সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩ , ২৭ মুহররম ১৪৪৮

সাহিত্য
  >
গল্প

দহন (শেষ পর্ব)

নাবিলা শারমিন এপ্রিল ২৭, ২০২৫, ১৪:২৭:০৭

601
  • নাবিলা শারমিন

উনি চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করলেন—মনে-মনে। আমি তাকিয়ে আছি উনার দিকে। গত দুদিনে চিঠিটা আমি কয়েকশোবার পড়ে ফেলেছি। মুখস্ত হয়ে গেছে মোটামুটি।

মায়া,

আমি জানি তুমি ভাল নেই। তার জন্যে সম্পূর্ণ আমি দায়ী। তোমার সাথে আমি যা করেছি তাকে ভুল বলা যায় না, অন্যায়ও বলা যায় না, যা করেছি তাকে পাপ বলে। আমি জানি তুমি আমাকে অত্যধিক ঘৃণা কর।

এই চিঠিটা আমি কোন সাফাই গাওয়ার জন্য লিখছি না। লিখছি যদি আমার সব কথা শোনার পর তোমার একটু করুণা জাগে আমার জন্য। যদি একবার আমার কাছে আসার কথা ভেবে দেখো এই জন্য।

মায়া, তুমি হয়ত জানো না, আমার ছেলেবেলাটা খুব খারাপ কেটেছে। আমার বাবা, তোমার নানা ছিলেন অসম্ভব বদরাগী এবং স্বেচ্ছাচারী একজন মানুষ। তিনি সব সময় তোমার নানি আর আমাদের ভাই বোনদেরকে মানসিক, শারীরিক অশান্তিতে রাখতে চেষ্টা করতেন। তিনি ছিলেন বিকারগ্রস্ত।

আর আমি ছিলাম মুক্ত এক পাখির মতো, যাকে ছোট্ট একটা খাঁচাতে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। আমার বৃষ্টি দেখতে ভাল লাগত খুব, কিন্তু তোমার নানার মানা ছিল। গল্পের বই পড়তে খুব ভালবাসতাম তাও মানা ছিল।

কারণ একটাই তিনি পছন্দ করেন না। একটা মৎস্যকন্যাকে পানি থেকে তুলে এনে ফেলে রাখলে তার যে অবস্থা হয়, আমার ছিল সেই অবস্থা।

বদ্ধ, ভ্যাপসা জীবনটাতে একটা ভাল লাগার জায়গা ছিল আমার। শফিক ভাই, বাবার বোনের ছেলে।

উনি লুকিয়ে আমাকে গল্পের বই কিনে দিতেন, চুড়ি, টিপ কিনে দিতেন। উনি আমাকে অনেক স্বপ্ন দেখাতেন। সমুদ্র দেখার স্বপ্ন, মেঘ নিজের হাতে ছুঁয়ে দেখার স্বপ্ন, জ্যোৎস্না-বিলাসের স্বপ্ন। একদিন বাবা ব্যাপারটা টের পেয়ে যান।

অমানবিকভাবে মারধোর করেন আমাকে। এর কয়েকদিনের মধ্যেই তোমার বাবার সাথে বিয়ে ঠিক করে ফেলেন। শফিক ভাই তোমার বাবার কাছে গিয়েছিলেন যাতে উনি বিয়েটা না করেন সেই অনুরোধ করতে। কিন্তু তোমার বাবা আমাকে যেদিন প্রথম দেখেছিলেন সেদিনই ঠিক করেছিলেন তিনি আমাকেই বিয়ে করবেন।

তোমার নানার ইচ্ছায় একটা অনুভূতিশূন্য পুতুল হয়ে আমি তোমার বাবার সংসার করতে যাই। সে আরেক দুনিয়া। কখনও যদি বৃষ্টি দেখতে জানালার কাছে দাঁড়াতাম সে বলত কে আছে জানালার কাছে? ওখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?

আমি সাজতে খুব ভালবাসতাম, মাঝে মাঝে চোখে কাজল দিয়ে কপালে টিপ দিয়ে রাখতাম। তোমার বাবা এসে সারাবাড়ি তন্নতন্ন করে ক্লু খুঁজতেন, কেউ এসেছিল কি না সেটা বুঝতে। দিন দিন আমার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল।

আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তারপর তুমি এলে। ভাবলাম হয়ত এবার সব ঠিক হবে। কিচ্ছু ঠিক হল না।

অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ হল সেদিন যেদিন শফিক ভাইয়ের লেখা একটা চিঠি তোমার বাবার হাতে পড়ল। শফিক ভাই হঠাৎ-হঠাৎ একটা দুটো চিঠি আমাকে লিখতেন। আমি কোনোদিন জবাব দিই নি। তবে তার চিঠিগুলো পড়তে আমার খুব ভাল লাগত।

চিঠিটা পেয়ে তোমার বাবা যেন হায়েনা হয়ে গেল। আমার গায়ে হাত তুলল। কিন্তু তোমাকে নিয়ে যখন সে বিশ্রি বাজে ইঙ্গিতটা দিল তখন আর আমি থাকতে পারি নি। সে বলেছিল তুমি তার মেয়ে না, আমার পাপের ফল।

এই কথার পর আমি বের হয়ে আসি ও বাড়ি থেকে। যাওয়ার জায়গা ছিল না। আমার অবস্থা এমনি ছিল যে হয় তোমার বাবা, নয় তোমার নানা এরা ছাড়া আমার গতি নেই।  এই দুই পুরুষের অত্যাচার সহ্য করেই আমাকে বাঁচতে হবে।  জিদে, ক্ষোভে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। ভাবলাম বাঁচি মরি এদের কাছে কোনদিন ফিরব না। তারপর শফিক ভাইয়ের ঠিকানায় উনার বাসায় গেলাম। তারপরের কাহিনি নিশ্চয়ই তুমি শুনেছ।

মা তোমার কাছে আমি গুনাগার। আমাকে ক্ষমা করতে হবে না, ঘৃণা করেই না হয় একটা সুযোগ দাও আমাকে। 

ইতি মা।

বাবা চিঠিটা পড়া শেষ করে আমার হাতে দিয়ে দিলেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন ও তো নিজের সিন্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে। আসি তাহলে আমি। চলে গেলেন উনি।  কিচ্ছু বললেন না আর, ফিরেও তাকালেন না একটাবার।

উনি চলে গেলে ছোটখালা মুখ খুললেন। কবে যাচ্ছ তুমি তোমার মায়ের কাছে? আমি বললাম দুদিন পরই মামার ওখানে যাব। মা আমার চিঠিটা হাতে পেলেই কাজ শুরু করবেন।

ছোটখালা বললেন আমার মনে হয় তোমার কাল সকালেই রওনা দেয়া উচিত। কাল থেকেই তোমার মামার সাথে গিয়ে পরামর্শ শুরু কর।

আমি শুধু বললাম আচ্ছা ঠিক আছে।

রাতে খালা ফোনে মনের ঝাল মিটিয়ে মামাকে গালিগালাজ করলেন এবং প্রতি কথার সাথে “তুমি ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাও” এই লাইনটা বলতে লাগলেন। কথা হল কাল আমি সকালের বাসেই মামার বাসার জন্য রওনা দেব। মামা আমাকে বাসস্ট্যান্ড থেকে নামিয়ে নেবেন।

রাতে আমি সবকিছু গুছিয়ে রাখলাম। অনেক সকালে বের হতে হল, খালার কাছে বিদায় নিতে গেলাম বললাম “চলে যাচ্ছি”। উনি কোনো উত্তর দিলেন না।

ভাবী বাপের বাড়ি তার মা অসুস্থ, ভাইয়াও সেখানে। ওদেরকে আর শেষ দেখাটা হল না।

মিমের রুমের দরজায় দুবার টোকা দিলাম ও দরজা খুলল না। ওর দরজার কাছে একটা কাগজের চিরকুট রেখে এলাম। তাতে লেখা ছিল,

“আবির ভাইকে তুই কোনদিনও ভালবাসিস নি। উনিও বাসতেন না তোকে। দেখিস এমন একটা ছেলের সাথে তোর বিয়ে হবে যে তোকে অনেক ভালবাসবে।”

চিরকুটটার উপর আমার যক্ষের ধনটাকে বসিয়ে দিয়ে চলে আসলাম। এটাই আমার প্রায়শ্চিত্ত।

বাইরে বেড়িয়ে একবার দেখলাম বাড়িটাকে, সবকিছু ছেড়ে যাচ্ছি আমি। কত স্মৃতি, কত অনুভূতি, কত সময় সব পেছনে ফেলে একা, একদম একা...

আমার যাওয়ার কথা ছিল বাসস্ট্যান্ড, রিকশা ঠিক করলাম রেলস্টেশনে যাওয়ার জন্য। অনেক আগে একবার উঠেছিলাম ট্রেনে, আজ আবার ওঠা হবে।

ঠিক করে রেখেছি রবীন্দ্রনাথের “হঠাৎ দেখা” কবিতাটা পড়তে পড়তে ট্রেনের সময়টুকু কাটাব।

ট্রেনে বসে মনে হচ্ছিল, মা এতদিন ধরে ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করে চিঠিটা খুলে যখন দেখবে যে ওটা শুধুমাত্র একটা সাদা কাগজ, কালির একটা আঁচড়ও নেই তার তখন কেমন লাগবে?

ভেবেই হাসি পাচ্ছে। হাসি পাওয়ার মতো কিছু তো এটা না তবুও শুধুশুধু হাসি পাচ্ছে।

মামা যখন বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করার পর বুঝবেন আমি আসি নি, ওনার কেমন লাগবে?

সবাই কী ভাববে কোথায় গেলাম আমি? ছোটখালা সবার আগে সন্দেহ করবেন আবির ভাইকে, সেই বেচারা তো কবেই কানাডা চলে গেছে। 

বাবা হয়ত পুলিশে জানাবেন, দু’একবার থানায় খবর নেবেন তারপর নিজের জীবন নিয়ে, সংসার নিয়ে এত বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়বেন যে মনেও থাকবে না। মা ছোট মামার কাছে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করবেন কোনো খোঁজ পাওয়া গেল কি না।

সবাই বলবে “যেমন মা তার তেমন মেয়ে, এ জাতের রক্তই খারাপ। কে জানে কোন নাগর জুটিয়ে ভেগেছে। কিছু নিয়ে টিয়ে যায় নি তো আবার বাড়ি থেকে”?

আমি যেমন অবাঞ্ছিতভাবে এসেছিলাম সবার জীবনে, তেমনি নীরবে চলে যাচ্ছি। কোথায় যাচ্ছি কেউ কোনোদিন জানবে না। আমার অস্তিত্ব একদিন সবাই ভুলে যাবে। আমি অবাঞ্ছিত হয়ে কারও স্মৃতিতেও থাকতে চাই না। সবাই আমাকে ভুলে যাক, এতেই সবার ভাল, আমারও ভাল। আর একটা কথা আমার লেখিকাও জানে না আমি কোথায় যাচ্ছি, তাকেও বলি নি আমি এ ব্যাপারে কিছু। তাকে জিজ্ঞেস করেও আদতে কোনো লাভ নেই। 

তবে এই এতদিনে, এত কথায় কেউ যদি আমার মায়ায় আটকে গিয়ে থাকে, কেউ যদি আমাকে খুঁজে বের করতে চায়, তার জন্য একটা ক্লু দিয়ে যাচ্ছি, খুঁজতে খুঁজতে চলে এসো আমার ভুবনে...

মিশে আজ যাচ্ছি আমি বিন্দু বিন্দু জলে

আকাশটাকে আড়াল করে আমার আঁচল তলে,

গহীন বনের শুকনো পাতার গালিচাতে হেঁটে

দূর দিগন্তে হারিয়ে যাচ্ছি পায়ের বেড়ি কেটে।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers