ে বলব “ওহ ডেকেছিলে নাকি? শুনতে পাই নি”।

এ বাড়িতে নিজের জন্য একটা মিনিটও বের করতে হলে মিথ্যে কথার বিকল্প নেই। এ বাড়ির মানুষের আমাকে ছাড়া একগ্লাস পানি খাওয়াও হয় না। নিচে গিয়ে হয়ত শুনব টিভির রিমোট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, অথবা  বাড়ির পিচ্চিটা ঘুমাচ্ছে ওর গায়ে যেন মশা না বসে সেটা খেয়াল রাখতে হবে।

 মায়ায়ায়া, মায়ায়ায়ায়া...

উফফফফ ডেকেই যাচ্ছে ছোট খালা।

—আসছি,  বলে উত্তর দিলাম আমি।

     কতক্ষণ ধরে ডাকছি তোকে? 

—তাই কই আমি তো মাত্রই শুনলাম। কবুতরের খাবার দিতে গিয়েছিলাম।

—এতক্ষণ লাগে খাবার দিতে? এই সময় এত ছাদে যাবি না। পাশের বাড়ির মেসের ছেলেগুলো বিড়ি ফোঁকে ছাদে উঠে এই সময়। চা বানা, মিমের বন্ধুরা আসছে। নিচের দোকান থেকে সিংগারা, পুরি নিয়ে আয় আর ফ্রিজে চিকেন বল আছে কয়েকটা ভেজে দিস।

গা টা আমার জ্বলে গেল। উনি কিসের ইংগিত দিল, পাশের মেসের ছেলেগুলোর জন্য আমি ছাদে গিয়েছিলাম? আমার জীবনের একটু ভাল সময় যদি কাটাই তা হল বিকেল-সন্ধ্যায় এই ছাদে বসে আকাশ দেখা। সেটা নিয়েও নোংরা কথা না বললেই চলছিল না?

দোকানে যাওয়ার জন্য বেড়িয়ে পরলাম, মিমের ঘরটাতে চোখ পড়তে দেখলাম সবাই মিলে এক ল্যাপটপকে ঘিরে জটলা করে আছে। আমার যদি এমন বন্ধু থাকত আর আমার বাড়িতে আসত আমি ওদের নিয়ে বাড়ির ছাদটাতে যেতাম, ইটের ফাঁকে বুলবুলি পাখির বাসাটাতে থাকা ছানাগুলোকে দেখাতাম। ডালিয়া ফুলের টবটাতে যে লজ্জাবতি গাছটা হয়েছে ওটাকে ছুঁয়ে দেখাতাম৷

আগে এ বাসার সবার একটু ছোট করে পরিচয় দিই।

মিম আমার ছোট খালার মেয়ে ইস্ট ওয়েস্ট ভারসিটিতে পড়ে।  আমার চেয়ে ছয় মাসের ছোট। আর ওর বড় ভাই মানে আমার খালার ছেলে ব্যাংকে চাকরি করে।  ছোট্ট একবছরের একটা মেয়ে আছে ভাইয়ার।

ভাবি সারাদিন ছোট বাচ্চা সামলাতেই ব্যস্ত। এই বাড়ির সবার মধ্যে ভাবিই একটু ভরসার জায়গা আমার।  কখনও কখনও যখন আমি অসুস্থ হই, ভাবি খেয়াল করে।  আমার জন্মদিন এলে চুলের কাটা বা কানের দুল দেয়।

আর আমি হলাম মায়া।  কে যে, কী বুঝে এই নামটা রেখেছিল কে জানে।  আমার জীবনের মতোই হাস্যকর একটা নাম। যার উপর কোনো দিন কারও দয়া মায়া কিছুই হয় নি, তার নাম নাকি মায়া।

আমার যখন তের বছর তখন থেকে ছোটখালার সাথে থাকি। দেখতে দেখতে ছ’বছর হয়ে গেল এখানে আছি।

এর আগে থাকতাম নানির কাছে, নানী মারা যাওয়ার পর থেকে এখানে থাকি। আসলে আমার মা নেই,  বাবা আরেকটা বিয়ে করেছে। তাই এভাবে এর পা থেকে ওর পায়ে গড়িয়ে বেড়াতে হচ্ছে জীবন ভর। মা নেই বলতে মা মারা যান নি,  ভেগে গেছেন। ফুফাতো ভাইয়ের সাথে প্রেম হয়েছিল বিয়ের পর এমন কি মা হওয়ার পরও ভুলতে পারেন নি। বিদেশ আছেন এখন।  তার সাথে আমার নানি, খালা কেও সসম্পর্ক রাখেনি, তিনিও কোনো দিন যোগাযোগের চেষ্টা করেন নি।

বাবার ওই ঘরে আরও দুটো মেয়ে আছে। ওরা স্কুলে পড়ে, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। নানির কাছে থাকতে দুবার ঈদে জামা দিয়েছিল আমাকে বাবা।  তখন শেষ দেখেছিলাম তাকে, তারপর আর কোনো দিন জামা দেন নি।  তাকেও আর কোনদিন দেখতে পাই নি। মাঝে মাঝে খালাদের মুখে গল্প শুনি এটুকুই।

আমার নানির বাপের বাড়ি থেকে পাওয়া কিছু জমি ছিল, তার থেকে কিছুটা তিনি আমার ভরণপোষণের জন্য দিয়ে গেছেন।

না দিলেও ক্ষতি ছিল না। গায়ে খেটে আর সবার দয়ায় এখনকার মতো করেই কেটে যেত।

ঠিক এখনকার মতো করে, সারাটা জীবন...

সারাটা জীবনই আমি সুখগুলোকে খুব কাছ থেকে দেখেছি, কিন্তু ছুঁয়ে দেখতে পারি নি কখনও। আলেয়ার মতো হাত ফসকে বেড়িয়ে গেছে সবসময় । আমার চারপাশের মানুষগুলোর সব ছিল—আপনজন, আদর, সম্মান ভালবাসা সব। আমি শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখতাম।  কেন নেই আমার, কেন নেই? 

কেন আমি কাওকে বলতে পারি না এবার জন্মদিনে কিন্তু আমাকে একটু সমুদ্রে ঘুরতে নিয়ে যেতে হবে।

কেন কোনো দিন দোকানে গিয়ে নিজের ইচ্ছামতো একটা জামা কিনতে পারি নি? যে যখন দয়া করে সস্তা দরের কিছু একটা দিয়েছে তাই পড়তে হয়েছে, অথবা বোনদের পুরোনো বাতিল করা জামা গায়ে দিয়ে হাসি মুখে বলতে হয়েছে বেশি পুরোনো হয়নি নতুন নতুনই লাগছে।

যখন ছোট ছিলাম আমার খালাত মামাতো ভাই বোনদের বাসায় বেড়াতে এলে আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে যেত। কী সুন্দর সব পুতুল ছিল ওদের, গান গাইত, কোমড় দুলাত। কী যে সুন্দর তুলোর কুকুর ছানা ছিল। সত্যিকারের ছানার চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর। খুব ইচ্ছে করত আমার একটু ছুঁয়ে দেখি, আদর করে দিই একটু। ওরা বলত ধরা যাবে না, দূর থেকে দেখো। হাত দিলে নষ্ট হয়ে যাবে। বায়না করতাম নানির কাছে। নানি মেলা থেকে নাক থেবরানো প্লাস্টিকের পুতুল কিনে দিত।  সে না সুন্দর ছিল, না তার কোমড় দুলানোর মত গুণ ছিল। তবুও তাকে আপন করে নিতাম।  হয়ত তার সাথে নিজের কোথাও একটা মিল খুঁজে পেতাম। দুনিয়ার বাজারে আমরা দুজনেই যে খুব সস্তা দরের।

চলবে…

নিউজজি/নাসি 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers