সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ৭ বৈশাখ ১৪৩৩ , ৩ জিলকদ ১৪৪৭

সাহিত্য
  >
গল্প

দহন (পর্ব -৩)

নাবিলা শারমিন এপ্রিল ২৪, ২০২৫, ১৫:১২:৩৮

566
  • দহন (পর্ব -৩)

যক্ষের ধনটা আবির ভাইই দিয়েছিল আমায়।

সেদিন আমার জন্মদিন ছিল। আবির ভাই দুপুরের দিকে আসল বাসায়, ভাইয়ার বাইকটা তার লাগবে সেটাই নিতে এসেছিল। এসে বলল মায়া এককাপ চা বানা তো, চা টা খেয়েই রওনা দিই। আমি চা করে ভাবির হাতে পাঠালাম।

ওপাশ থেকে শুনলাম চিনি নিয়ে আয় তো একটু বলে আবির ভাই ডাকল। এই ডাকটারই অপেক্ষা করছিলাম। যেতেই সে বলল কি রে ভাবিকে খাটাচ্ছিস কেন? নিজের কাজ করতে এত আলসি কেন রে, এমন হলে জামাই দুদিনও রাখবে না।

—আবির ভাই আজকে বেচারির জন্মদিন। আজকে আর পিছে লেগেন না ওর। বলে ভাবি চলে গেল।

—বুড়ো ধাড়ির আবার জন্মদিন। বল কী লাগবে জন্মদিনে? এত কষ্ট করে রোজ রোজ চিনি ছাড়া চা করে দিস, কিছু একটা তো পাওনা হয়ে গেছে।

বলল সে।

আমি আস্তে করে বললাম আমাকে একটা তুলোর কুকুরছানা কিনে দেবেন আবির ভাই?

উনি যে এত অবাক হলেন তা আর বলার না, স্বাভাবিক ভাবেই ওনার ধারণা ছিল, আমি বলব যে কিছু লাগবে না।

আমি যে সত্যি উনার কাছে কিছু চাইব উনার ধারণার বাইরে ছিল।

এর কিছুদিন পর ঝিমানো এক দুপুরে ফ্লোরের উপর বসে আমি গান শুনছিলাম “মম জীবনও যৌবনো, মম আখিলও ভুবনো”...

কেউ ছিল না সেদিন বাড়িতে, খালার ননদের মেয়ের বিয়েতে গিয়েছিল। আমি একা ছিলাম নিস্তব্ধ এই দুপুরটাতে। হঠাৎই দরজায় কড়া পড়ল, খুলে দেখি আবির ভাই একটা প্যাকেট হাতে দাঁড়িয়ে আছে।

বললাম ভেতরে আসেন।

উনি বলল না থাক, আজ তো কেউ নেই বাসায়, ভেতরে আর আসব না। এটা তোকে দিতে এলাম।

ইচ্ছে করেই এসেছেন তাহলে, কেউ নেই এটা জেনেই।

আমি প্যাকেটটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালাম। উনি প্যাকেটটা দেওয়ার ছলে কিছুক্ষণ আমার হাত ছুঁয়ে থাকলেন, কয়েক সেকেন্ড। তারপর কিছু না বলেই চলে গেলেন।

আমি রুমে চলে এলাম...

আগের গানটা শেষ নতুন একটা গান শুরু হয়েছে

“আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ...”

প্যাকেটটা খুললাম। সাদা ধবধবে একটা কুকুর ছানা, গলায় লাল রঙের মখমলের বেল্ট, তাতে ছোট্ট একটা ঘণ্টা ঝুলছে। মিষ্টি একটা হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। এটা আমার, একদম আমার। আমি হাত দিলে এটা নষ্ট হবে না, আমি আদর করলেও এটা নষ্ট হবে না। এটাকে আমি কলিজার মধ্যে করে রাখব। যদি কখনও সমুদ্র দেখতে যাই এটাকেও সঙ্গে নিয়ে যাব কিন্তু পানিতে ভিজতে দেব না। এটা আমার যক্ষের ধন।

বেশ কিছুদিন হল আবির ভাই আর আমাকে চায়ের চিনির জন্য ডাকেন না। কারণ মিমের সাথে তার বিয়ের কথাবার্তা মোটামুটি ফাইনাল। মিম বড়লোক ঘরের একটাই মেয়ে, ভাল প্রতিষ্ঠানে পড়ে। সবচেয়ে বড় কথা আবির ভাই কানাডায় যেতে চান। মিমকে বিয়ে করলে এই ব্যাপারে অনেক সাহায্য পাবেন।

আমি এতে অবাক হইনি কারণ এমনি কিছু হবে আমি জানতাম। জীবন আমাকে বাস্তবতা এত বেশি ভয়াবহ ভাবে দেখিয়েছে যে আমার আকাশকুসুম স্বপ্নগুলো বাস্তব হবে তা আমি ভাবতাম না। স্বপ্ন দেখতাম, সপ্ন দেখতে ভাল লাগত বলে, আর কিছু না।

আবির ভাইয়ের ওপর আমার কোনো রাগ নেই। কারণ একটা অনাথ, আশ্রিতা রূপসী মেয়ের রূপে দুদিনের জন্য মজে যাওয়া এক ব্যাপার আর তাকে ভালবেসে তার জন্য বাকি সব কিছুকে অগ্রাহ্য করা আরেক ব্যাপার।

কী পেত উনি আমাকে বিয়ে করে?  না শ্বশুরবাড়ি, না শ্বশুরশাশুড়ির আদরযত্ন, না সম্মান কিছুই না। বরং মানুষের তামাশার পাত্র হতে হত।

উনি কোনো সিনেমার হিরো না, কোনো  উপন্যাসের নায়ক না।

সাধারণ একজন মানুষ, যাকে সমাজে সম্মানের সাথে বাঁচতে হবে। তাছাড়া আমাকে তো কোনো প্রতিশ্রুতি উনি দেন নি, মিথ্যে স্বপ্নও দেখাননি। তাকে আমি দোষ দিই কী করে?

আমাকে এই বিয়ের ব্যাপারে কেউ কিছু বলছে না, কিন্তু আমি জানি আবির ভাইয়ের পরিবারের সাথে রেস্টুরেন্টে দেখা করেছে এ বাড়ির সবাই। ওখানে মিমকে আংটি পরানো হয়েছে। খুব জলদিই কাবিন হবে। এ বাড়িতে আবার মরিচবাতি লাগানো হবে, আলপনা আঁকা হবে, খালা ঘনঘন চোখ মুছবেন। আমাকেও অনেক কাজ করতে হবে। আবির ভাইয়ের জন্য ডালা সাজাতে হবে, মিম আর আবির ভাইয়ের বাসর ঘর সাজাতে হবে। 

খালা সত্যি সত্যি চোখ মোছা শুরু করলেন। মিমের বিয়ে হওয়ার কষ্টে না, বিয়ে ভেঙে যাওয়ার কষ্টে।

আবির ভাই বিয়ে ভেঙে দিয়েছেন। কে বা কারা মিমের সেই কেলেঙ্কারিটাকে প্রমাণ সহ আবির ভাইয়ের কাছে প্রকাশ করে দিয়েছে। যতই হোক সব জেনেশুনে কেই বা সারাজীবনের সিদ্ধান্ত নেবে এভাবে।

দুদিন আগেও যে বাড়িটা উৎসবমুখর ছিল, আজ যেন শোকের মাতম চলছে। আমার সাথে কেউ কথা বলছে না। সবার ধারণা কাজটা আমি করেছি। ভাবি শুধু মাঝে মাঝে গম্ভীরভাবে এটা ওটা কাজ করতে বলছে।

আমাকে সরাসরি কিছু বলতেও পারছে না, কারণ কারো কাছে কোনো প্রমাণ নেই এটা শুধু একটা ধারণা মাত্র। বেচারারা সব বুঝছে, অনেক কিছু করে ফেলতে মন চাইছে কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। ঠিক এতদিন ধরে আমি যে অবস্থায় ছিলাম, এখনও আছি।

ওরা সারাজীবনেও বুঝতে পারবে না এর পিছনে আসলেই আমি ছিলাম কি না, আমি জানি আবির ভাই কোনদিনও মুখ খুলবে না।

হ্যাঁ করেছি আমি স্বীকার করলাম, আমি করেছি তো হয়েছেটা কী? আমার মায়ের দোষের শাস্তি যদি আমাকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয় ও কেন ছাড় পাবে, কেন পাবে?

সব শাস্তি, সব না পাওয়া কেবল আমার জন্যই, শুধুমাত্র আমার জন্য? বাহহহহহহ, মানি না আমি।

কেউ তো আমাকে কখনো মায়া করে নি, দয়া দেখায় নি আমি কেন দেখাব, কী কারণে দেখাব?

জানি আমি এতদিন যে পাতে খেয়েছি সেই পাতই ফুটো করেছি। করেছি বেশ করেছি। আমার কপালটাকে যেদিন বিধাতা বিনা দোষে ফুটো করেছিল, সেদিন যদি তার একটু খারাপ না লাগে, তাহলে আজ কেন আমার এই কুলটার জন্য খারাপ লাগবে?

বোন বলে? কিসের বোন? যে কি না বয়সে ছোট হয়েও আমাকে দিয়ে জুতো পরিষ্কার করাত? করুক ঘৃণা সবাই কিচ্ছু আসে যায় না আমার। আমিও ঘৃণা করি সবাইকে, নিজেকে, সবকিছুকে।

এই ঘটনার পর খালা আর কোনোমতেই চাইছিলেন না আমাকে আর তার বাড়িতে রাখতে। সবাই আলোচনা করে ঠিক করল আমার বয়স হয়ে গেছে খুব দ্রুত বিয়ে দেওয়া দরকার। এবং খুব জলদি আমার জন্য ছেলেও ঠিক করে ফেলা হল। ছেলে আমার পরিচিত, তার ডিশ লাইনের ব্যাবসা আছে।  তার থেকেই এ বাড়িতে লাইন দেওয়া হয়েছে। সে অবশ্য আসে না এ বাড়িতে কর্মচারীদেরকেই পাঠায় সবসময়। পান খাওয়া অভ্যাস তার।  দাঁতগুলো কালচে। আমাকে কেউ আমার ইচ্ছার কথা জিজ্ঞেস করে নি। কারণ এটাতে কিছু আসে যায় না। আমি যেমন নীরবে একটা মারাত্মক অপরাধ করেছি, এটা তেমনি নীরব একটা শাস্তি।

মামা খালারা ঠিক করলেন অনেক হয়েছে এবার মেয়ের বাবাকে দায়িত্ব দিতে হবে। অনেক কিছু দেওয়া থোওয়ার ব্যাপার আছে। কিছু না হলেও কিছু লোক তো খাবে সেই খরচ কে টানবে। নানির ওই দুছটাক জমি একটা কানের দুল দিতে গেলেই শেষ।

আমার বাবাকে খবর দেওয়া হল। যার চেহারা আমার মনে নেই, যার গলার স্বর কেমন আমি জানি না।

যিনি অনেক আগে দুবার ঈদে আমাকে জামা কিনে দিয়েছিলেন সেই বাবা।

উনি জানালেন উনি আসবেন খালার বাসায় এ ব্যাপারে কথা বলতে।

আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম কবে তিনি আসবেন। 

কবে তাকে দেখব... (চলবে)

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers