মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ২ জিলহজ ১৪৪৭

সাহিত্য
  >
গল্প

অপ্রত্যাশিত তুমি-আমি

মিম্ মি জুন ১১, ২০১৮, ১৩:৫৫:১০

6K
  • অপ্রত্যাশিত তুমি-আমি

ঐদিন সকালের পর আমি আক্ষরিক অর্থেই ভুলে গিয়েছিলাম আমার রোগী তিয়ানা এবং ওর পরিবারের কথা। ডাক্তারদেরকে রোগ আর রোগের চিকিৎসা মনে রাখতে হয়,রোগে আক্রান্ত মানুষটাকে না। 
তাহলেই বিপদ ! ডাক্তারদের কে হতে হয় আবেগ লুকনো পুতুল মানব। বাংলাদেশের জনগণের ভাষায় 'কসাই'।
এরপর দ্বিতীয় বারের মতো তিয়ানা'র বাবার সাথে আমার দেখা হলো ফেসবুকে। আমি টুকটাক লেখালেখি করি কিছু বাংলা ব্লগে । ভদ্রলোক লেখালেখির কোন একটা গ্রুপে আমার লেখা পড়ে আইডিতে ঢু মেরে ছবি দেখেন চিনতে পেরে একটা টেক্সট করেছিলেন । আদার মেসেজ বক্সে থাকায় প্রায় মাস তিনেক পর টেক্সটা দেখি আমি। তিয়ানা নামটা মনে ছিল আমার। ভদ্রলোকের নামটাও জানলাম টেক্সট পড়ে --- অভ্র আবরার । ব্যবসায়ী। 
যদি কিছু মনে না করি তাহল ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট সেন্ড করতে চান । আমার লেখাগুলো পড়তে চান নিয়মিত।
আমি জাষ্ট লিখেছিলাম... ওকে। থ্যাঙ্কস।
ব্যাস এতটুকুই।
এরপরে হয়তো আর কখনোই আমাদের কোন কথা বা যোগাযোগই ঘটত না যদি ফেসবুকের কোন একটা গার্লস গ্রুপ আমার একটা পোস্টের ভুল ব্যাখ্যা করে ভাইরাল না করতো। 
ফ্রেন্ড লিষ্টের আর সবার মতো অভ্র সাহেবও আমাকে আপসেট হতে না বলে টেক্সট করলেন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করার প্রায় চার বছর পর !
হাই হ্যালো টুকটাক ফর্মাল টেক্সট শুরু হলো তখন থেকে। তিয়ানা ততদিনে আর তিন বছরের ছোট বাবু নেই। সাত বছরের ক্লাস টু তে পড়ুয়া একটা পরী বাচ্চা। ওর ভাই তৃন পড়ছে ক্লাস থ্রি তে। আমার তেপান্তরও তখন ক্লাস সেভেনে পড়ছে। আমার বয়সও তখন চৌত্রিশ ছুঁই ছুঁই ।
মাঝে মাঝে ছোট ছোট টেক্সট করতাম আমরা। একেবারেই সাধারন কথাবার্তা। কেমন আছেন ? কি করছেন ? বাচ্চাদের খোঁজ খবর। দেশ রাজনীতি সমাজনীতি নিয়ে গুরু গম্ভীর জীবনদর্শন শেয়ার করা আরকি।
মাসখানেক পর মনে হলো অভ্র কি আমার অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে ? প্রায়ই কেন টেক্সট করি এবং টেক্সটের জন্য অপেক্ষায়ও থাকি নাকি? আবার মনে হলো আরে এমন তো হতেই পারে। অস্বাভাবিক মোটেই না।আমাদের জীবনবোধ এবং ভাবনা চিন্তায় কিছু বেসিক মিল ছিল।তাই টেক্সটে সমস্যার কিছু নেই। নিজেই যেন বুঝ দিলাম নিজেকে। মানুষেজনেরর সাথেই তো চ্যাট করব। এলিয়ানের সাথে তো সম্ভব না এই মুহুর্তে চ্যাটিং করা। বুঝ দিলাম নিজেকে ভেংচি কেটে।
এর মধ্যে একদিন তেপান্তর স্টাডি ট্যুরে স্কুল টিমের সাথে তিনদিনের জন্য ঢাকার বাইরে গেল। জীবনে এই প্রথম ছেলেকে ছেড়ে থাকার অভিজ্ঞতা আমার। সারাদিন কাটলো কোন রকমে হাসপাতালে ডিউটি করে। কিন্তু সন্ধ্যার পর সময় যেন থমকে গেল। ঘড়ির কাটা নড়ে না। বিছানাতে উপুড় হয়ে একা ঘরে বহু বছর পর চিৎকার করে কাঁদলাম। কেন যেন নিতে পারছিলাম না সত্যটা... এভাবেই জীবনের ডাকে তেপান্তর ওর নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। ছেলেকে নিয়ে তিলে তিলে আমার সাজানো সংসারটা শূণ্য হয়ে পরে রবে। আমি তো চাই ছেলে আমার মস্ত মানুষ হোক।সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ুক ওর নাম এবং কাজ।
একা আমাকে হতেই হবে ফাইনালি। কাঁদতে কাঁদতেই না খেয়ে, হাসপাতালের পোশাক না বদলিয়ে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
হঠাৎ করে মোবাইলের শব্দে ঘুম ভাঙল। দেখি মেসেন্জারে অভ্রের নাম। অবাক হলাম। উনি হঠাৎ ! সে তো কখনো ফোন দেয়নি আগে আমাকে। ভাবলাম হয়তো কেউ অসুস্থ। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত বাজে সাড়ে বারোটা প্রায়। রিং বেজে যাচ্ছে সমানে। ফোনটা রিসিভ করা উচিত।
চোখের কোলে জমে থাকা শুকনো জল মুছে নিতে নিতে রিসিভ করলাম ফোনটা... হ্যালো।
-সরি এত রাতে ফোন দেবার জন্য। আপনি ঠিক আছেন তো ?
-একটু চমকে বললাম কেন ? কিছু হবার কথা আমার ?
-না না তা না। গত চার বছর ধরে দেখে আসছি রোজ কিছু না কিছু আপনি লেখেন। পোস্ট করেন বিকেলের দিকে টাইম লাইনে। আজ এত রাত হয়ে গেল তবুও কোন খবর নেই। গতকাল টেক্সটে লিখেছিলেন তেপান্তর স্টাডি ট্যুরে যাচ্ছে।এই প্রথম ওকে ছেড়ে আপনার একা থাকা।তাই ভাবলাম কিছু হলো কিনা। একটু খোঁজ খবর নেবার জন্য সন্ধা থেকে তিন চারটা টেক্সট করলাম। রিপ্লাই না পেয়ে ফোন দিলাম আরকি।
দুংখিত সেজন্য। ঘুম ভাঙালাম মনে হচ্ছে গলার ভয়েসে।
আমি তো চমকে গেলাম খানিকটা। চার বছর ধরে কখন পোস্ট আপলোড করি সেটা নোটিশ করে রেখেছে মানুষটা !
বললাম... না ভালো করেছেন ফোন করে।হাসপাতাল থেকে ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।শাওয়ার, ডিনার কিছুই
করা হয়নি।
-ওহ তাহলে ডিনার করে ঘুমিয়ে পড়ুন ।
- হুম।
-কাল তো শুক্রবার। আপনার ডিউটি আছে ?
-না কাল আমার উইকএন্ড।
-আচ্ছা। ডিনার করে ফেলুন। ছেলের জন্য মন নিশ্চয়ই খারাপ লাগছে। কথা হয়েছে ?
-হুম পৌঁছানোর পর জানিয়েছে। 
-ঠিক আছে। 
একটু থেমে বলল... শুনুন কেন যেন মনে হচ্ছে আজ ছেলেকে মিস করবেন অনেক। একদফা কান্নাকাটিও করে ফেলেছেন তাই না ? 
যদি ঘুম না পায় আমাকে নক দিতে পারেন কোন রকম অস্বস্তি বোধ না করে। আপনি মন খারাপ করে থাকলে আমরা চমৎকার কিছু লেখা পাব না কয়েকটা দিন। তাতে কিন্তু জাতির বিশাল ক্ষতি হয়ে যাবে।
এমন সিরিয়াস ভাবে শেষের কথাগুলো বলল অভ্র আমি মন খারাপের শীর্ষে থাকার পরেও ফিক করে হেসে ফেললাম। বললাম... কি বলেন এসব ?
-যান ডিনার, শাওয়ার শেষ করে আসুন। আসার সময় আপনার প্রিয় এক মগ ধোঁয়া ওঠা ব্লাক কফি হাতে করে নিয়ে আসবেন কিন্তু। আমি টেক্সট করে রাখছি আমার মোবাইল নম্বর। 
চার পাঁচ বছর ধরে কোন না কোন ভাবে যোগাযোগ ঘটছে আমাদের । অথচ মোবাইল নম্বর জানি না কেউ কারো। এটা কোন কথা হলো বলুন ?
অপেক্ষায় রইলাম কিন্তু ডাক্তারনী টুপুর বেগম।
ফোন কেটে একা একাই হাসলাম খানিকক্ষণ আমি।
 
 (চলমান…)
 
 
 

নিউজজি/এসএফ

 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers