শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ২৬ জিলহজ ১৪৪৭

সাহিত্য
  >
গল্প

সাক্ষাৎকার

রাশেদ সাদী মে ৩০, ২০২৫, ১২:৪১:১১

505
  • রাশেদ সাদী

‘তুমি যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবে, আমি ওই বিষয়টিকে সন্দেহের চোখে দেখি।’ বললেন লেখক।

‘কিন্তু সেটা ছাড়া কথা আগাবে কী করে?’ সাক্ষাৎকারপ্রার্থী সাংবাদিক তার লাল ঠোঁটে হাসি চেপে প্রশ্ন করল।

এ সময় লেখক অদ্ভুত আর অসাযুজ্য কথা পাড়ল, ‘তোমার ঠোঁটের জন্য।’

‘এই রে সেরেছে।’ পঞ্চাশোর্ধ লেখকের কথায় সাংবাদিকের মুখে মেঘের একটা কালচে ছায়া উঁকি দিয়েই মিলিয়ে গেল। ব্যাপারটাকে সে মোকাবেলা করার সিদ্ধান্ত নিল। যেহেতু এমন একটা সমাজের মানুষ সে, যেখানে নারীদের বিশেষ দৃষ্টিতে দেখা হয়, উপরন্তু পেশায় সাংবাদিক; ফলে ব্যাপারটাকে সে ভালোভাবেই মোকাবেলা করতে পারল।

মনের যতটুকু জড়তা ঝেড়ে ফেলে নিজেকে স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল আয়শা এবং স্বচ্ছন্দে কথোপকথন এগিয়ে নিতে পা বাড়াল। একটু চালাকি করে বলল, ‘তা আপার প্রথম উপন্যাসের আয়শার ঠোঁটে কিন্তু কখনোই রঙ লাগত না। ঠোঁটকাটা স্বভাবের একজন বিপ্লভাবাপন্ন নারী; অবশ্য সংক্ষিপ্ত জীবন তার খুব গোছানো। আর যদি কিছু না মনে করেন বলি, প্রথম উপন্যাস তাই বোধহয়, কিছু বানান বিভ্রাটও চোখে পড়ে।’

লেখক সাধারণত কাউকে সাক্ষাৎকার দেন না। কিন্তু আয়শার ক্ষেত্রে ঘটল তার উল্টো। সেটা ঘটেছিল প্রথমত তার নামটার কারণে, দ্বিতীয়ত আয়শার নিজের কারণেই। হতে পারে তার প্রথম উপন্যাসের নায়িকার নাম আয়শা, হতে পারে এই নামের প্রতি তার ভীষণ দুর্বলতা, আর প্রথম যে কোনো বিষয়ের প্রতি মানুষের স্বভাবতই একটা দুর্বলতা থাকে; তা যদি আবার হয় শিল্পসম্পৃক্ত।

তাছাড়া আয়শা নিজেই একটা আগুন। চলনে বলনে আর দর্শনে গ্রিক দেবী। প্রথম উপন্যাসের নায়িকার কথা মনে করিয়ে দিয়ে সে যেন বলতে চাচ্ছে—আপনি কিন্তু আয়শাকে নিয়ে বাজে কিছু বকতে পারেন না। মনস্ততে্‌বর দিক থেকে এ একটি সূক্ষতম খোঁচা; যা কোষের মধ্যবিন্দুতে গিয়ে আলতো করে আঘাত করে আর কাজ করে চিদ্যুৎগতিতে।মজার ব্যাপার হলো, লক্ষ্যটা ছিল অভ্রান্ত। ঠিক সময় ঠিক জায়গায় যদি ফুঁ পড়ে; তা যে কত কী ঘটিয়ে দিতে পারে, তা আর নতুন করে বলার কিছু নেই।

‘আয়শার রাজনৈতিক দৃষ্টি ছিল প্রখর। সে আর দশটা রোমান্টিক গল্পের নায়িকা হতে চায়নি’, লেখক বলল।

‘সে আপনার প্রায় নারীগুলোই। ইরা, সকাল রায়, ফাল্গুনী হাজরা, রহিমা, রানু, এমনকি আপনার শেষ উপন্যাসের কাজের বুয়া মরিয়মও। কিন্তু আমি বিস্মিত হই দেশে একের পর এক ইস্যু তৈরি হচ্ছে—কিন্তু আপনি একটা পাথরের মতো নীরব। এমনকি আপনার লেখা নিয়ে সমালোচনারও কোনো জবাব দেন না, কেন?’

‘আমি আমার সমস্ত কথা গল্পের চরিত্র দিয়ে বলিয়ে নিতে চেয়েছি, তাই।’

‘কিন্তু সমসাময়িক কোনো ব্যাপার, কী অপকর্ম যার জের এখনও চলছে, জনগণকে পিষছে—সেসব ব্যাপারেও তো সরাসরি কোনো কথা বলে না আপনার চরিত্র। কেন?’

‘প্রথমে বলে রাখি, এই সাক্ষাৎকার তোমাকে ছাপানেরা জন্য দিচ্ছি না, সেটা তুমি বুঝবে পরে। তাই বলছি—আত্মস্বার্থে। সাপের লেজে কে যেচে পা দিতে যায় বলো? যেখানে দেখছি পা রাখার জন্য আরও অনেক জায়গা তার পাশেই পড়ে আছে।’

লেখক নিজের টাকমাথায় হাত বুলিয়ে বলে চললেন, ‘অন্যায় হলো ফুসতে থাকা এমন সাপ, সন্দেহ হলেই যে কাউকে কামড় বসাবে। চাই তুমি ওদিকে যাও না-যাও। চোখ ফিরিয়েছ তো মরেছো। মনে রাখবে সাপ সব সময় আত্মরক্ষার জন্য কামড়ায় আর অপরাধী হলো সাপের স্বভাবের। আচ্ছা যাক, চা খাবে তো?’

লেখকের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো গিলতে লাগল সাংবাদিক। হঠাৎ চায়ের প্রসঙ্গ আসাতে সে যেন সম্বিৎ ফিরে পেলো—এ ভাবে সে ঘাঢ় কাৎ করল।

‘একটু বসো আমি চা নিয়ে আসছি’, বলে লেখক তার লেখার, পড়ার, খাবার আর আড্ডার একমাত্র রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

আয়শার অবাক লাগে, এমন জনপ্রিয় একজন লেখক, এতো তার রয়েলেটি ঘর যেন ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রির ওয়েস্টেস রুম। তার চেয়েও বইয়ের ভয়; এমনভাবে ছাদ পর্যন্ত স্তূপ করে রাখা, কখন জানি ঘাড়ের উপর হুড়মুড় করে এসে পড়ে! ঘরটার আনাচে-কানাচে বই, মেজে থেকে ছাদ অবদি; এমনকি খাটের পায়া গুলো উঁচু করতে ব্যাবহৃত হয়েছে টলস্টয়, হোমার, রবীন্দ্রনাথ আর মার্কেস—এসব লেখকের ঢাউশ বইগুলো।

টেবিলটা দিস্তা দিস্তা কাগজে ঠাসা। নিচে কাগজ ফেলার ঝুড়ি উপচে মেজেতে পড়ছে কতগুলো খুচরো কাগজ। এ সময় কলিং বেল বেজে উঠল।  

‘এন্ড্রু এসেছে বোধহয়’, রান্না ঘর থেকে লেখক হাঁক দিলেন। ‘আয়শা, খুলে দেবে দয়া করে।’

দরজা খুলতেই এন্ড্রুর উঁচু কপাল, গোল মুখের নাদুস-নুদস চেহারা ভেসে উঠল। আয়শাকে দেখে প্রথম সে একটু থতমতিয়ে গেল। পরে অবাক হওয়ার ভঙ্গি করল। অনেক দিন সে লেখকের ঘরে এমন দৃশ্য দেখে না। যা আগে হামেশাই দেখা যেত, নতুন নতুন মুখ। সুন্দরীরের বাগান যাকে বলে ফ্ল্যাটটা ছিল তাই। হঠাৎ কী হলো, ঘরটা একটা মরুভূমিতে রূপ নিল। কেন? সে প্রশ্ন এন্ড্রুও।

তবে এন্ড্রু অবাক হওয়ার কারণ ফ্ল্যাটে নারীমুখ দেখার জন্য যতটা, তার চেয়ে হয়ত আয়শার চোখ, তার ঠোঁট—যা দেখে নিতান্ত গোবেচারা মানুষও হতবাক হয়ে যায়। আয়শার মুখের দিকে চেয়ে সে লেখককে উদ্দেশ্য করে চিলি্লয়ে বলল, ‘স্যার, আগামী দু’দিন আসব না। অন্য জনের থেকে জোগাড় করে তিন লিটার দিয়ে গেলাম। পাওয়া যাচ্ছে না বলতে পাওয়াই যাচ্ছে না।’

‘একটু থেকে আড্ডা দিয়ে যাও’, লেখক রান্নঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন।

‘না স্যার, আজ আসি। আগামী দুদিন আসব না এই দিয়েই চালিয়ে নিয়েন। শ্বশুর বেটা অসুস্থ, বৌকে নিয়ে যেতে হবে।’ একটা গলা খাকারি দিয়ে যোগ করে, ‘এই প্যারা না থাকলে আজকে আবার সাধতে হয়, বলুন স্যার!’ শেষের বাক্যটা সে আয়শার দিকে তাকিয়ে শেষ করে।

‘তা তোমার মাও তো অসুস্থ, তাকে দেখবে কে?’ লেখক এগিয়ে এসে জিজ্ঞ্যেস করে।

‘বোন আছে না।’

‘সে তো অন্ধ।’

‘ম্যানেজ হয়ে যাবে কোনোভাবে একটা। বৌর জ্বালায় তো ঘরে থাকা যাচ্ছে না, ‘বাবা বাবা’ বলে ফিট খাচ্ছে। কাছে গেলে তিন হাজার বোল্ডের কারেন্ট শক করছে। আছি খুব মুশকিলে স্যার, আচ্ছা আসি। ’আয়শার দিকে এক পলক চেয়ে এন্ড্রু দ্রত প্রস্থান করল। 

‘এই টাকা নিয়ে যাও।’

‘পরে নিব, স্যার।’ দূর থেকে ভেসে এলো এন্ড্রুর তরিৎ গলা।

লেখক ফের কিচেনে চলে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পর চায়ের কেতলি নিয়ে ফিরল।

চা পর্ব চলছে। চিনা মাটির মগে করে চায়ে চুমুক দিচ্ছে লেখক।

‘তো...’ অব্যয় দিয়ে শেষ না হওয়া আলোচনা শুরু করার অভ্যাস দিয়ে সাংবাদিক চায়ের কাপে একটা আলতো চুমুক দিল। চায়ের কষাভাবটা মুখের ভেতর গিয়ে নরম স্থানগুলোকে দৃঢ় করে তুলল। যা আলাপ আলোচনাকে তার নিজের কক্ষপথে পরিচালিত করার পক্ষে খুবই উপকারী।

‘তো আর কি, প্রতিটা মানুষ ঘোর বদমাশ। অশিষ্ট বদ। স্বার্থপর, লোভী। এতে তার কোনো দোষ নেই। দোষ নেই তখনও বন্ধু এন্ড্রু যখন কামনার বশবর্তী হয়ে শ্বশুর বাড়ি দৌড়ায়। ওদিকে মা পেলেছে বলে যে ইমোশানটা আমরা ক্রিয়েট করতে চেষ্টা করি, সেটা বহুত খুব সুরত হয়ে ভাগাড়ে মুখ থুবড়ে পরে থাকে। আসলে এটা একটা ভুয়া কনসেপ্ট। কারণ মায়েরা পালতে বাধ্য। যদি বলো বাধ্য না—তবে এমন সব আত্মঘাতি ঘটনার পরও, এই যেমন ধরো বৃদ্ধা মাকে রেলস্টেশনে ফেলে গেল সন্তান, বাবাকে নিজ হাতে খুন করল মদ্যপ মেয়ে, মুক্তিযুদ্ধা বাবার কবরের উপর সন্তানের টয়লেট—এসব শিরোনামে খবর আসার পরও মনুষ্য পরম্পরা অব্যাহত থাকতে পারে না। কারণ মানুষের প্রকৃতিই এমন যে—সে অত্যাচারিত হবে জেনেও ওই কাজটাই করবে। কারণ আর কিছু না—সে অত্যাচিত হতে ভালোবাসে।’

‘মানুষ ভেতরে ভেতরে আসলে রোবট। সত্যিকার অর্থে মানুষ তাই আবিষ্কার করে যা তার ভেতরে আছে। সাব-কনশাসে সে একটা আস্ত রোবট। সেখানে কিছু নির্দেশনা ইনস্টল করে দেয়া আছে, যার বাইরে মানুষ যায় না। ওই বোধই তার জাগে না। যখন ওই বোধ জাগে আর বাঁধাটা ভেঙে যায়, তৈরি হয় আরেকটি বাঁধ; যা আগের চে’ও বেশি অভ্যন্তরে, অচেনা জায়গায়; ফলে মানুষ ফের ওই চক্রে ঘুরতে থাকে।’

কথাগুলো সাংবাদিকের মাথার উপর দিয়ে যায়। প্রসঙ্গটা পাল্টাতে তাই বলে, ‘কিন্তু আয়শা কেন বিয়ে করেনি অমিতকে? তাকে কেন আপনার নিজের মতো অবিবাহিত রাখলেন? এতো গোছানো আর ধীরস্থীর একজন মানুষকে কিনা আপনি অবিবাহিত রাখলেন? একজন বিবাহিত কি বিপ্লবী হতে পারে না?’ সাংবাদিকের সুরে অভিযোগের সাথে কিছুটা অভিমানও যেন ঝরে পড়ে।

‘কারণ প্রতিটি পুরুষ ক্রমেই নারী আর প্রতিটি নারী ক্রমেই পুরুষ। আয়শা যদি নিজের মধ্যেই অমিতকে খুঁজে পায়, তাহলে কেন সে মনিতের বৌ হতে যাবে, সন্তান উৎপাদন করতে যাবে? পৃথিবীর আর সবাই যখন এই গুরু দায়িত্ব খুব গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে যাচ্ছে। তাই প্রেম, বিয়ে, সন্তানের এই এক ঘেয়ে নিত্য-নিয়ম শৃঙ্খলে সে আবদ্ধ হতে চায় নাই; বিশেষত এর চেয়ে বড় বড় বাঁধা যেহেতু সে আগেই অতিক্রম করে এসেছে। সে আনন্দোলনে গিয়েছে, বন্দুকের মুখে বুক পেতেছে, চক্রান্ত ভেদ করে সমহিমায় নিজেকে দাঁড় করিয়েছে; কিন্তু বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়নি, অমিতের মতো একজন ছেলে পেয়েও। তুমি বলতে পারো, সে আরও গহীনতম বন্ধনে আটকা পড়েছে—এটাও এক জড়ত্ব, রোবটত্ব। যা হয়তো সাধারণ মানুষের চিন্তাসীমার বইরে, যা তাকে বিয়ে থেকে দূরে রেখেছে।’

‘এভাবেই বুঝি মানুষের চিন্তাশীলতার স্তরবিন্যাস হয়ে থাকে।’

‘অফকোর্স ডিয়ার আয়শা আঞ্জুম। আর এসব চিন্তার স্তরে স্তরে চলে আজব সব খেলা।’

‘কেমন?’ টেবিলে কুনুই রেখে হাতে গাল রেখে ঘাড় কাত করে সে জানতে চায়।

‘লেখকদের কথাই ধরো। যেমন অবন ঠাকুরের ক্ষিরের পুতুল, বিভূতির আরণ্যক অথবা গোগলের তারাস বোলবা—এও জড়ত্বের এক স্তর। তবে খুব, খুবই গভীরে আর অনেক দূর পর্যন্ত এর বিস্তার। এর সীমার থৈ পাওয়া যদিও খুব শক্ত। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর সে ক্ষেত্রে খুব দারুণ উদাহরণ—তিনি যখন ভাষায় পথ পাননি, তখন চিত্রশিল্পে সে প্রয়াস পেয়েছেন; যখন চিত্রে পাননি, তখন আবার ভাষার পথ ধরেছেন; সীমানা বাড়ানোর এক দারুণ পদ্ধতি। আমি আশ্চর্য হয়ে যাই টলস্টয় যখন ‘আর কত জমি চাই’ এর মতো গল্পের মাধ্যমে ভূমানচিত্রের সীমানা কমিয়ে চিন্তার জমির সীমানা বাড়াতে চান। অথচ তিনিও তো এক জায়গায় গিয়ে থেমে গেছেন।’

‘বিভূতিভূষণ আমার খুব প্রিয় লেখক।’ কথার মাঝে সাংবাদিক হঠাৎ ফোড়ন কাটেন। গলার সুরে কেমন একটা অসহিষ্ণুতার আভাস। যেন সে তার প্রিয় লেখকের কোনো রকম অপমান সহ্য করবে না—এভাবে সে প্রসঙ্গটার দুই দিকে ফার্স্ট ব্র্যাকেট দিয়ে চোখ সরু করে লেখকের দিকে তাকায়।

‘বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়! তিনি আসলে হতে চেয়েছিল একজন পাহাড়ী অথবা এমন এক গাছ, যা লক্ষ বছর বনের মধ্যে বেঁচে থাকবেন তাই সে আরণ্যকের সৃষ্টি করেছেন। গোগলের ইচ্ছে ছিল জার হবেন, হবেন সফল সেনাপতি, ছড়ি ঘুরিয়ে শাসন করবেন গোটা দুনিয়া—তাই তিনি সৃষ্টি করেছিলেন তারাস বুলবা।’

‘আপনি কি তাহলে আয়াশার মাধ্যমে বুঝাতে চাচ্ছেন কোনো মানুষই থাকবে না পৃথিবীতে? মানুষমুক্ত একটা পৃথিবীর আভাস গল্পে স্পষ্ট...’

‘অবশ্যই না। আমি তা চাওয়ার কে? ড্রাগনের বিলুপ্তি কে চেয়েছিল? অথবা তেলাপোকার দীর্ঘজীবিতা কে চেয়েছিল? এসব চাওয়া-চাওয়ি আসলে কিছু না। পারমাণবিক বোমা কে তৈরি করেছে? মানুষ। কেন? এসব আসলে কী প্রমাণ করে? তোমাকে আমি কেবল প্রশ্ন রাখছি। উত্তর তুমি নিজেই বুঝে যাবে।’

টপিক চেঞ্জ করে লেখক এবার নিজেই বলল, ‘আয়শা, তোমাকে রাতের খাবারের দাওয়াত নিতে অনুরোধ করা যাচ্ছে।’

আয়শা লেখকের দাওয়াতে হ্যাঁ-না কিছুই বলল না। লেখকও তেমন একটা জোর দিল না। সে তার দাঁতের ফাঁকের আটকে থাকা খাবার বের করার জন্য নখ দিয়ে খুটাতে লাগল। আয়শা তার দ্বিধা দূর করে খাবারের দাওয়াত গ্রহণ করে বলল—

‘তা কী খাওয়াবেন?’

‘আমাকে খেতে পারেন। খাবেন?’ বলে লেখক কিচেনরুমের দিকে চলে যায়।

আয়শা হেহে করে হাসে। ভেতরের অস্বস্তিটা গোপন করতে চায়। সে আসলে জানে, মাকড়শা কীভাবে তার জালের মাধ্যমে শিকারকে আয়ত্তে নিয়ে আসে। তবে এও তো সত্য, মানুষ গভীরতায় একে অপরকে ছাড়িয়ে যায়। হয়ত উপযুক্ত উপকরণের অভাবে তা প্রামাণ্য হয়ে থাকে না। সেখানে আয়শা দেশের নাম করা পত্রিকার উদিয়মান রিপোর্টার, বেশ কিছু রিপোর্ট করে সাড়া ফেলেছে। সেই নেশাই আজ তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। অপর দিকে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে যাওয়া একজন প্রখ্যাত লেখক। দুটো শক্তিধর বাহু মুখোমুখি অবস্থান করছে, সংঘর্ষের জন্য।

[ব্র্যাকেটে অন্য একটি ঘটনার কথা বলে রাখি। গল্পের ভেতর অন্য গল্প পাঠকের মনযোগ বিঘ্নিত করে— ঠিক, তবে কিছু ব্যাপার থাকে, যা ব্র্যাকেটের ভেতর বসে থাকে এমন এক সূত্র নিয়ে, যা আগে পরের ঘটনার চাবি হিসেবে কাজ করে। আপাত দৃষ্টিতে এটি অনুপ্রবিষ্ট মনে হলেও হতে পারে; অথচ এটিই গল্পের মূলশেকড় অথবা মূলশেকড়ের নির্ভরশীল গুরুত্বপূর্ণ এক শেকড়। তাই উপন্যাসের আয়শার গল্পটির কথা নিয়ে আসা হচ্ছে। আয়শা মূলত একটি ছবি, একটি অনুভূতি। যার জন্ম হয় পূর্ণচন্দ্রের রাতে।

লেখক তখন লেখালেখির সংগ্রামের প্রাথমিক স্তরে। যেটাকে সংগ্রাম না বলে ঘোরগ্রস্ত হয়ে মাটি খেয়ে যাওয়া বলা যায়। পরে যা ধীরে ধীরে প্রস্তরিত হয়ে পাহাড়ে রূপ নেবে।

তখন লেখক কবিতা লেখে। ইতোমধ্যে সংবাদ মাধ্যমের সাময়িকীতে দুয়েকটা প্রকাশিতও হয়েছে। কবিতার ঘোরে পাওয়া একটা যুবক নিঃসঙ্গ রাতে সমুদ্রপড়ে দাঁড়িয়ে আছে। অদূরে একটা পরিবার ছেলেমেয়ে নিয়ে হৈচৈয়ে ব্যস্ত। পরিবার থেকে একটু দূরে সমুদ্রের পানি ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছায়া; ওটিই আসলে আয়শা।

কার্তিকের চরাচর আলোকিত করা পূর্ণিমায় সেই ছায়া একটি কায়ায় রূপ নিল। গালের পাশ কেটে আলো লুটিয়ে পড়েছে মাটিতে পড়া ছায়াটা ঘিরে।

সমুদ্র আকাশ আর স্থলের যেন এক মোহনাস্থল এভাবে সে সমুদ্র বরাবর দাঁড়ানো। চাঁদ যেন তার জমজ। তার সঙ্গে নড়ছে। সমস্ত কোলাহলের ভেতর এ যেন এক স্থির সৌন্দর্যের স্থাপত্য। কোনদিকে তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। না বাচ্চাদের কোলাহল, না বড়দের হাকডাক। অনেক দিন হারিয়ে যাওয়া প্রিয় পাখির সঙ্গে হঠাৎ দেখা হলে যেভাবে মানুষ নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে—সমুদ্রের দিকে সে সেভাবে চেয়ে আছে।

পরিবারের অন্যান্য সদস্য একটু সরে ডাবের ভ্যান ঘিরে দাঁড়াল। লেখক নিজের স্থান ত্যাগ করে একটু এদিকে সরে এলো। পূর্ণিমারাতের সে এক স্থলসমুদ্র আর তার সামনে বঙ্গোপসাগার। সকল সৌন্দর্য ঝলমল করে তাকে ঘিরে নৃত্য করছে।

বিনয় মজুমদারের যাদুরাজ্যের সেই মন্ত্রটা তার মানসপটে জেগে উঠল। সে জোরে ঐ কায়াকে (যার মুখ দেখা যায় কি যায় না) শুনিয়ে আবৃত্তি করল: মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়।

কায়াটি যেন হঠাৎ ধাক্কা খেল এভাবে নড়ে ওঠল। আকেরটি পঙক্তি তার কানে সমুদ্রের ফেনার মতো ঢুকে তার সারা শরীর ফেনায়িত করে ফেলল: মানুষ তার চোয়ালেও নিকটও একা।

আরও একটি: তোমার চোখ এতো লাল কেন?

আরও একটি: কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?

আরও একটি: যেতে পারি, কিন্তু কেন যাব? যেতে হয় চুল খোলা আয়শা আক্তারকে সঙ্গে নিয়েই যাব।

আরও একটি: যদি ভালোবাসা পাই দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বাঁধব লাল রুমাল, দুনিয়া ঢুঁরে নিয়ে আসব ১০৮ নীলপদ্ম।

‘তাই!’ ছায়ায় কায়া ধরল কথা।

‘হুম। দুঃখের পান্তাভাতে তোমাকে নুন করে তুলতে চাই।’ লেখক উত্তর করল।

‘সমুদ্র তো সামনেই, এগিয়ে যান, পাবেন...’

পৃথিবী যেন ঘটনার একটি কেন্দ্র। কত কত ঘটনাই না এখানে সংঘটিত হয়, প্রতিদিন, প্রতিক্ষণে। অবিশ্বাসের মতো, বিশ্বাসের মতো অথবা এ দুটোর বাইরে এমন এক জায়গা থেকে—যার বিষয়ে যুক্তি-তর্ক চলে না। অথবা এই যুক্তি-তক্কের বিষয়টিই যেখানে অবান্তর।

তেমন এক অহেতুক বিয়োগান্তক ঘটনার সাক্ষী হলো পূর্ণিমার সমুদ্র। দ্বিতীয় কথাটি না বলে লেখক সমুদ্রে পা ভেজাল। হাঁটছে সে। ক্রমেই হাঁটু, কোমর, বুক—বাড়ছে পানি। পাড় থেকে ক্রমেই ছোট হয়ে যাচ্ছে সমুদ্রে চলা এক মায়াগ্রস্ত মানুষের কায়া।

সমুদ্রের হারিয়ে যাওয়া লেখকের কায়ার সঙ্গে সৈকতে দাঁড়ানো কায়ায় দেখা দিল চাঞ্চল্য। ক্রমেই তা ঘণিভূত হল।

সে ডাক দিল, ‘এই, এই।’ কারণ তারা কেউ কারো নাম জানত না। লেখক কায়ার, না কায়া লেখকের। পরিবারের সদস্যরা এদিক চেয়ে মৃদু হেসে আবার ডাব খাওয়ায় মন দিল।

‘এই, এই।’ বলে সমুদ্রের হাঁটু পানিতে নেমে গেল কায়া। ‘এই, এই, এই!’ ডেকে সে ক্রমেই লেখককে ধরার জন্য ছুটে গেল।

সমুদ্র, ঈর্ষাকাতর খুনি সমুদ্র, সন্ত্রাসী সমুদ্রের প্রবল ঢেউ ঢেকে ফেলল কায়াকে। লেখকের পা-হাত তখন ঢেউয়ের শূন্য মঞ্চে ছোড়াছুড়ি করছে। ইতোমধ্যে তার হাত-পায়ে লাগল মাটির ছোঁয়া।

লবণাক্ত পানিতে তখন সে খুক খুক করে কাশছে। হঠাৎ দেখল কিছু লোক ছুটছে সমুদ্রের দিকে। তখন তার বলতে ইচ্ছে হলো এই তো, এই তো আমি। সমুদ্র খুব ক্ষুব্ধ যাবেন না আপনারা। ওই কায়াটা কোথায় গেল? তাকে দেখছি না। সে কোথায়?

কাগজে ছবিসহ পরদিন খবর এলো দুজন সমুদ্রে নিখোঁজ হয়েছে। একজন ছেলে আর একজন মেয়ে। ভাইবোন সম্পর্ক। মেয়েটার নাম আয়শা, বয়স ২২। মামুন, বসয় ১৮। এইতো আয়াশা, এই তার অস্তিত্ব। এরপর লেখক আর কোনো দিন সমুদ্রে যায়নি, কোনোদিন কবিতা লেখেনি, কোনোদিন প্রেমে সাড়া দেয়নি। মনের পাথর দিনকে দিন ভারী হচ্ছে দেখে, সে গদ্যের আশ্রয় নিল। সে তার প্রথম উপন্যাস নামাল। তার সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভেতর দেখল আশ্চর্য পরিবর্তন। দ্রোহ, অভিমান—এইসব কাব্যিক অনুভূতি কচ্ছপের মতো গিয়ে শক্ত খোলের আড়ালে লুকালো। বন্ধুত্ব, আড্ডা কমে গেল। নারীদেরকে এড়িয়ে চলল। স্বেচ্ছা প্রণোদিতদের সে প্রাকৃতিক কলমে একে দিয়ে চলল নিজের সাইন।

তার বাহুডোর তৈরি হলো প্রবল যুক্তি দিয়ে, তার অশ্রু বেরুল তাও প্রবল যুক্তিতে যাচাই হয়ে। হিসেবী, বদমাশ, লোভী আর স্বার্থপর হিসেবে পরিচিত মহলে নাম কামাল, সাহিত্যে দেখা দিল যার প্রভাব। গদ্য, চরিত্র চিত্রনের নৈপুণ্য, দার্শনিকতার জাল দিয়ে ঢাকা তার শয়তানীতে এক প্রবল আকর্ষণে ধেয়ে এলো হাজার হাজার পাঠক।

আবার খুব সৌখিন জীবন যাপন অথবা খাওয়া-পরাতেও তাকে দেখা গেল না। সেই রাতের পর থেকে আজকের এই লেখক দশটা জন্মের পরের মানুষ বলে মনে হবে হয়তো। তবে এই সে, এই তার জীবন। যাকে সরল অঙ্কে যোগ-বিয়োগ করা যায়; তবে ফল দেখলে কেমন খটকা লাগে, হলো কি? কী যেন কম পড়েছে, ধরা যাচ্ছে না। আসলে প্রতিটি মানুষই তাই, অঙ্কে তাকে পাওয়া যায়, আবার যায়ও না।

যদি প্রশ্ন করা হয় সে রাতের পর তো তাকে আরো মানবিক, প্রেমিক হওয়ার কথা ছিল?

সে কি উত্তর দেবে জানেন, তুমি কি মানবিক? মানবিকতা কী? আমি মানবিক না সে তোমার কেন মনে হলো? কিংবা সে বলবে, তোমাকে যদি এখন কষিয়ে চড় দিতে পারতাম আমার ভালো লাগত। তবে তা যে আমি মারছি না—এটা কি তোমার মানবিকতা মনে হচ্ছে না। দারোয়ান না ডেকে স্বেচ্ছায় স্বসম্মানে যে বেরিয়ে যেতে বলেছি—এই মানবিকতাটুকু দয়া করে রক্ষা করতে দিন।

তা সে ছিল একটি ইলেট্রিক মিডিয়ার সুন্দরী সাক্ষাৎকারপ্রর্থী। যে অপমান সে আবার তার চ্যানেলে পরদিন ফলাও করে প্রচার করে। অবশ্য লেখক তা দেখেনি। কারণ বাসায় তার টিভি নেই। শুনেছে হয়তো কারো মারফত। সে সেটা নিয়ে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করেনি। ক্ষতির মধ্যে তার রাতের সঙ্গিনীদের আগম কমে গেছে এবং এক সময় সে নিজেই এটি একদম বন্ধ করে দিয়েছে। ]

সেই নিঃসঙ্গতা যাপনের পাঁচ বছর কেটে গেল। বলা নেই কওয়া নেই, আজ হঠাৎ এই মেয়েটি এসেছে। দরজা খোলার পর কোনো প্রশ্ন উত্তরের তোয়াক্কা না করে সে বলে, ‘আমি আয়শা। আপনার সঙ্গে চা খেতে এসেছি।’

লেখক প্রথম কোনো কথা বললেন না। চেহারাটা একহারা। চোখের আর ঠোঁটের কোনগুলো আশ্চর্য সমুদ্র। ‘আসুন’, ফিসফিস করে লেখক উত্তর দেন। প্রায় পাঁচ বছর পর কোনো নারীকে সে নিজের ঘরে আমন্ত্রণ জানায়।

সেই আসা এখন রাতের খাবারের দাওয়াতে গড়িয়েছে। কিচেনরুমে কী হচ্ছে তা দেখার জন্য আয়াশা উঠল। গিয়ে দেখল লেখক কিছু একটা ধুচ্ছেন।

‘কোনো হেল্প করতে পারি আমি?’

‘তাহলে তুমি এখানে পাতিলে মাংসটা নাড়। আমি ঝট করে আরেকটু আদা-রসুন কেটে নিই। খাসির মাংস তো, এসব কম হলে গন্ধ থেকে যায়।’

  ‘আদা-রসুন তাহলে মাংসের গন্ধ কমায়!’

  ‘হ্যাঁ, জান না! স্বাদ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এসব মাংসের গন্ধও দূর করবে। তা তুমি চাইলে আমার কাছে রান্না শিখতে পার।’

  ‘কিন্তু আপনি সব সময় রান্না নিয়ে থাকলে লিখেন কখন?’

‘রাতে। তাছাড়া বুয়া আছেতো। বয়স হয়েছে তো, অসুস্থই থাকে বেশি। সুস্থতা বোধ করলে এসে রেঁধে যায়। না হয় আমি রাঁধি।’

  ‘একে ছাড়িয়ে দিয়ে অন্য কাউকে নিলেই পারেন?’

 ‘সে কি করে হয়। এ আমার দেড় যুগ ধরে রান্না করে দিচ্ছে। স্বামী-সন্তান নেই। মেয়ের সঙ্গে থাকে। মেয়ের জামাই আবার বোঝা মনে করে, তাই কাজ করে যা আয় করে কিছু আমার কাছে জমা রেখে, বাকিটা মেয়ের জামাইয়ের হাতে তুলে দেয়। এই করে তার পঞ্চাশ হাজার জমেছে।’

  ‘বৃদ্ধার কি মেয়ে নেই? তার মেয়েকেও তো আপনি বলতে পারতেন।’

  ‘বলেছিল কহিনুরের মা। আমি না করেছি। বলেছি, তুমি যতটুকো পার করো। বাকিটা আমি দেখে নেব।’

  ‘কী অবস্থারে বাবা!’ আয়শা স্বগতোক্তি করে।

  এমন কথায় লেখকের মেজাজ খিঁচড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সে রাগেতো না-ই, কেমন প্রশ্রয়ের হাসি হাসে। আয়াশার চোখের দিকে তাকায়। বলে—

 ‘দেখো, যেকোনো অবস্থাই ভালো। নিঃসঙ্গতা আরও ভালো। আমি জানলে আরও আগে এটি গ্রহণ করতাম; এমনকি জন্মিয়েই। ছোটকালে আমি টারজান হতে চাইতাম। বিশ্বাস করবে কি না জানি না, এখনও আমার সেই ইচ্ছে অছে। এই যে বললে না তুমি, রান্না করে খান আবার লেখেন কখন। প্রতিদিন আমি নিয়ম করে লেখি, নিয়ম করে পড়ি এবং এর মধ্যেই রাঁধি, কাপড় ধুই, জরুরি কল করি, হাঁটি এবং যতক্ষণ মন চায় ঘুমাই। এসব আমি একদিনে করে উঠি কীভাবে জান— এই নিঃসঙ্গতার কারণে।

  ‘আপনার নায়িকা আয়শার সঙ্গে আপনার বস্তবতার কোনো যোগসূত্র আছে কী?’

  ‘আছে।’

  ‘বলুন।’

  ‘ওই হল আয়শা। দেয়ালে বাঁধানো ছবিটা।’

  ‘কোনটা?

  ‘আড্ডা দিলাম যে ঘরে। বাঁধানো একটা পত্রিকার কাটিং তোমার চোখে পড়ার কথা।

‘হুম। সোনা দিয়ে বাঁধাই করেছেন নাকি?’

  ‘হুম। ওইটিই আয়শা। এটাই তার মৃত্যুর খবর।’

  ‘এমনও তো হতে পারে আপনি যা ভাবছেন তা না। অর্থাৎ আপনার সেই কায়াটা আসলে আয়শা না।’

  ‘তা কেন?’

  ‘কিন্তু এই যে আয়শা। আপনার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, এটিই হয়তো সেই আয়শা।’

লেখক খুব মনোযোগ দিয়ে আয়শাকে দেখে। কোনো কথা বলে না।

  ‘সাড়স উড়ে গেল কিন্তু! মসলা শুকিয়ে গেল, হাহাহা......।’

  ‘হ্যাঁ হ্যাঁ। চলো গোস্তটা দিয়ে দিই। আমাকে দাও, কষাতে হবে।’

  ‘ভাত নামাব।’

  ‘হয়েছে? দেখি, না, হয়েছে। আর একটু পরে নামাও। প্যাঁচপ্যাঁচে ভাবটা চলে যাক।’

  মাংস কষিয়ে ঝোল দিয়ে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিলেন সালুনের পাতিলটা।

  ‘জানো, কেন ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দেয়া হয় পাতিল?’

  ‘দ্রুত সেদ্ধ হওয়ার জন্য।’

  ‘ঠিক বলেছো। তবে সেই সঙ্গে আরেকটি ব্যাপার আছে, ছালুনের সুস্বাদু গন্ধটা উড়ে যেতে পারে না এই ঢাকনার জন্য।’ ঢাকনা সরাতে সরাতে এবার লেখক বললেন—

  ‘ঢাকনা সরাতে জান, সেটাও কিন্তু তোমাকে জানতে হবে, নয় গরম ভাঁপে তোমার হাত পুড়ে যেতে পারে। সতর্কতার জন্য একদিক একটু ফাঁক করে নিতে হয়। পরে উল্টা দিক থেকে টান দিয়ে সাৎ তাড়াতাড়ি ঢাকনাটা সরিয়ে ফেলো, এভাবে।’

  ‘চলুন, এবার কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেই।’

  ‘তার আগে চল একটা ‘ডিমেটু’ করে ফেলি,

  ‘সেটা আবার কী?’

  ‘ধামার নিজের রেসেপি। ডিম আছে; ডিম-টমেটুর ডিমেটু। খুবই সহজ, কিন্তু খেতে মজা। প্রথমে ঘিতে পেয়াজ কাঁচামরিচ ভেজে নাও, পরে তাতে কাটা টমেটু দিয়ে হালকা পানি দিয়ে নাড়তে থাকো। গলে গেলে এবার ডিম ছেড়ে দেবে একটা কী দুইটা। হ্যাঁ, অবশ্যই নুন দিতে ভুলবে না।নাড়তে থাকো। পানি টেনে গেলে নামিয়ে ফেল। হালকা ভেজা ভেজা আর চাটনিময় ডিমের গুড়ো—ব্যস হয়ে গেল ডিমেটু! এবার আমাদের রান্না শেষ। চলো জিরিয়ে নিই।’

  ‘অধ্যাপক রাজ্জক রান্না করতে পছন্দ করতেন।’ আয়শা বলল।

  ‘তার ইলিশ রান্নাটা স্পেশাল। তবে মজার ব্যাপার কী জান, বিখ্যাত লোকদের নানা কর্মযজ্ঞের মধ্যে রান্নার মতো মধুর ব্যাপারে তারা নীরব। অথচ খাওয়া অর্থাৎ ডাইনিং টেবিলের অনুপুংঙ্খ বর্ণনা তুমি সবার লেখাতেই পাবে, কিচেনের পানে না। থাকলেও সেটা ভিন্ন পারপাসে। হয়তো নাইকাকে একটু সোহগ করতে গেল, এই আরকি (হাসি)।’

  রাত ক্রমেই বাড়ছে। ঘড়ির কাটা লেখক আর আয়শার মধ্যেকার দূরত্বকে টিকটিক করে কমিয়ে নিয়ে আসছে। সেই সঙ্গে আরও ঘণিভূত হচ্ছে আড্ডা।

  ‘পৃথিবীর প্রায় সব লেখকই বিয়ে করেছে, মোপাসাঁর বিয়ে না করলেও বিয়ে নিয়ে তার আক্ষেপের কথা শেষ বয়সে স্বীকার করে গেছেন।আপনার কী তেমন কোনো আক্ষেপ আছে?’

  ‘না। আমি তো সেই পর্যায় যাইনি। চাইলে এখনও আমি বিয়ে করতে পারি।’ লেখকের এ কথায় দুজনেই হাসিতে ফেটে পড়ল।

  ‘বিয়ে নিয়ে তোমার মতামত কী?’

  ‘করব না বোধহয়।’

  ‘প্রেম?’

  ‘করতাম। এখন একা।’

  ‘আমার প্রচুর বানান ভুল হয়।’

  ‘আমি বানানের ব্যাপারে খুব সতর্ক।’

  ‘এ ভুল থেকে আমি কোনো দিনই বেরুতে পারব না।’

  ‘আমি দেখে দিতে পারি।’

  ‘এ জন্য একজন লোক আমি নিয়োগ দিব বলে মনস্থ করেছি। প্রকাশকের উপর কেবল নির্ভর করা যাচ্ছে না। ভুল থেকে যাচ্ছে।’

  ‘বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে?’

  ‘বিজ্ঞপ্তিতে কী আর সেই মানুষ মিলে? শুনেছি ‘ওয়ার এন্ড পিস’ সাতবার সংশোধনের পর টলস্টয়ের স্ত্রী সোফিয়া সাত বার হাতে লিখে দিয়েছিলেন, তাও পুরোটা, দেখে দেখে। ভাবা যায়!’

  ‘আমি হলে, আমিও তাই করতাম।’

  ‘তুমি তো সময় পাবে না।’

  ‘সাংবাদিকতা ছেড়ে দেব ভাবছি।’

  ‘কী করবে তাহলে?’

  ‘একটা প্রুফ রিডিংয়ের চাকরি খুঁজব।’

  ‘সেটা উচিত হবে?’

  ‘কেন? হবে না কেন?’

  ‘সেও তো কথা। তবে সাংবাদিকতার সিঁড়ি তোমার অনেক দূর নিয়ে যাবে; সম্পাদক পর্যন্ত, এমনকি আরও দূর পর্যন্ত। প্রুফ রিডিংয়ের কাজ একজন গৃহিনী হয়ে শেষ।’

  ‘প্রুফ রিডিংয়ের কাজের সঙ্গে আমি না হয় ঘর গোছাব, সন্তান লালন করব এবং কিছু কিছু লিখব।’

  ‘সেটা সুন্দর হবে হয়তো। আর হ্যাঁ, সমুদ্র...।’

  ‘কালকে আমি অফিসে ছুটির এপ্লিকেশন করব। কক্সবাজার থেকে ফিরে রিজাইনলেটার জমা দিব। আজকে খেয়ে নিই, চলুন। ঘুমাতে হবে।’

  ‘অমিতের আয়াশার থেকে তুমি একদম আলাদা। যে আয়শার ছায়ায় আমি বাস করেছি এতোদিন; তুমি সেই ছায়া ভেঙে, পুনঃস্থাপিত হয়েছ রক্ত-মাংসের কায়া হয়ে; এ আয়শা মনে হচ্ছে আমার আয়শা।’

  ‘আচ্ছা, চলি তাহলে! খিদে পেয়েছে।’ আয়শা মিচকি মিচকি হাসছে।

  লেখকের ঠোঁটের কোনেও সে হাসির সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। সৃষ্টির রদবদলের মতো যেন কিছু একটা ঘটছে। মায়াবী পর্দার মতো চাঁদের সামনের মেঘ সরে যাচ্ছে। রাতের ঘন অন্ধকার দ্রবীভূত হয়ে সূর্যোদয়ের সোনালি আলোয় দুটো উড়ন্ত পাখির ডানা দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে সমুদ্রের মুহুর্মূহু গর্জন।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers