মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ , ২ জিলহজ ১৪৪৭

সাহিত্য
  >
গল্প

‘মাড়ভাতের গল্প’ যেন মূল্যবোধের ঝাঁপতাল

শুকদেব হালদার মার্চ ১৩, ২০১৯, ১৮:৪৯:০৭

6K
  • ‘মাড়ভাতের গল্প’ যেন মূল্যবোধের ঝাঁপতাল

গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দু:খ, হাসি-কান্না, দ্বন্দ্ব-সংঘাত সমসাময়িক সময়ে যাদের কলমে শৈল্পিক রূপ পেয়েছে কবি মাহফুজ রিপন তাদের একজন। কবিতা ও গল্প  রচনার ক্ষেত্রেও তিনি যে মুনসিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। এবারের বই মেলায় মাহফুজ রিপনের ‘মাড়ভাতের গল্প’ শিরনামে একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এটি তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ। ১৭৫ টাকা মূল্যের  বইটির প্রচ্ছদ করেছেন আল নোমান।

বেহুলাবাংলা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ৬৪ পৃষ্ঠার এই বইটিতে রয়েছে ১০টি সুনির্বাচিত গল্প। প্রতিটি গল্পেই রয়েছে এমন এক যাদুকরি শক্তি যা পাঠকের হৃদয়ে অন্যরকম এক অনুভূতি জাগাবে। গল্পগুলো পাঠ করার সময় পাঠককে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে তার শেকড়ের কাছে অর্থাৎ তার বাপ-দাদার চৌদ্দ পুরুষের ভিটার নিকটে। 

লেখক গভীরভাবে লক্ষ করেছেন যে, বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা-ভক্তি বিলুপ্ত প্রায়। গুরুজনদের প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হয় না। সবকিছু কেমন যেন উঠে গেছে। বইটির প্রথম গল্প ‘ইলশে ঘ্রাণ’-এ ফুলির দাদির কথায় তেমনই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। “এখন কোন মান্যিগণ্যি নাই, সব উইঠা গেছে।”

দ্বিতীয় গল্পের নাম ‘মিয়া ভাই’। গল্পটি পাঠককে স্মরণ করিয়ে দেবে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ’৭৫-এর ১৫ই আগস্ট তাঁকে স্ব-পরিবারে হত্যা করা হলেও জাতির বিবেক থেকে তাঁকে কখনও সরানো যায়নি। “আসপি, আবার আসপি শেখসাব আবার আসপি”। উক্ত গল্পের ফজলু মিয়ার এই উক্তির মত দেশের সর্ব¯Íরের জনতা আজও বিশ্বাস করে শেখ সাহেব আবারও ফিরে আসবেন। বাংলার দুরবস্থা তাঁর হাতেই পরিবর্তীত হয়ে সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হবে যে বাংলায় প্রত্যেকেরই সম-অধিকার নিশ্চিতহবে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশের তরুণ, যুবক পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত থাকাকালে ১৯৭১-এর ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে উদ্দীপ্ত হয়ে দেশের সর্বস্তরের মানুষ দেশমাতৃকাকে মুক্তির লড়াইয়ে সামিল হয়ে দেশপ্রেমের যে গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তা ‘এবং কথা ৭১’-এ চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। বাঙালির সীমাহীন বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের মর্মময় সে কাহিনি জানার পর পাঠকের হৃদয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি যেমনভাবে শ্রদ্ধা-ভক্তি বৃদ্ধি পাবে, তেমনি  পাঠকরা দেশপ্রেমের আদর্শে বলিয়ান হয়ে দেশের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করার প্রেরণা লাভ করবে।

তৃতীয় গল্প ‘যুদ্ধ পুরাণ’ এর মাধ্যমে ৭১ সালে বর্বর পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং এদেশীয় তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস’দের সহায়তায় পুরো নয় মাস ধরে যে নারকীয় গণহত্যা সংগঠিত হয়েছিল তা পাঠকের সামনে দিবালোকের ন্যায় প্রতিভাত হবে।

তার ভাষায়- ‘চারিদিকে ইটের দেয়ালগুলো দীর্ঘদিনের অভিমান বুকে নিয়ে আমাকে যেন বলতে থাকে, জীবন অবিনশ্বর, পাপের কোনো মুক্তি নেই। প্রকৃতি এক অপরূপ মেলবন্ধনে অতি শান্ত সে পরিবেশে বাতাসও যেন ভারী হয়ে আসে। অজানা সব সত্যের সন্ধান পেয়ে কখন যে আমার চোখের পাতা ভিজে গেছে, নিজেই জানি না।’

দেশের অন্যতম জাতীয় সমস্যা হল বাল্য-বিবাহ। সমাজের ভদ্রবেশী কিছু দুষ্টপ্রকৃতির মানুষ কিভাবে সহজ-সরল মানুষকে প্রতারণার মধ্য দিয়ে বাল্য-বিবাহের দিকে প্ররোচিত করে- ‘টিফিন পলাতক’ গল্পে লেখক তা চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আজও সেকেলের দাদি-নানিরা তাদের সরলমতি নাতি-নাতনিদের নানান কৌশলে বাল্য-বিবাহে উৎসাহ দেয়।

‘আরে কান্দিস ন্যা, ওরত্যা ছোট আছিলাম আমি বিয়ার সময়। মাইয়া সাত কিলাস পড়ছে, আট কিলাসে পাড়া দিছে, অহনো কস ছোট। অত ভালো পুলা আর পাওন যাইব না। গঞ্জে মুদিখানা আছে, পাথারে তিন পাখি জমি আছে। এমন ছাওয়াল কপালের ব্যাপার, বুঝলি।’

হাজার সমস্যা থাকলেও মানুষ সহজে তার পরম্পরাকে অস্বীকার করতে পারেনা। যেকোন মূল্যে সেই পরম্পরাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। ‘ডাক্তার বাড়ির ইন্দারা’য় সুশীল ডাক্তারের মা’র কথায় যেন আমরা তারই প্রমাণ পাই।

“না, রে বাবা, এই পিতলের ঘটি যে আমার বিয়ের সময় আমার মা আমাকে দিয়েছে, আর আমার মায়ের বিয়ের সময় তারে নাকি তার মা এই ঘটি দিয়েছিল। ঘটি দেওয়ার সময় মা বলেছিল- এই যে সোনার গয়নার সঙ্গে পিতলের ঘটিও তোমারে দিলাম। এইটা যতœ কইরা রাইখো, বুঝলা। বহু হাত ঘুইরা পিতলের ঘটি তোমাগো বাড়ি আইছে, এ ঘটির তো একটা পরম্পরা আছে রে বাবা। আমার মায়ের দেওয়া শেষ স্মৃতি তোমরা রক্ষা করতে পারবে না?’

শুধু তাই নয়। মানুষের সামান্য উৎসাহ ও নিজের দৃঢ় সংকল্পকে কাজে লাগিয়ে যে অসাধ্যও সাধন করা যায়, উক্ত গল্পের তপুর কথায় তাও স্পষ্ট হয়। “কিসের ভয়, সব মনের ব্যাপার। -চঞ্চল যদি ইন্দারার মধ্য থেকে পিতলের ঘটি তুলতে পারে, আমি কেন সাঁতার কেটে বিলের মাঝ থেকে পদ্ম ফুল তুলতে পারব না?” ‘কাগজের টুপি’ গল্পটি পাঠককে সরাসরি তার শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। গল্পের প্রতিটি ঘটনাই পাঠকের নিজের জীবনের ঘটনা বলেই মনে হবে।

প্রগতির এই যুগে আজকাল হরহামেশায় বলতে শোনা যায়, যেখানে প্রেম সেখানেই যৌনতা। যৌনতা ছাড়া প্রেমকে যেন আজকাল কল্পনাই করা যায় না। প্রায় সকল প্রেমিক- প্রেমিকাই সেই বিশ্বাস ধারণ করে একে অপরের সাথে সম্পর্কে জড়ায়। এর মধ্যেও ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। তবে সেই ব্যতিক্রমধর্মী প্রেমিক অথবা প্রেমিকাকে সহ্য করতে হয় নানা গঞ্জনা। তাদের ঘিরে উদয় হয় নানান প্রশ্নের। যেমন ‘বিপ্রলব্ধ’ গল্পে লেখকে বলতে শোনা যায়- 

“পুরোনো রাজবাড়ির ঘন অরণ্যের মাঝে দুজন হারিয়ে যায়, সুনালু ফুলের রঙিন আলোয়। চুম্বকের মত দুহাত এক হয়ে যায়। হঠাৎ অরুণের ধাবমান মনোজগতে পাপবোধ জাগে। সে প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে সুন্দরের জন্য। অবশেষে নিজেকে ফিরিয়ে হাত দুটি পকেটে ঢোকায়, দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে শম্পা! গভীর সে নিঃশ্বাস একটি নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।”

কাউকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করার ফলে মানুষের মনে যে অভিমান সৃষ্টি হয়, তার ফলে অনেক সময় অনেক উজ্জ্বল প্রতিভাও কালের স্রোতে হারিয়ে যেতে পারে; যাকে আর কখনও ফিরে পাওয়া সম্ভব হয় না। ‘বন্ধু নিরঞ্জন’ গল্পটি পাঠককে সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেবে। 

‘মাড়ভাতের গল্প’ বইটির ভূমিকায় বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার লিখেছেন- এই বইয়ের গল্পগুলো চিনিয়ে দেয় মাহফুজ রিপন একজন তরুণ পরিশ্রমী শব্দশিল্পী যে মাটি থেকে বিযুক্ত হয়নি এক মুহূর্তের জন্যও। ফাঁপা ইন্টেলেকচুয়াল স্মার্টনেস গিলে খেতে পারেনি তার মনন, হৃদয় এবং গল্পনির্মাণকে। ‘মাড়ভাতের গল্প’ বইটিতে পাঠক আমার কথার সত্যতা খুঁজে পাবেন। 

পরিশেষে, নিজ শেকড় থেকে বিচ্যুত হওয়ার ফলে তীব্র যান্ত্রিকতার এই যুগে মানুষের মধ্যে যে নীতি- নৈতিকতা, মূল্যবোধ হারাতে বসেছে, ‘মাড়ভাতের গল্প’ গল্পগ্রন্থটি পাঠের মাধ্যমে পাঠকের হৃদয় সেই শেকড়-সন্ধানে প্রবৃত্ত হবে তেমনটাই প্রত্যাশা।

মাড়ভাতের গল্প

মাহফুজ রিপন

প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ: আল নোমান

বেহুলাবাংলা প্রকাশনী

পৃষ্ঠা: ৬৪

মূল্য: ১৭৫ টাকা

নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers